Published : 01 Dec 2025, 08:13 PM
বাউল শিল্পী আবুল সরকারের গ্রেপ্তার এবং সারা দেশে বাউলদের ওপর হামলার প্রতিবাদে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গানের আয়োজন করেছিলেন একদল শিক্ষার্থী। ‘উচ্চশব্দের’ দোহাই দিয়ে সেই অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টরের বিরুদ্ধে।
‘বাউলের দ্রোহ’ শিরোনামে রোববার রাতে ‘বিচার গানের’ আসর বসে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন চত্বরে। রাত ২টার দিকে মঞ্চে গিয়ে আয়োজকদের গান বন্ধ করতে বলেন প্রক্টর এ কে এম রাশিদুল আলম।
এ সময় আয়োজকদের সঙ্গে তার কথা-কাটাকাটি হয়।
প্রশাসন দাবি করেছে, গানের উচ্চ শব্দে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও ঘুমের সমস্যা হচ্ছিল। এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অনুষ্ঠান বন্ধ করার অনুরোধ জানানো হয়।
রোববার বিকাল ৫টা থেকে অনুষ্ঠান শুরু হয়। অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল রাতে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী ‘বিচার গান’। এতে পাল্টাপাল্টি যুক্তি ও সুরের লড়াইয়ে অংশ নেন প্রখ্যাত বাউল শিল্পী লতা দেওয়ান ও নয়ন দেওয়ান। অনুষ্ঠান চলাকালে কিছু শিক্ষার্থী উচ্চস্বর, ঘুম ও পরীক্ষার পড়ায় ব্যাঘাত ঘটার অভিযোগ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দেন।
রাত ১০টার দিকে প্রক্টরিয়াল টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে আয়োজকদের শব্দ কমানোর এবং রাত ১১টার মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ করার অনুরোধ জানায়। আয়োজকেরা শব্দ কমিয়ে অনুষ্ঠান চালাতে থাকেন। তার পরই প্রক্টর অনুষ্ঠানস্থলে আসেন।
এ সময় সেখানে অন্যদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষক হাসান নাঈম। তার সঙ্গেও প্রক্টরের কথা-কাটাকাটি হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থ হাসিলের জন্য প্রক্টর ‘মব-লিডারের মত আচরণ’ করেছেন বলে মন্তব্য করেন হাসান নাঈম।
তিনি বলেন, “যখন সাউন্ড কমানোর জন্য বলা হয়, তখনই সাউন্ড কমিয়ে দেওয়া হয়। আমি পার্শ্ববর্তী চৌরঙ্গী এলাকা থেকে কোনো শব্দ পাইনি। তখন শেষ গান চলছিল। এ সময় প্রক্টর এসে মঞ্চে উঠে ‘স্টপ ইট’ বলে অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেন।
“আমরা কয়েকজন গিয়ে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি আমার ওপর চড়াও হন। বলেন, ‘আপনি এখানে এদের সঙ্গে কী করছেন?’ আমি অবাক হলাম, উনি কেন আমার উপর চড়াও হচ্ছেন! আমি এখানে নানা কারণে থাকতে পারি, আমন্ত্রণেও আসতে পারি। তিনি চিৎকার করে কথা বলছিলেন। আমি শুধু বলেছি, ‘আমি আপনার ছাত্র নই, আমি আপনার সহকর্মী’।”

শিক্ষক হাসান নাঈম বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গোষ্ঠীর স্বার্থে প্রক্টর শেষ বেলায় এসে এ ঝামেলাটা করেছেন। তিনি মব-লিডারের মত আচরণ করেছেন।”
আয়োজকদের একজন নবীন কিশোর গোস্বামী বলেন, “রাত ৯টার দিকে কয়েকজন শিক্ষার্থীর অভিযোগ ও প্রক্টর স্যারের কল পাওয়ার পর আমরা সাউন্ড কমিয়ে দেই। রাত ১০টার দিকে সাউন্ড আউটপুটও বন্ধ করি। তখন শুধু মনিটরের সাউন্ডে অনুষ্ঠান চলছিল।”
