১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

সুদানে নিহত শান্তিরক্ষী শামীমের বাবার আহাজারি, ‘আমার মুনি রে আনে দাও’

জাতিসংঘ শান্তি মিশনে বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীর ড্রোন হামলায় ছয় বাংলাদেশি নিহত এবং আটজন আহত হন।

রাজবাড়ী প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 14 Dec 2025, 09:20 PM

Updated : 26 Aug 2026, 05:19 PM

“আমার মুনি এক মাস সাত দিন আগে বিদেশ গেছে। শুক্রবারও কতা কইছি। তহন কলাম মুনি তোমার চোখ ফুলা ক‌্যা? মুনি কলো, আব্বু ঘুমাই ছিলাম। তারপর বললো, আব্বু তুমি ভালো থাকো ডিউটিতি যাবো। তারপর শনিবার আর কতা কয় নাই মুনি। আজ সকালে জানতে পারি আমার মুনি নাই। তুমরা আমার মুনি রে আনে দাও।”

কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন সুদানের আবেই এলাকায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনকালে বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীর ড্রোন হামলায় নিহত রাজবাড়ীর সন্তান সেনা সদস্য শামীম রেজার বাবা আলমগীর ফকির।

শামীম রেজার বাড়ি জেলার কালুখালি উপজেলার মৃগী ইউনিয়নের হোগলাডাঙ্গী গ্রামে। চলতি বছরের ৭ নভেম্বর তিনি সুদানে মিশনে যোগ দেন। 

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর-আইএসপিআর জানায়, শনিবার দুপুরে বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীর ড্রোন হামলায় ছয় বাংলাদেশি নিহত এবং আটজন আহত হন।

রোববার তাদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়েছে।

নিহতরা হলেন- কর্পোরাল মো. মাসুদ রানা (নাটোর); সৈনিক মো. মমিনুল ইসলাম (কুড়িগ্রাম), শামীম রেজা (রাজবাড়ী) ও শান্ত মন্ডল (কুড়িগ্রাম); মেস ওয়েটার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম (কিশোরগঞ্জ) এবং লন্ড্রি কর্মচারী মো. সবুজ মিয়া (গাইবান্ধা)।

আহত শান্তিরক্ষীরা হলেন—লেফটেন্যান্ট কর্নেল খোন্দকার খালেকুজ্জামান (কুষ্টিয়া), সার্জেন্ট মো. মোস্তাকিম হোসেন (দিনাজপুর), কর্পোরাল আফরোজা পারভিন ইতি (ঢাকা), ল্যান্স কর্পোরাল মহিবুল ইসলাম (বরগুনা); সৈনিক মো. মেজবাউল কবির (কুড়িগ্রাম), মোসা. উম্মে হানি আক্তার (রংপুর), চুমকি আক্তার (মানিকগঞ্জ) ও মো. মানাজির আহসান (নোয়াখালী)।

আহতদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে আইএসপিআর বলছে, তাদের মধ্যে সৈনিক মেজবাউল কবিরের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তার অস্ত্রোপচার করা হয়েছে।

রোববার দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, শামীমের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। চারপাশ কান্নার শব্দে ভারি হয়ে ওঠেছে। এলাকাবাসীরা শামীমের বাবা, ভাইকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। প্রতিবেশী নারীরা শামীমের মা ও স্ত্রীকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও কান্না থামাতে পারছে না। সেনা সদস‌্য ও স্থানীয় প্রশাসন এসে নিহত শামীমের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলছে।

শামীম রেজার চাচা আনিস বলেন, তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে শামীম ছিলেন সবার বড়। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগ দেন। কর্মজীবনের শুরু থেকেই তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। 

শামীমের ছোট ভাই সোহান ফকির বলেন, “গতকাল টেলিভিশনে সুদানের ঘটনার খবর দেখার পর থেকেই আমরা ভীষণ দুশ্চিন্তায় ছিলাম। ভাইয়ের মোবাইল ফোন বন্ধ ছিল। রাত ১২টার পর আমরা নিশ্চিত হই, ভাই আর নেই। শুক্রবারও বাড়িতে ভিডিও কলে কথা বলেছিল ভাই।” 

স্থানীয় মাসুদ, শাহজাহান, মাহবুব বিশ্বাস বলেন, এ ঘটনার পর থেকে শামীমের পরিবারের সদস‌্যরা ভেঙে পড়েছে। শামীম ছিলেন তার পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। তার পরিবার এখন কিভাবে চলবে? 

তারা দাবি করেন, শামীমের ছোট ভাই সোহান ফকিরকে যেন একটা চাকরির ব‌্যবস্থা করে দেয় সরকার।

কালুখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেজবাহ উদ্দিন বলেন, “শামীমের পরিবারকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহায়তা করা হবে। মরদেহ আসার বিষয়ে এখন পর্যন্ত যেটা জানতে পেরেছি ১৭ ডিসেম্বর আসবে। তবে এখনো নিশ্চিত না। আশা করি, আগামীকালকে সঠিক তথ‌্য জানতে পারবে।”

আরও পড়ুন:

সুদানে নিহত শান্তিরক্ষী: মায়ের আহাজারি, 'আমার জাহাঙ্গীররে এনে দাও

সুদানে নিহত শান্তিরক্ষী: বিকালে স্ত্রীর সঙ্গে কথা, রাতে সবুজের

সুদানে শান্তিমিশনে হামলা: হাতে-পায়ে স্প্লিন্টার নিয়ে হাসপাতালে চুমকি

সুদানে নিহত শান্তিরক্ষী: কান্না থামছে না মাসুদের স্ত্রী-মেয়ের, মূর্ছা যাচ্ছেন মা

সুদানে হতাহত শান্তিরক্ষীদের পরিচয় প্রকাশ

সুদানে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী ঘাঁটিতে হামলায় ৬ বাংলাদেশি নিহত