Published : 02 Feb 2026, 05:45 PM
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রশ্নে গণভোটের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কথা বলেছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রীয়াজ।
তিনি বলেছেন, “গণভোট এই সরকারের একার বিষয় নয়। গণভোট হচ্ছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রশ্ন। আমি, আপনি নাগরিক হিসেবে কী ভূমিকা রাখব, সেটার প্রশ্ন।”
সোমবার দুপুরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন আয়োজিত ‘গণভোট-২০২৬’ বিষয়ে জনসচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা সংক্রান্ত মতবিনিময় সভায় একথা বলেন তিনি।
গণভোটকে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই জানিয়ে আলী রীয়াজ বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার আর ১০ থেকে ১২ দিনের বেশি দায়িত্বে থাকবে না।
“কিন্তু বাংলাদেশ পরিবর্তনের জন্য যে ‘১৪০০ মানুষ প্রাণ’ দিয়েছে, ১৬ বছর ধরে ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে যারা লড়াই করেছে, যারা গুম হয়েছে, খুন হয়েছে, যে মায়ের বুক খালি হয়েছে, তারা আপনাকে আমাকে একটি দায়িত্ব দিয়ে গেছে। সেই দায়িত্ব আমাদের অনুভব করতে হবে।”
“বাংলাদেশকে যদি প্রকৃত অর্থে জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রে পরিণত করতে চাই, তাহলে সরকার নয়- আপনাকে, আমাকেই দায়িত্ব নিতে হবে। আর ‘হ্যাঁ’ ভোট আমাদের সেই সুযোগ এনে দিয়েছে”, যোগ করেন তিনি।
বিচার বিভাগ প্রসঙ্গে আলী রীয়াজ বলেন, “২০১৯ সালে জানুয়ারির সংবাদপত্রগুলো পড়লে বিচার বিভাগের ভয়াবহ অবস্থা বোঝা যায়। গ্রামের একজন মানুষ গায়েবি মামলায় জামিনের জন্য ঢাকায় ছুটেছে।

“জুলাই জাতীয় সনদ বলছে, বিভাগে বিভাগে হাই কোর্ট বেঞ্চ স্থাপন করতে হবে, উপজেলায় আদালত থাকতে হবে। ইনসাফ চাইলে আদালত মানুষের দোরগোড়ায় নিতে হবে।”
দুর্নীতি দমন কমিশন নিয়ে তিনি বলেন, “১৬ বছরে যে পরিমাণ টাকা লুট হয়েছে, তা দিয়ে দেশের সব মানুষের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা যেত। কিন্তু দুদককে কার্যত বিরোধী দল দমন কমিশনে পরিণত করা হয়েছিল। কারণ কমিশন প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছায় নিয়োগ পেতেন।
“জুলাই জাতীয় সনদে বলা হয়েছে, দুদক স্বাধীনভাবে কাজ করবে এবং সংসদের ফাইনান্সিয়াল ওভারসাইট কমিটিগুলো বিরোধী দলের সভাপতিত্বে হবে, যেন ক্ষমতাসীনদের প্রশ্ন করা যায়।”
রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শন প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রীয়াজ বলেন, “বর্তমান ব্যবস্থায় একজন দণ্ডিত ব্যক্তি রাষ্ট্রপতির কাগজে সই পেলেই মুক্ত হয়ে যেতে পারে।
“তবে জুলাই জাতীয় সনদ বলছে, ভবিষ্যতে এই সিদ্ধান্ত একটি কমিটির মাধ্যমে হবে; যেখানে ভুক্তভোগী পরিবারের সম্মতি প্রয়োজন হবে।”
সংবিধান সংশোধন নিয়ে তিনি বলেন, “সংবিধান সংশোধনকে ছেলে খেলায় পরিণত করা হয়েছে। দুই-তৃতীয়াংশ থাকলে ১৭ মিনিটে রাষ্ট্রব্যবস্থা বদলে ফেলা হয়েছে, ১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনী তার উদাহরণ।”
এ পরিস্থিতি ঠেকাতে উচ্চকক্ষ গঠনের পক্ষে মত দেন আলী রীয়াজ। বলেন, “উচ্চকক্ষ থাকলে সংবিধান সংশোধনে বিস্তৃত ঐকমত্য প্রয়োজন হবে। প্রতিটি ভোটের মূল্য বাড়বে।”
জরুরি অবস্থা প্রসঙ্গে আলী রীয়াজ বলেন, “বর্তমান সংবিধানে জরুরি অবস্থায় মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার পর্যন্ত কেড়ে নেওয়ার সুযোগ আছে। জুলাই জাতীয় সনদ বলছে, রাইট টু লাইফ কখনো স্থগিত করা যাবে না এবং জরুরি অবস্থা জারিতে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ থাকতে হবে।”
তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “ভোটারদের বড় অংশ ৩৭ বছরের নিচে। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ তাদের। আপনারাই যখন ডাক দিয়েছেন, মানুষ পথে নেমেছে। এখনো আপনারা বলতে পারেন, কেমন বাংলাদেশ চান।”

গণভোট প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রীয়াজ বলেন, “গণভোটের মার্কা হচ্ছে ‘টিক চিহ্ন’। যারা মার্কা দেখে বুঝতে চান, তাদের জন্য সেটাই যথেষ্ট। এই সুযোগ হেলায় হারানো যাবে না।
“অনেক প্রাণের বিনিময়ে আমরা এখানে এসেছি। ফ্যাসিবাদী সরকারকে সরাতে পেরেছি। রাষ্ট্র গঠনের লড়াই অসম্ভব নয়। দৃঢ়ভাবে দাঁড়ালে বাংলাদেশের মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ বলবে, বিশ্বাস করি।”
সভায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য আনোয়ার হোসেন বলেন, “আমাদের এমন একটি রাষ্ট্র হওয়ার কথা ছিল, যেখানে কাঠামোগত কারণে কোনো নাগরিক স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকারগুলোতে বৈষম্যের শিকার হবে না।
“কিন্তু সেটি হয়েছে? আর এ কারণেই আমাদের এত ক্ষোভ। বিগত সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগত অনিয়মের একটা শিকল তৈরি হয়েছিল, এই শিকল ভাঙতে না পারলে এগুলো ঠিক করা যাবে না।”
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, শিক্ষক, জুলাই আন্দোলনে আহত ও শহীদদের পরিবার এবং সমন্বয়করা বক্তব্য দেন।