বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিজড়িত পাঁচুড়িয়া খালের প্রাণ ফিরল ৬৩ বছর পর

১৯৫৯ সালে পাঁচুড়িয়া খালের মুখে বাাঁধ দিলে শহর মধুমতি নদীর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। খালটি দূষণ আর দখলের হাত থেকে রক্ষার দীর্ঘদিনের দাবি ছিলো এলাকাবাসীর।

গোপালগঞ্জ প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 17 Nov 2022, 08:49 AM
Updated : 17 Nov 2022, 08:49 AM

মধুমতি নদীর সঙ্গে গোপালগঞ্জ শহরের পাঁচুড়িয়া খালের পুনঃসংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতি বিজড়িত খালটি দীর্ঘ ৬৩ বছর পর প্রাণ ফিরে পাওয়ায় শহরবাসীর মধ্যে খুশির বন্যা বইছে।

বৃহস্পতিবার সকালে শহরের পাঁচুড়িয়া পৌর নিউ মার্কেট এলাকায় পাঁচুড়িয়া খালের সঙ্গে শহর মধুমতি নদীর পুনঃসংযোগ স্থাপনের কার্যক্রম উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক শাহিদা সুলতানা।

শাহিদা সুলতানা বলেন, “জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতি বিজড়িত পাঁচুড়িয়া খালটিতে দীর্ঘদিন ধরে পানি প্রবাহ বন্ধ থাকায় দূষণ আর দখলে খালটি সংকীর্ণ হয়ে পড়েছিলো। এই খালটিকে ঘিরে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এটি শহরবাসীর একটি দর্শনীয় স্থান হবে। এছাড়া জেলাবাসী খালটিকে নানামুখী কাজে ব্যবহার করতে পারবেন।”

১৯৫৯ সালে পাঁচুড়িয়া খালের মুখে বাাঁধ দিলে শহর মধুমতি নদীর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এলাকাবাসী দীর্ঘদিন ধরে খালটি দূষণ আর দখলের হাত থেকে রক্ষার দাবি জানিয়ে আসলেও নানা কারণে উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। পরে জেলা প্রশাসক ও পৌর মেয়রের সহযোগিতায় গত ১ অক্টোবর পাঁচুড়িয়া খাল থেকে শহর মধুমতি নদীর সংযোগ স্থাপনের কাজ শুরু হয়।

খালের মুখ উন্মুক্ত করার খবরে বিপুল সংখ্যক মানুষ যখন খাল পাড়ে ভিড় করেন, তখন তাদের চোখ জ্বলজ্বল করছিলো অনন্দে। গলায় উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে তারা বলেন, খালের দুই পাড়ে বসবাস করা মানুষ দীর্ঘদিন পর নির্মল বাতাস উপভোগ করতে পারবে। খালের পানি দিয়ে তাদের নিত্যদিনের প্রয়োজন মিটবে; ব্যবহৃত হবে সেচ কাজেও। খালে মাছ ধরে মৎস্যজীবীরা জীবিকা নির্বাহ করতে পারবেন।

পাশাপাশি নৌ চলাচলের সুবিধাসহ মানুষের আর্থ সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটবে বলেও মনে করছেন তারা।

শহরের ব্যাংকপাড়া এলাকার সাংস্কৃতিক কর্মী নাজমুল ইাসলাম বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের গোপালগঞ্জ শহরের ব্যাংকপাড়ায় পৈতৃক বাড়ি রয়েছে। তিনি শহরের পাঁচুড়িয়া খাল দিয়ে টুঙ্গিপাড়া গ্রামের বাড়িতে আসা যাওয়া করতেন। বঙ্গবন্ধু তার অসমাপ্ত আত্মজীবনী বইয়ে এটি উল্লেখ করেছেন। পাঁচুড়িয়ার খালের সঙ্গে মধুমতি নদীর সংযোগ ছিল। পাঁচুড়িয়া খালপাড়ে পাকিস্তান সরকার খাদ্য গুদাম নির্মাণ করে। মধুমতি নদী ও পাঁচুড়িয়া খালের সংযোগ স্থলে প্রচণ্ড স্রোত ছিল।

