গোপালগঞ্জে শীতে মাঠে নামতে পারছে না কৃষক, বোরো চাষ ব্যাহত
“গত বছর এ সময়ের মধ্যে অন্তত ২৫ হাজার হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হয়েছিল। সে তুলনায় এ বছর মাত্র অর্ধেক ধান আবাদ হয়েছে।”
নিম্ন জলাভূমি বেষ্টিত জেলা গোপালগঞ্জের অধিকাংশ জমি বছরের অধিকাংশ সময় পানির নীচে থাকে। এ কারণে এ জেলায় এক ফসলী জমি বেশি। শুধু শীতের (শুষ্ক) মৌসুমে এসব জমিতে বোরো ধান চাষাবাদ হয়।
তবে এবার বোরো আবাদ শুরুর পরই শীত জেঁকে বসেছে। প্রচণ্ড ঠান্ডায় কৃষক মাঠে নামতে পারছে না। কৃষি বিভাগও ধান রোপনে বয়স্কদের মাঠে নামতে নিষেধ করছে। ফলে বোরো চাষাবাদ ব্যাহত হয়ে উৎপাদন কমে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এছাড়া ঘন কুয়াশায় জেলার কোথাও কোথাও বোরো বীজতলা কোল্ড ইনজুরিতে পড়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের গোপালগঞ্জ খামারবাড়ির উপ-পরিচালক মো. মামুনুর রহমান বলেন, “এ বছর জেলার ৫ উপজেলায় ৮২ হাজার ৫৮৮ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সে লক্ষ্যপূরণে ৪ হাজার ২৬০ হেক্টর জমিতে বোরোর বীজতলা করার কথা কিন্তু কৃষক ৪ হাজার ৪৩০ হেক্টর জমিতে বীজতলা করেছে। ফলে কিছু বীজতলা কোল্ড ইনজুরিতে আক্রান্ত হলেও চাষাবাদ ব্যাহত হবে না।
“আমরা কোল্ডইনজুরি থেকে বীজতলা রক্ষায় কৃষককে পরামর্শ দিচ্ছি। তাদেরকে সালফার কনটেন্ট বালাই নাশক স্প্রে করতে বলছি। রাতে বীজতলায় পানি রেখে, সকালে ছেড়ে দিতে ও পলিথিন দিয়ে বীজতলা ঢেকে দিতে বলছি।”
মামুনুর রহমান বলেন, “তবে মাত্রাতিরিক্ত শীতের কারণে কৃষক মাঠে নামতে পারছে না। এ কারণে যেখানে গত বছর এ সময়ের মধ্যে অন্তত ২৫ হাজার হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হয়েছিল। সে তুলনায় এ বছর মাত্র অর্ধেক ধান আবাদ হয়েছে, ১২ হাজার ৩৪৬ হেক্টর জমিতে।”
ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, “গত ২৫ ডিসেম্বর থেকে গোপালগঞ্জে শীতের দাপট বেড়েছে। এখনো এটি অব্যাহত রয়েছে। তাই বয়স্ক কৃষককে আমার মাঠে না নামার পরামর্শ দিচ্ছি। আগামী ৭-৮ দিন এমন আবহাওয়া থাকলে কৃষির মারাত্মক ক্ষতি হবে।
“তবে ৩০ জানুয়ারির মধ্যে ধান রোপন শেষ করা গেলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশংকা নেই।”
সদর উপজেলার গোপীনাথপুর উত্তরপাড়া গ্রামের কৃষক রইচ খোন্দকার (৬৫) বলেন, “আমাগে এ্যালেকায় নীচে জমি বেশি। বছরে এ্যট্টা মাত্র ধান হয়। এ ধান দিয়ে সার বছর চলতি হয়। এহন চারা বানায় বইসে রইছি, শীতির চোটে ভূইতে (জমি) লাগাতি পরিতিছিনে। শীতে বীজতলায় চারা বাড়ছে না। আমাগে গ্রামের ধানের চারা হলুদ বা সাদা হয়ে গ্যাছে।”
টুঙ্গিপাড়া উপজেলার গোপালপুর গ্রামের কৃষক নিরঞ্জন বিশ্বাস (৫৫) বলেন, “আমাগে ৫২ শাতাংশের বিঘের ৩ বিঘে জমি পাথারে। জানুয়ারির ৮ তারিখির মধ্যি আনা বছর দেড় বিঘে জমির আবাদ হইয়ে যায়। এ বৎসর জম্বের শীত পড়িছে, তাই ক্ষ্যাতে নামতি পারতিছিনে। নামলি শরীরে কাঁপুনি দেয়। ক্ষ্যাতে বেশি সুমায় থাকতি পারিনে। এহন পর্যন্ত ৩০ শতাংশ জমি রোপন করতি পারছি।”
কাশিয়ানী উপজেলার নিজামকান্দি গ্রামের ফরমান আলী (৫০) বলেন, “ভূই ক্ষ্যাত চাষ দিছি। চারা বানাইছি। ধান লাগানুর জুন্নু বসে রইছি। শীতির কারণে ধান রুথি পারতিছিনে। চারার বয়েস বেশি দিন হয়ে যাতিছে। বেশি বয়েসি চারা রুলি ধানের ফলন কুমে যায়। ”
কোটালীপাড়া উপজেলার রাধাগঞ্জ গ্রামের কৃষক বিজন মন্ডল (৫২) বলেন, “ধান লাগাইতে এ্যরতেছিনে। তাই চারা লয়ে দুশ্চিন্তা পইড়গেছি। কৃষি বিভাগের পরামর্শ লইয়ে স্পেরে, পানি ধরে রাহা ও ছাইরগে দেওয়া সহ চারা রক্ষা হরতে লাগছি । কি হবে বোঝতে এ্যারছিনে।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক সঞ্জয় কুমার কুন্ডু বলেন, “৭ জানুয়ারি থেকে রোদ উঠছে। কৃষকও উৎসবের আমেজে মাঠে নামতে শুরু করেছে। সমস্ত প্রতিকূলতা কাটিয়ে কৃষক শেষ পর্যন্ত আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে অধিক খাদ্য উৎপাদন করবে। খাদ্য উদ্বৃত্ত এ জেলায় অধিক ফসল ঘরে তুলে কৃষক লাভবান হবেন। এটিই আমাদের প্রত্যাশা ।”
এদিকে গোপালগঞ্জ আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবু সুফিয়ান বলেন, গত ২৫ ডিসেম্বর থেকে এ জেলায় উত্তরের হিমেল হাওয়ার পাশাপাশি ঘন কুয়াশায় শীতের তীব্রতা শুরু হয়। এর আগে ৩১ ডিসেম্বর তাপমাত্রা ৭ দশমিক ৫ ডিগ্রিতে নামে। পরে ৭ জানুয়ারি সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৭ ডিগ্রি।
এ জেলার উপর দিয়ে মাঝারি শৈত্য প্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। সূর্যের দেখা মিলছে কম। এ কারণে শীত বেশি অনুভূত হচ্ছে।
তবে ১২ জানুয়ারির পর আবহাওয়া অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে ওই কর্মকর্তা জানান।
