Published : 14 Dec 2025, 06:10 PM
সুদানে জাতিসংঘের (ইউএন) শান্তিরক্ষা মিশনের ঘাঁটিতে হামলায় নিহত ছয় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীর একজন গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার মো. সবুজ মিয়া।
তার মৃত্যুর খবরে উপজেলার মহদিপুর ইউনিয়নের ছোট ভগবানপুর গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। পরিবার, স্বজন ও গ্রামবাসীর কান্নায় ভারি হয়ে ওঠেছে পরিবেশ।
সবুজ মিয়া ওই গ্রামের মৃত হাবিবুর রহমান ও ছকিনা বেগমের ছেলে।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর-আইএসপিআর জানায়, শনিবার দুপুরে বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীর ড্রোন হামলায় ছয় বাংলাদেশি নিহত এবং আটজন আহত হন।
রোববার তাদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়েছে।
নিহতরা হলেন—কর্পোরাল মো. মাসুদ রানা (নাটোর); সৈনিক মো. মমিনুল ইসলাম (কুড়িগ্রাম), শামীম রেজা (রাজবাড়ী) ও শান্ত মন্ডল (কুড়িগ্রাম); মেস ওয়েটার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম (কিশোরগঞ্জ) এবং লন্ড্রি কর্মচারী মো. সবুজ মিয়া (গাইবান্ধা)।

আহত শান্তিরক্ষীরা হলেন—লেফটেন্যান্ট কর্নেল খোন্দকার খালেকুজ্জামান (কুষ্টিয়া), সার্জেন্ট মো. মোস্তাকিম হোসেন (দিনাজপুর), কর্পোরাল আফরোজা পারভিন ইতি (ঢাকা), ল্যান্স কর্পোরাল মহিবুল ইসলাম (বরগুনা); সৈনিক মো. মেজবাউল কবির (কুড়িগ্রাম), মোসা. উম্মে হানি আক্তার (রংপুর), চুমকি আক্তার (মানিকগঞ্জ) ও মো. মানাজির আহসান (নোয়াখালী)।
আহতদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে আইএসপিআর বলছে, তাদের মধ্যে সৈনিক মেজবাউল কবিরের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তার অস্ত্রোপচার করা হয়েছে।
পরিবার জানায়, মাত্র দুই বছর বয়সে বাবাকে হারান সবুজ। দরিদ্র পরিবারের সন্তান সবুজ অভাব অনটনের মধ্যে বড় হন।
এক মাস সাত দিন আগে ৭ নভেম্বর জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে যোগ দিতে সুদানে যান সবুজ মিয়া। সেখানে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অসামরিক লন্ড্রি কর্মচারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
সবুজের মৃত্যুর খবরে তার মা ছকিনা বেগম ও স্ত্রী নুপুর আক্তার বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন।
নুপুর আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “সুদানে যাওয়ার পর শনিবার বিকালে কয়েক মিনিটের জন্য ওর (সবুজ) সঙ্গে কথা হয়েছিল। এরপর রাত ১২টার দিকে খবর পাই ও আর নেই।”

ছেলে হারানোর খবরে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন মা ছকিনা বেগম। বিলাপ করত করতে তিনি বলছিলেন, “বাবা হামার একমাত্র বুকের ধন আছিল। গত মাসেই সুদান গেছে। ফোনে কথা কয়া খোঁজ নিত। এখন হামার খোঁজ নিবে কে? হামার বাবার লাশ বাড়িতে চাই। ওকে বাড়িতে আনলে হামার আত্মা শান্তি পাবে।”
সবুজের মৃত্যুতে গ্রামজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
গ্রামের আমিনুল ইসলাম বলেন, সবুজ ছিলেন অত্যন্ত ভদ্র ও পরিশ্রমী যুবক। মা ও স্ত্রীকে নিয়েই চলছিল তার ছোট সংসার। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তিনি। তার মৃত্যুর ফলে পরিবারটি এখন নিঃস্ব হয়ে পড়েছে।
পরিবার জানায়, এক ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবুজ ছিলেন ছোট। বড় বোনের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় মা ও স্ত্রীকে নিয়েই বাড়িতে থাকতেন তিনি। দেড় বছর আগে ২০২৩ সালের ৭ মার্চ নাটোর জেলার বাসিন্দা নুপুর আক্তারকে বিয়ে করেন সবুজ। তাদের কোনো সন্তান নেই।
সবুজ মিয়া প্রায় ১১ বছর আগে প্রতিবেশী এক চাচার মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অসামরিক ধুপি হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে তিনি লন্ড্রি কর্মচারীর পদে উন্নীত হন। তিন মাস আগে ছুটিতে বাড়িতে এসে আবার কর্মস্থলে যোগ দেন।
এ বিষয়ে পলাশবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ জাবের আহমেদ বলেন, “নিহতের বিষয়ে খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে এবং সরকারিভাবে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
আরও পড়ুন:
সুদানে হতাহত শান্তিরক্ষীদের পরিচয় প্রকাশ
সুদানে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী ঘাঁটিতে হামলায় ৬ বাংলাদেশি নিহত