দুই বছর ‘আত্মগোপনে’, ছেলে-মেয়ে-জামাইয়ের মৃত্যুতেও আসতে পারেননি মানিক পশারী, অভিযোগ মেয়ের
যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামীর নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার অন্যতম সাক্ষী ছিলেন মানিক পশারী।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সরকার পরিবর্তনের পর এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন পিরোজপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী; যিনি যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামীর নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার অন্যতম সাক্ষী ছিলেন।
এ সময় বীর মুক্তিযোদ্ধার সদর উপজেলার চিতলিয়া গ্রামের বাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। তিনি তখন গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় এক মেয়ের বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি আর এলাকায় ফিরতে পারেননি। এই সময়ের মধ্যে তার নিজের ছেলে-মেয়ে ও এক মেয়ের জামাই মারা গেলেও তিনি বাড়ি ফিরে তাদের মুখ দেখতে পারেননি।
হুমকি, ভয় আর আতঙ্কের কারণে মানিক পশারীর পাশাপাশি তার পরিবারের অন্য সদস্যদের অনেকও এলাকা ছেড়ে যান।
শনিবার রাতে সদর উপজেলার চিথলিয়া গ্রামে মানিক পশারীর বাড়িতে গেলে তার মেয়ে শিমু আফসোস করে এসব কথা বলছিলেন।
৫ অগাস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আত্মগোপনে চলে যান ৮৭ বছর বয়সী বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী। টুঙ্গিপাড়ায় আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় ২৪ অক্টোবর তার মৃত্যু হয়।
পরে পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হলে জামায়াত সমর্থিত কর্মীরা আপত্তি জানান বলে অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে পুলিশ লাইনে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানো হয়।
পরবর্তী সময়ে গভীর রাতে পুলিশ পাহারায় দাফন সম্পন্ন হয়। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র আলোচনার সৃষ্টি হয়।
এই অবস্থার মধ্যে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে এখনও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
মানিক পশারীর মেয়ে শিমু ও সৎ বোন হেনা বেগম এলাকায় থাকলেও রাতে তারা নিজ বাড়ির পরিবর্তে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে থাকছেন।
মানিক পশারীর চার মেয়ে ও এক ছেলে। এর মধ্যে এক মেয়ে ও ছেলে মারা গেছেন। শিশু চিতলিয়া গ্রামেই থাকেন। আরেক বোন পাশের গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে এবং অন্যজন গোপালগঞ্জে অবস্থান করছেন।
শিমু বলেন, ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তাদের ঘরে আগুন দেওয়া হয়। এরপর তিনি তার বাবা- মা, বোন ও ভগ্নিপতির সঙ্গে গোপালগঞ্জে চলে যান। এর তিন মাস পর তিনি বাড়িতে আসা শুরু করেন। এরপর মাঝেমধ্যে বাড়িতে এসে একমাত্র ছেলেকে নিয়ে থাকতেন। কিছুদিন পর আবার গোপালগঞ্জে চলে যেতেন।
তিনি বলছিলেন, তাদের এক বোন পারুল আক্তার প্রায় দেড় বছর আগে মারা যান। একমাত্র ভাই আসাদুল পশারী ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে প্রায় পাঁচ মাস আগে মারা যান।
এ ছাড়া পারুল আক্তারের স্বামী লাল মিয়া খলিফাও ছয়-সাত মাস আগে মারা যান।
মানিক পশারীর মেয়ে বলছিলেন, “তখন আমাদের বাবা গোপালগঞ্জে আত্মগোপনে ছিলেন। তার ছেলে-মেয়ে, জামাই- তিনজন মারা গেলেও তিনি কিন্তু বাড়ি আসতে পারেননি। মৃত ছেলে-মেয়ের মুখও তিনি দেখতে পারেননি।”
স্থানীয় কারও কাছ থেকে সরাসরি কোনো হুমকি না পেলেও বাবাকে দাফনের সময় সৃষ্ট পরিস্থিতির কারণে মানসিকভাবে কিছুটা আতঙ্কে রয়েছেন বলে জানান শিমু।
এ বিষয়ে পিরোজপুর সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রাধেশ্যাম সরকার বলেন, মানিক পশারীর পরিবারের সদস্যদের শঙ্কার বিষয়ে কেউ মৌখিক বা লিখিতভাবে কোনো অভিযোগ করেননি। তবে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুলিশ নিয়মিত ওই এলাকায় টহল দিচ্ছে।
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আমৃত্যু কারাদণ্ড হয়েছিল। এ মামলায় গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ছিলেন মানিক পশারী।
পরে ২০২৩ সালের ১৪ অগাস্ট রাতে কারা হেফাজতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী মারা যান।
