Published : 22 Jun 2026, 12:04 AM
দুই চোখের নিচে জমাট বেঁধে আছে রক্ত। মাথার পাশে, মুখে, এমনকি গলার নিচেও লালচে হয়ে ফুলে আছে। ফুটফুটে মুখটির বীভৎস অবস্থা দেখে শিউরে উঠছেন সবাই। নয় বছর বয়সী শিশুটিকে বেত দিয়ে পিটিয়ে মাদ্রাসা শিক্ষক এই অবস্থা করেছে বলে অভিযোগ করেছে পরিবারের সদস্যরা।
তারা বলছেন, বুধবার রাতে খুলনা নগরীর সোনাডাঙ্গা থানার ডাক্তারপাড়া এলাকার নুরুল কুরআন তাহফিজ অ্যাকাডেমিতে এ ঘটনা ঘটে।
শিশুটির বাবা ওমর ফারুক শিকদার বলেন, নগর সরকারি কলেজের (প্রাক্তন জয় বাংলা কলেজ) পাশে তাদের বাড়ি। শিশুটি তাদের একমাত্র সন্তান। তিনি খুলনার দারুল কুরআন সিদ্দিকিয়া মাদ্রাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস উত্তীর্ণ।
কোরআনে হেফজ করতে গতবছর তার ছেলেকে ওই মাদ্রাসায় ভর্তি করেন। দূরন্ত হওয়ায় তাকে আবাসিক মাদ্রাসায় রেখে হেফজ পড়ানো হচ্ছিল।
ওমর ফারুক বলেন, ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পর খবর পেয়ে শিশুটিকে উদ্ধার করেন তিনি। পরে চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যায়, মাথায় আঘাতের কারণে মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বেঁধেছে। গুরুত্বপূর্ণ একটি রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যার কারণে চোখের নিচে, মুখে ও গলার নিচে রক্ত জমাট বেঁধেছে। প্রাথমিক ওষুধে কাজ না হলে মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
ওমর ফারুক বলেন, “এভাবে কেউ কাউকে মারতে পারে? আগেও ওই শিক্ষক শিশুদের মারপিট করেছে বলে শুনেছি। ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পরও আমাকে জানানো হয়নি। দুই দিন পর ছেলেকে হাসপাতালে নিয়ে যাই।”
ডাক্তারপাড়া এলাকার মাদ্রাসাটিতে গিয়ে জানা গেছে, আমিনুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তির দোতলা ভবনের দ্বিতীয় তলা ভাড়া নিয়ে বছর দুয়েক আগে নুরুল কুরআন তাহফিজ অ্যাকাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন হাফেজ আবদুর রহমান নামের এক ব্যক্তি। কোনো ধরনের নিবন্ধন ছাড়াই ব্যক্তি উদ্যোগে চালু এই মাদ্রাসায় হেফজ, নাজেরা ও শুনানি বিভাগে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে।
আবদুর রহমান ওই ঘটনার পর থেকে পলাতক। তার মোবাইলও বন্ধ।
দীর্ঘক্ষণ ডাকাডাকির পর হাফেজ মাসুদ নামের এক শিক্ষক গেইট খোলেন। ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, পুরাতন ভবনের দ্বিতীয় তলায় কয়েকটি কক্ষে ২০ শিশু কোরআন পড়ছে। সবার বয়স আট থেকে ১৭ বছরের ভেতরে। কয়েকবার চেষ্টা করার পরও তাদের কেউই এ বিষয়ে মুখ খোলেনি।
হাফেজ মাসুদ বলেন, অভিভাবকদের অনুরোধে কোচিং সেন্টারের আদলে মাদ্রাসাটি চালু করেন আবদুর রহমান। তিনি একাই মাদ্রাসাটি পরিচালনা করেন।
জানুয়ারি মাসে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে হাফেজ মাসুদ যোগ দেন। ঘটনার সময় তিনি ছিলেন না। কীভাবে শিশুটিকে মারা হয়েছে তাও দেখেননি।
হাফেজ মাসুদ বলেন, পর দিন আবদুর রহমানের কাছে শুনেছেন, শিশুটি খুব দুষ্টুমি করত। পড়া না পারায় তাকে বেত দিয়ে মারা হয়। একপর্যায়ে শিশুটির মাথা দেয়ালে গিয়ে লাগে।
“পর দিন সকালে চোখ ও মাথায় রক্ত জমাট বাঁধা দেখে সবাই ভয় পেয়ে যায়। ফ্রিজ থেকে বরফ দেওয়া হয়। রাতে তার বাবা এসে নিয়ে হাসপাতালে যান।”
ঘটনাটি জানাজানি হলে স্থানীয়রা লাঞ্ছিত করে আবদুর রহমানকে বের করে দেন। দুদিন শিশুদের সঙ্গে হাফেজ মাসুদ মাদ্রাসায় অবস্থান করছেন।
শিশুটির বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পরিবারের সদস্য ও কয়েকজন নিকট আত্মীয় তাকে ঘিরে রয়েছে। শিশুটি ঘুম ঘুম চোখে সবার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকালেও কথা বলতে পারছিল না।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ঘুমের মধ্যেও আতঙ্কে কেঁপে উঠছে শিশুটি।
এ ব্যাপারে আইনগত কোনো পদক্ষেপ নিয়েছেন কিনা- জানতে চাইলে শিশুটির বাবা ওমর ফারুক বলেন, “অভিযোগ করে কী করব? ছেলে আগে সুস্থ হোক, তারপর ভেবে দেখব।”
নগরীর সোনাডাঙ্গা থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, “সংবাদ পেয়ে আমরা ওই মাদ্রাসায় যাই। শিশুটির বাবার সঙ্গে কথা বলে এজাহার দিতে বলেছি। কিন্তু তিনি রাজি হচ্ছেন না।”
ওসি বলেন, “পরিবার মামলা করলে আমরা ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।”