১০ বছরে গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রীর আয় বেড়েছে ৫০ গুণ

সঙ্গে বেড়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব হিসেবে কর্মরত স্ত্রী শেফালী বেগমের আয়ও।

ময়মনসিংহ প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 7 Dec 2023, 06:34 PM
Updated : 7 Dec 2023, 06:34 PM

ময়মনসিংহ-২ (ফুলপুর-তারাকান্দা) আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদের গত ১০ বছরে আয় বেড়েছে প্রায় ৫০ গুণ। সঙ্গে বেড়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব হিসেবে কর্মরত স্ত্রী শেফালী বেগমের আয়ও। 

২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবার সংসদ সদস্য  হন শরীফ আহমেদ। সেসময় নির্বাচন কমিশনে দেওয়া হলফনামায় তার সাধারণ ব্যবসা থেকে বার্ষিক আয় ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা দেখানো হয়েছিল। 

আর এবার দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে দাখিল করা হলফনামায় তিনি বার্ষিক আয় উল্লেখ করেছেন এক কোটি ১৮ লাখ ২৮ হাজার ৬৩৬ টাকা। দেখা যাচ্ছে, ১০ বছরে তার বার্ষিক আয় বেড়েছে প্রায় ৫০ গুণ।   

২০১৪ সালের নির্বাচনের সময় শরীফ হলফনামায় উল্লেখ করেছিলেন, স্ত্রীর নামে ১০ তোলা সোনা রয়েছে; যার মূল্য ৮০ হাজার টাকা। 

টিভি-ফ্রিজের মূল্য ধরা হয়েছিল ২৫ হাজার টাকা। খাট, সোফা, ডাইনিংয়ের মূল্য দেন ২৫ হাজার টাকা। এর বাইরে আর কিছু উল্লেখ ছিল না সেসময়ের হলফনামায়। 

পাঁচ বছর এমপি থাকার পর ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লড়তে তিনি যে হলফনামা জমা দিয়েছিলেন তা বিশ্লেষণে দেখা যায়, তার আয়-সম্পদ বাড়ছে। 

সেবার বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট, দোকান ও অন্যান্য ভাড়া বাবদ বার্ষিক আয় দেখান ১ লাখ ২৬ হাজার টাকা। মৎস্য খামার থেকে আয় দেখানো হয় ১৫ লাখ টাকা। 

শেয়ার বাজার, সঞ্চয়পত্র বা ব্যাংক আমানত থেকে আয় ২ লাখ ৮৫ হাজার ৬৮০ টাকা উল্লেখ করেন তিনি। আর এমপি হিসেবে বার্ষিক সম্মানী আসে ৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা। 

দশম সংসদের সময় স্ত্রীর কোনো আয় না দেখানো না হলেও একাদশের সময় স্ত্রীর আয় দেখানো হয় ৬ লাখ ৭২ হাজার ৩৬ টাকা। 

তার স্ত্রী শেফালী বেগম পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে যুগ্ম সচিব হিসেবে কর্মরত থাকলেও হলফনামায় স্ত্রীর পেশার কথা উল্লেখ করা হয়নি। 

সংসদ সদস্য হওয়ার আগে শরীফের হাতে নগদ ৮ হাজার ৯৭১ টাকা ও ব্যাংকে জমানো টাকা দেখানো হয় ১ কোটি ৪ লাখ ৬৬ হাজার ৯৫৬ টাকা। 

আগে গাড়ি না থাকলেও এমপি হওয়ার পর ৫৬ লাখ ৫৩ হাজার টাকা মূল্যের টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার গাড়ি কেনেন তিনি। 

দশম সংসদ নির্বাচনে হলফনামায় স্ত্রীর নামে ১০ তোলা সোনা দেখানো হলেও একাদশের সময় তা দেখানো হয়নি। 

সেবার নিজের নামে ১০ তোলা সোনা দেখানো হয়; যার মূল্য ৮০ হাজার টাকা লিখেন তিনি। 

টিভি, ফ্রিজের মূল্য ধরা হয়েছিল ২৫ হাজার টাকা। খাট, সোফা, ডাইনিংয়ের মূল্য দেখানো হয় ২৫ হাজার টাকা। 

