Published : 29 Aug 2025, 03:08 PM
রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভারত সীমান্তবর্তী চারটি ইউনিয়নে প্রতিদিনই তীব্র হচ্ছে পদ্মার ভাঙন।
পদ্মার তীব্র স্রোতে হারিয়ে গেছে শত শত বসতবাড়ি, হাজার হাজার বিঘা আবাদি জমি, মসজিদ-মাদ্রাসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ভাঙনের ফলে হাজারো মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার পাশাপাশি সীমান্তরক্ষী বিজিবির ক্যাম্পও ভাঙন ঝুঁকিতে পড়েছে।
গেল দুই বছরে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার চর আষাড়িয়াদহ ও দেওপাড়া এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর উপজেলার চর আলাতুলি ও চর দেবীনগর ইউনিয়নের অন্তত দশটি গ্রাম গত দুই বছরে বিলীন হয়েছে পদ্মার পেটে।
ভাঙনের কারণে কেউ কেউ একাধিকবার বাড়িঘর সরিয়ে নিয়েছেন দূরে; তারপরও রেহাই মেলেনি। তাদের বাকি সম্বলও এখন ঝুঁকির মুখে।
সব মিলিয়ে রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত এলাকার পদ্মা পাড়ের মানুষের দিন-রাত কাটছে নদী ভাঙন ও অস্তিত্ব হারানোর আতঙ্কে। বাংলাদেশের মানচিত্র থেকেও হারাতে বসেছে পদ্মা পাড়ের কয়েকটি গ্রাম।

চরাঞ্চলের মানুষরা বলছেন, সাময়িক প্রতিরক্ষা নয়, এখন জরুরিভাবে দরকার স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ। স্থায়ী সমাধান না হলে অচিরেই পুরো সীমান্তবর্তী গ্রাম ও অবকাঠামোগুলো বিলীন হয়ে যাবে।
চর আলাতুলি ইউনিয়নের কৃষক মো. ছিদ্দিক বলছিলেন, “এক সময় আমাদের গ্রামে এক হাজারের বেশি বাড়ি ছিল; এখন অর্ধেকও নেই। পদ্মা সব নিয়ে গেছে।
“বাকি যারা আছি, জানি না কালকে আছি না-কি থাকব না। আমরা চাই টেকসই বাঁধ, স্বচ্ছ কাজ আর দুর্নীতিমুক্ত প্রকল্প।”
চাঁপাইনবাবগঞ্জের দেবিনগর পোলাডাঙ্গা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্রিজ ভাঙনের মুখে। এক সময় পদ্মা থেকে তিন কিলোমিটার দূরে থাকা ব্রিজটি এখন স্রোতের ধারেই দাঁড়িয়ে। গ্রামবাসীর চলাচলের একমাত্র এ ভরসা পদ্মায় বিলীন হওয়ার পথে।
চর আষাড়িয়াদহ ও দেওপাড়া এবং চর আলাতুলি ও চর দেবীনগর ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিদের হিসাবে, গত এক দশকে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তবর্তী এলাকায় কয়েকটি গ্রামের পদ্মার ভাঙনে অন্তত দশ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। হারিয়ে গেছে কয়েক হাজার বিঘা জমি, বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনা।

এখনও অন্তত এক হাজার পরিবার সরাসরি ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে।
দেবীনগর ইউনিয়নের সাবেক সদস্য মারফত আলী বলেন, “পদ্মার ভাঙনে প্রতিনিয়ত সঙ্কুচিত হচ্ছে গ্রামগুলো। বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে হারাতে বসেছে পোলাডাঙ্গ ও হরমা গ্রাম। ভাঙনের কারণে সীমান্তের দায়িত্বে থাকা বিজিবি ক্যাম্পও পড়েছে ঝুঁকিতে।
“যদি ক্যাম্প নদীগর্ভে চলে যায় তবে সীমান্ত এলাকা কার্যত নিয়ন্ত্রণে নেবে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। এতে সীমান্ত নিরাপত্তায় ভয়াবহ সঙ্কট তৈরি হবে।’’
দেবীনগর ইউনিয়নের পোলাডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা সেন্টু আলী বলেন, “এখনো আমাদের গ্রামের প্রায় সাড়ে চারশ পরিবার আর হাজার একর জমি টিকে আছে। যদি ভাঙন প্রতিরোধ করা না যায়, তবে আমরা শুধু ঘরবাড়ি হারাব না সীমান্তও হুমকির মুখে পড়বে।”
চর আলাতুলির গৃহবধূ রেহানা খাতুন বলেন, “প্রতিবারই পদ্মার ভাঙনে ঘরবাড়ি রাতারাতি সরাতে হয়। শিশু, বৃদ্ধ, গৃহপালিত প্রাণী নিয়ে নিরাপদে থাকার কোনো উপায় নেই।
“রাতে ঘুমাতে পারি না। মনে হয় কখন ভিটেমাটি পদ্মায় নামিয়ে নেয়। একেক সময় মনে হয়, ঘরবাড়ির সঙ্গে আমরাও ভেসে যাব।”
দেবীনগর ইউনিয়নের হরমা গ্রামের আমিন আলী বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করলেও তা টেকসই হয়নি।
“যে ব্যাগে ২৫০ কেজি বালু ভরার কথা, সেখানে মাত্র ১০০ কেজি ভরে দায়সারা কাজ করা হয়েছে। এভাবে কাজ করলে নদী রোখা যাবে না।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ড আঞ্চলিক কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান অঙ্কুর বলেন, ‘‘ইতোমধ্যে কয়েকটি জায়গায় জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন প্রতিরোধে কাজ চলছে। ভাঙন ঠেকাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে এবং সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হচ্ছে। তবে স্রোত তীব্র হওয়ায় প্রতিরক্ষা কাজ টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’’