আরেক আয়োজক সজীব আহমেদ জেনিচ বলেন, “আমাদের আয়োজনের একদম শেষ শিল্পীর পরিবেশনার সময় প্রক্টর এসে সরাসরি গান বন্ধ করে দেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে কোনো প্রক্টর এর আগে এমনটা করেননি। উনার উচিত ছিল, আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলা। শেষ মুহূর্তে উনি যা করেছেন, তা কাম্য ছিল না।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এ কে এম রাশিদুল আলম বলেন, “সন্ধ্যা থেকেই অনেক শিক্ষার্থী উচ্চ শব্দ নিয়ে ফেইসবুকে পোস্ট করেছে। এখন পরীক্ষার মৌসুম। অনেক শিক্ষার্থী শব্দে মাইগ্রেনের কথাও জানিয়েছে। সে কারণে আমরা আয়োজকদের শব্দ কমাতে বলেছিলাম।
“পরে রাত পৌনে ২টার দিকে অনুষ্ঠান শেষ করার অনুরোধ করলে তারা ১০-১৫ মিনিট সময় চান। সে সময় শেষে তারা আমার অনুরোধে অনুষ্ঠান শেষ করেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছে এবং বাজে শব্দ ব্যবহার করেছে।”
উপাচার্যের বাসভবনের সামনে গান
গভীর রাতে উচ্চ শব্দের প্রতিবাদে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে গিয়ে গান বাজান কয়েকজন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে ছিলেন আব্দুল্লাহ আল মামুন। তিনি ফেইসবুকে পোস্ট করে এমন প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের আহ্বান জানান।
পরে তিনি বলেন, “রাত দেড়টার পরও উচ্চ শব্দে গান-বাজনা বন্ধ হয়নি। শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে প্রশাসনকে বহুবার জানানো হলেও তারা যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি। প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে আমি ও কয়েকজন শিক্ষার্থী উপাচার্য ভবনের সামনে অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিই। কিছুক্ষণ পরই ১৫-২০ জন শিক্ষার্থী জড়ো হয়। একটি হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করে আমরা কিছু বিক্ষিপ্ত গান পরিবেশন করি।”
তিনি বলেন, কোনো ব্যানারের পক্ষ থেকে নয়, বরং স্বতঃস্ফূর্তভাবে তিনি, আনজুম শাহরিয়ার ও মো. সিফাতুল্লাহ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
আনজুম শাহরিয়ার ‘আধিপত্যবাদ বিরোধী মঞ্চ’ এর আহ্বায়ক। মো. সিফাতুল্লাহ শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ হল সংসদের সহসভাপতি (ভিপি)।
এদিকে অনুষ্ঠান চলাকালে আয়োজকদের হুঁশিয়ারি দিয়ে জাকসুর কার্যকরী সদস্য মোহাম্মদ আলী চিশতি ফেইসবুক পোস্টে লেখেন, “জনৈক কতিপয় ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে নিয়মের তোয়াক্কা না করে উচ্চস্বরে গান-বাজনা চালিয়ে শিক্ষার্থীদের মতামতকে তুচ্ছ করছেন। গভীর রাতে এমন আচরণ শিক্ষার্থীদের ধৈর্য ও সহনশীলতার সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ তৈরি করছে। সত্যিই কি তারা শিক্ষার্থীদের ক্রোধ ডেকে এনে পাশের লেকের অতিথি হতে প্রস্তুত?”
পরে এ বিষয়ে চিশতি বলেন, “মহান আল্লাহতায়ালাকে অবমাননার ঘটনায় সারাদেশের মুসলমান এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করেছে এবং কঠোর আইনগত ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছে। কিন্তু গতকাল আমরা দেখেছি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নাম করে একটি বিতর্কিত ইস্যুকে সামনে এনে একটি গোষ্ঠী মধ্যরাত পর্যন্ত উচ্চস্বরে গান বাজিয়েছে, যা অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করে।”
আরও পড়ুন:বাউলদের উপর হামলা-গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে জাবিতে 'বিচার গানের' আসর