শরীফ প্রথমবার এমপি হওয়ার সময় অকৃষি জমি, আবাসিক-বাণিজ্যিক কোনো স্থাপনা না থাকলেও পরে পৈত্রিক সূত্রে অকৃষি জমি পান ৯ দশমিক ৫ শতাংশ। 

একইসঙ্গে বহুতল ভবনের উপর পাঁচতলা ডবল ইউনিটের বাসাও পান। 

শরীফের বাবা ভাষা সৈনিক শামছুল হক প্রয়াত হন ২০০৫ সালে। 

এমপি অবস্থায় অবশ্য তিনি ঋণগ্রস্ত হন। ফারমার্স ব্যাংক লিমিটেড থেকে কার লোন হিসেবে ২০ লাখ ৯২ হাজার ৪০৩ টাকা নেওয়ার কথা হলফনামায় উল্লেখ করেন। 

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাস করে দ্বিতীয়বার এমপি হয়ে প্রথম সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ও পরে গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান শরীফ আহমেদ। 

এদিকে, প্রতিমন্ত্রী অবস্থায় দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য তার দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কৃষিখাতে না থাকলেও বাড়ি ভাড়া বাবদ তার বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। আর মৎস্য খামারে বছরে তার আয় এক কোটি টাকা। মন্ত্রী হিসেবে সম্মানী ৮ লাখ ২৮ হাজার টাকা। ব্যাংক মুনাফা আসে ৮ লাখ ২০ হাজার ৬৩৬ টাকা। 

স্ত্রীর আয়ও বেড়েছে। এবারের হলফনামায় স্ত্রীর বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে ৯ লাখ ৬০ হাজার ১৩০ টাকা। 

ব্যাংকে জমাকৃত টাকা থেকে বছরে মুনাফা বাবদ আয় ৮ লাখ ২০ হাজার ৬৩৬ টাকা। 

প্রতিমন্ত্রী শরীফের নিজের হাতে নগদ টাকার পরিমাণও বেড়েছে। তার হাতে নগদ টাকা আছে ১১ লাখ ৩৫ হাজার ১২৮ টাকা। 

গত নির্বাচনের সময় হলফনামায় স্ত্রীর নগদ কোনো টাকা না থাকলেও এবার স্ত্রীর নামে নগদ ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেখান তিনি। 

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমাকৃত অর্থের পরিমাণও বেড়েছে স্বামী-স্ত্রীর। 

শরীফের ব্যাংকে জমা আছে ৩ কোটি ৭৬ লাখ ৭ হাজার ৮৩২ টাকা; স্ত্রীর নামে রয়েছে ৭৩ লাখ ১৪ হাজার ৫৫৪ টাকা। 

এবার তিনি ৯২ লাখ ৫৮ হাজার টাকা মূল্যের টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার গাড়ির কথা হলফনামায় উল্লেখ করেছেন। 

স্ত্রীর নামে কোনো সোনাদানা দেখানো না হলেও নিজের নামে দেখিয়েছেন দশ তোলা; যার মূল্য ৮০ হাজার টাকা। 

এ ছাড়া টিভি-ফ্রিজ, খাট-সোফা-ডাইনিংয়ের মূল্য বাবদ ধরা হয়েছে অর্ধলাখ টাকা। 

গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী হয়ে এবার ৭৫ লাখ ২৫ হাজার টাকায় নারায়ণগঞ্জে ক্রয় করেছেন ৩০ শতাংশ জমি। হেবা মূলে পেয়েছেন ১১৮৩ দশমিক ৬৬ অযুতাংশ। 

বহুতল ভবনের উপর পাঁচতলা ডবল ইউনিটের বাসা পেয়েছেন পৈত্রিক সূত্রে। নতুন করে পৈত্রিক সূত্রে তিনি ২০টি পুকুর পেয়েছেন। 

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে বাকিতে মৎস্য খাদ্য কিনে হলফনামায় তার দেনা দেখানো হয়েছে ৪৫ লাখ টাকা। 

এসব বিষয়ে জানতে গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদের মোবাইল ফোনে বারবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। 

তবে জেলা জনউদ্যোগের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম বলেন, “রাজনৈতিক নেতাদের অসামঞ্জস্য হারে আয় বৃদ্ধি পেলে সাধারণ মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা জন্মায়। এতে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের ভিন্ন একটা মনোভাব তৈরি হয়।