পাঁচুড়িয়া খালপাড়ে পাকিস্তান সরকার খাদ্য গুদাম নির্মাণ করে। স্রোতের কারণে খাদ্যগুদাম সহ বসতবাড়ি ভাঙনের কবলে পড়তে পারে এমন আশঙ্কা ছিল। তাই ১৯৫৯ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার এ খালটির মুখে বাঁধ দেয়। ফলে শহর মধুমতি নদীর সঙ্গে পাঁচুড়িয়া খালের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

তিনি বলেন, মুজিব বর্ষ উপলক্ষ্যে ২০১৯ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি যাওয়ার নৌ-পথটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয় সরকার। গোপালগঞ্জ শহরের পাঁচুড়িয়া থেকে বর্ণি বাওড় হয়ে টুঙ্গিপাড়া বঙ্গবন্ধুর বাড়ি পর্যন্ত ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ নৌরুট খনন ও সৌন্দর্য বর্ধণের কাজ শুরু করে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

তখন ১০ কিলোমিটার খননের পর শহর অংশের ৮ কিলোমিটার খননের কাজ আর হয়নি। পাঁচুড়িয়া খালের সঙ্গে শহর মধুমতি নদীর সংযোগ স্থাপনে জাতীয় নদী কমিশনের সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তারা বেশ কিছু সুপারিশ করেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। দখল আর দূষণে খালটি বিপন্ন হয়ে পড়ে।

জেলা প্রশাসক এই খালটির বন্ধ মুখ অবমুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন জানিয়ে নাজমুল আরও বলেন, পৌর মেয়রের সহযোগিতায় গত ১ অক্টোবর পাচুড়িয়া খাল থেকে শহর মধুমতি নদীর সংযোগ স্থাপনের কাজ শুরু হয়। নিউ মার্কেট ও ওয়াপদা জামে মসজিদের মাঝের রাস্তা হয়ে জেলা সড়ক দিয়ে ১৫০ মিটার খনন করে এই সংযোগ স্থাপন করা হয়। এতে বেশ কিছু স্থাপনা ভাঙা পড়ে। জেলা সড়কের ওই স্থানে সড়ক ও জনপথ বিভাগ সেতু নির্মাণের প্রকল্প নিয়েছে।

গোপালগঞ্জ পৌরসভার মেয়র শেখ রকিব হোসেন জানান, দীর্ঘদিন ধরে খালটির পানি প্রবাহ আটকে রাখায় কচুরিপানা ও ময়লার স্তুপ তৈরি হয়েছিলো। দখলে ছোট হয়ে যাচ্ছিল খালটির প্রশস্থতা। পানি পচে দুর্গন্ধ ও মশামাছির প্রজনন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিলো।

তিনি বলেন, “পৌর মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর খালটির ময়লার স্তুপ অপসারণ ও কুচুরিপনা পরিষ্কার করেছি। পরবর্তীতে খালটি পানি প্রবাহ পুনঃস্থাপনের জন্য উদ্যোগ নিয়ে কাজ শুরু করি। বৃহস্পতিবার আমরা খালটির সঙ্গে মধুমতি নদীর সংযোগ স্থাপন করেছি। এটি আমাদের কাছে ঐতিহাসিক দিন।”

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফাইজুর রহমান বলেন, পাকিস্তান আমলে ১৯৫৯ সালে ফরিদপুর জেলা পরষিদ পাঁচুড়িয়া খালের মুখে বাাঁধ দেয়। তখন খালের সঙ্গে শহর মধুমতি নদীর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। দীর্ঘ ৬৩ বছর পর শহর মধুমতি নদী ও খালের সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। টুঙ্গিপাড়া উপজেলার শৈলদহ নদী থেকে ডুমুরিয়া খাল বর্ণি বাওড়ে এসে মিশেছে। আর বর্ণি বাওড় থেকে পাচুঁড়িয়া খাল শহর মধুমতি নদীতে পড়েছে।

পাঁচুড়িয়া খালের দৈর্ঘ্য ৮ কিলোমিটার; প্রস্থ ৪০ মিটার। আর বর্ণি বাওড় থেকে ডুমরিয়া খালের দৈর্ঘ প্রায় ২২ কিলোমিটার বলে জানান তিনি।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক