১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

কেএনএফের ভয়ে এবার পাড়া ছাড়ল ৪৯ মারমা পরিবার

রাজনৈতিক হানাহানি ও অভিযানের কারণে বান্দরবানের মারমা, বম, খিয়াং জনগোষ্ঠীর সদস্যদের বারবার পাড়া ছেড়ে শহরে আশ্রয় নেওয়ার ঘটনা ঘটছে।

কেএনএফের ভয়ে এবার পাড়া ছাড়ল ৪৯ মারমা পরিবার

মারমা ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের ভবনে আশ্রয় নেওয়া মুয়ালপি পাড়ার মারমা পরিবারের লোকজন

উসিথোয়াই মারমা

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

বান্দরবান প্রতিনিধি

Published : 20 Apr 2023, 11:43 PM

Updated : 21 Apr 2023, 12:02 AM

সাম্প্রতিক সময়ে অস্থিরতার মধ্যে থাকা পার্বত্য জেলা বান্দরবানের রুমায় কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট–কেএনএফের ভয়ে এবার পাড়া ছাড়ল ৪৯ মারমা পরিবার।

পাইন্দু ইউনিয়নের মুয়ালপি পাড়া ছেড়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে তারা রুমা উপজেলা সদরে মারমা ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন ভবনে আশ্রয় নিয়েছেন।

পাহাড়ের আঞ্চলিক দলগুলোর রাজনৈতিক বিভেদ, হানাহানি, সশস্ত্র সংঘাত, অভিযান প্রভৃতি কারণে গত বছর থেকে দফায় দফায় মারমা, বম, খিয়াং জনগোষ্ঠীর সদস্যদের পাড়া ছেড়ে কখনও উপজেলা সদর, কখনওবা প্রতিবেশী দেশে পালানোর ঘটনা ঘটে।  

বৃহস্পতিবার পাড়া ছেড়ে আসা হ্লাথোয়াইচিং মারমা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, গত সোমবার [১৭ এপ্রিল] পাড়ার দুই মারমা যুবককে ধরে নিয়ে মারধর ও নির্যাতন করে কেএনএফ সদস্যরা। পরে পাড়াবাসীর অনুরোধে ছেড়ে দেওয়া হলেও ১৮ এপ্রিল আবার ধরে নিয়ে যায়।

“এ নিয়ে ১৯ এপ্রিল রুমা বাজারে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ করা হলে মুয়ালপি পাড়াবাসীদের প্রাণনাশে হুমকি দিতে থাকে। ঘরে ঘরে ঢুকে দরজায় আঘাত করে। ভয়ে সবাই পালিয়ে এসেছে।”

তবে বয়স্ক ব্যক্তিরা এখনও পাড়ায় রয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, “পরিস্থিতি ভালো না হলে তারাও কয়েক দিনের মধ্যে মারমা ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়শন হলে এসে আশ্রয় নিতে আসবে। মুয়ালপি পাড়া থেকে দুই ঘণ্টার বেশি হেঁটে আসতে হয়েছে। কিছু বম পরিবার পালিয়েও গেছে শুনলাম।”

এর আগে ২৯ জানুয়ারি কেএনএফের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চলাকালে আতঙ্কে মুয়ালপি পাড়া ছেড়ে রুমা বাজারে মারমা ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন ভবনে ৫১টি মারমা পরিবার এবং বম কমিউনিটি সেন্টারে ২০টি বম পরিবার আশ্রয় নেয়।

সে সময় কয়েকদিন পর আবার ফিরে যায় তারা। এর প্রায় তিন মাস পর এবার কেএনএফের ভয়ে পাড়া ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে পাড়া ছাড়তে হলো এই মারমা পরিবারগুলোকে। 

পাইন্দু ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য অংসাপ্রু মারমা বিডিনউিজ টোয়েন্টিফোর ডকমকবে বলেন, কেএনএফের নির্যাতনের ভয়ে মূয়ালপি পাড়া থেকে বৃহস্পতিবার বিকাল পর্যন্ত ৪৯টি পরিবার পালিয়ে এসেছে। তার মধ্যে পুরুষ ১১৫ জন ও মহিলা ১২১ জন। তারা মারমা ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন ভবনে আশ্রয় নিয়েছে।

“নির্যাতনের শিকার মংবাচিং মারমা ও মংনাক মারমা রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছে।”

Image

কেএনএফ নির্যাতনের শিকার মুয়ালপি পাড়ার দুই যুবক মংবাসিং মারমা ও মংনাক মারমা

অংসাপ্রু মারমা জানান, মুয়ালপি পাড়ায় বম সম্প্রদায়ের ৭৮টি পরিবার এবং মারমা সম্প্রদায়ের ৫০টি পরিবারের বসবাস রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেখানে অভিযানে গেলে ভয়ে বম জনগোষ্ঠীর সব পরিবার পালিয়ে যায়। রাতে ঘুমানোর সময় আসে। পালিয়ে থাকা অবস্থায় দিনের বেলায় জঙ্গলেই রান্নাবান্না করে খায় তারা।

তিনি আরও জানান, খেটে খাওয়া সাধারণ লোকজন এভাবে কয়েক দিন পর পর পালিয়ে থাকার কারণে তাদের স্বাভাবিক জীবনে বিশৃঙ্খলা আসছে। এটা নিয়ে কী করা যায় বৃহস্পতিবার রাতে মারমা ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন নেতৃবৃন্দ ও জনপ্রতিনিধি মিলে একটা সভা হওয়ার কথা রয়েছে।

বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে জানিয়ে রুমা সাঙ্গু কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও মারমা ওয়েলফেয়ার অ্যাসেসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সুইপ্রুচিং মারমা বলেন, যারা পালিয়ে এসেছে তাদেরকে সার্বক্ষণিক দেখভাল করা হচ্ছে। তাদের খাবার দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। মারমাদের বর্ষবরণ উৎসব সাংগ্রাই উপলক্ষ্যে অনেকেই আত্মীয়ের ঘরে বেড়াতে গেছে। এখনও বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।

“আশ্রয় নেওয়া লোকের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। ৫০টি মারমা পরিবারের মধ্যে ৪৯টি পরিবার পালিয়ে আসার হিসাব পেয়েছি।”

রুমা থানার পরিদর্শক মনির হোসেন জানান, সশস্ত্র সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট–কেএনএফ সদস্যরা পাড়াবাসীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করায় মুয়ালপি পাড়ার ৫০ মারমা পরিবার রুমা মারমা ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন ভবনে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।

রোয়াংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (রুমা উপজেলার দায়িত্বেও রয়েছেন) খোরুশেদ আলম চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে পালিয়ে আসা ৫০টি পরিবারের ২৩৬ জনের হিসাব পেয়েছি। তারা মারমা ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন ভবনে আশ্রয় নিয়েছে। এলাকবাসীর সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়েছে।”

এর আগে রোয়াংছড়ি ও রুমা উপজেলার মাঝামাঝি খামতাং পাড়ায় দুটি সশস্ত্র সংগঠনের গোলাগুলি ও আট জনের মৃত্যুর পরপর গত ৬ এপ্রিল [বৃহস্পতিবার] রাতে অন্তত ৮০টি পরিবারের আড়াইশ মানুষ অন্ধকারে যে যেভাবে পারে বাড়িঘর ছেড়ে পাশের জঙ্গল ও গির্জায় আশ্রয় নেন। পরদিন ভোরের আলো ফোটার পর তারা কাছের উপজেলা সদরে গিয়ে ওঠেন। তাদের অধিকাংশই খিয়াং নৃগোষ্ঠীর মানুষ, ধর্মে খ্রিস্টান।

এর তিন দিন পর [রোববার] আরও অন্তত ৩০০ পাড়াবাসী ভিটেমাটি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে চলে গেছে; যাদের অধিকাংশই বম সম্প্রদায়ের।   

গত বছরের অক্টোবর থেকে রুমা ও রোয়াংছড়ি উপজেলায় কেএনএফ, স্থানীয়ভাবে ‘বম পার্টি’নামে পরিচিত, এবং নতুন জঙ্গি সংগঠন ‘জামাতুল আনসার হিল ফিন্দাল শারক্বীয়া’র বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান চালাচ্ছে সেনাবাহিনী ও র‌্যাব। কখনও কখনও তাদের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে।

এর জের ধরে জানুয়ারির শেষে রুমার কয়েকটি পাড়া থেকে মারমা ও বম জাতিগোষ্ঠীর লোকজন গহীন পাহাড়ের বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে শহরে চলে আসেন। সেসময় পাইন্দু ইউনিয়নের অন্তত ৫১টি মারমা ও ২০টি বম পরিবার সবকিছু ফেলে রুমা বাজারের মারমা ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের হল রুমে এবং বম কমিউনিটি সেন্টারে আশ্রয় নেয়। চার-পাঁচদিন পরে তারা আবার পাড়ায় ফিরে যায়।

মার্চের শুরুর দিকে অভিযানের মধ্যে ‘আতঙ্কে’ রুমা ও আশপাশের এলাকা থেকে ৩০০ থেকে ৪০০ মানুষ সীমান্ত পার হয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়। অন্তত ছয়টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সে সময় বন্ধ হয়ে যায়।

আরও পড়ুন:

পুরানো খবর:

বান্দরবানে ৮ খুন: নেপথ্যে কী?

পুরানো খবর:

বান্দরবানে ৮ হত্যাকাণ্ডের পর বাড়ি ছেড়েছে আরও প্রায় ৩০০ পাড়াবাসী

পুরানো খবর:

বান্দরবানে গোলাগুলিতে নিহত ৮ জনই বম জনগোষ্ঠীর

পুরানো খবর:

গোলাগুলির পর এবার ভিটেমাটি ছাড়ল পাহাড়ের আড়াইশ খিয়াং

পুরানো খবর:

বান্দরবানে সশস্ত্র দুই সংগঠনের গোলাগুলি, ৮ লাশ উদ্ধার