Published : 21 May 2026, 09:55 AM
কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে তিনটি মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জ অংশে ভোগান্তির আশঙ্কা করছেন এ পথে চলাচল করা যাত্রী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।
এর মধ্যে এশিয়ান হাইওয়েতে (ঢাকা বাইপাস) ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক সংস্কার কাজ চলমান থাকায় এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দীর্ঘ যানজটের আশঙ্কা করছেন তারা।
সড়ক-মহাসড়কের পাশে পশুরহাটের ইজারা না দেওয়ার ব্যাপারে প্রতিবছর নির্দেশনা থাকলেও জেলা প্রশাসন এবার সদর উপজেলার সাইনবোর্ড ও সোনারগাঁ উপজেলার কাঁচপুর এলাকায় দুটি হাটের ইজারা দিয়েছে।
দুটি হাটই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে। ফলে পশু আনা-নেওয়া ঘিরে মহাসড়কে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
তবে ঈদযাত্রা ও কোরবানির পশুবাহী যান চলাচলে ভোগান্তি কমাতে জেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ ও সড়ক বিভাগ কাজ করছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

একদিকে সংস্কার ও অন্যদিকে ছোট বড় গর্ত
নারায়ণগঞ্জের মদনপুর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত বিস্তৃত ঢাকা-বাইপাস আঞ্চলিক মহাসড়কটি ‘এশিয়ান হাইওয়ে বলে অধিক পরিচিত। অপ্রশস্ত সড়কটি চারলেনে উন্নীত করার কাজ চলছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভাঙা সড়কজুড়ে ছোট-বড় গর্ত। এতে এখনই দীর্ঘ যানজটে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে যা ঈদযাত্রায় আরও বাড়বে।
সরেজমিনে এ মহাসড়কের মদনপুর, নয়াপাড়া ও বস্তুল এলাকায় বেশকিছু ছোট-বড় গর্ত দেখা যায়। এসব গর্তে জমে ছিল বৃষ্টির পানিও। সবচেয়ে বেশি করুণ অবস্থা এ মহসড়কটির কাঞ্চন সেতু এলাকায়।
সড়ক সংস্কার কাজ চলমান থাকায় যানজটে বসে থাকতে হয় জানিয়ে পিকআপ ভ্যান চালক মোশারফ বলেন, “যানজট তো লাইগাই থাকে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয়। রাস্তা ভাঙা, কাজ চলতেছে কিন্তু তা তো খুবই স্লো।”
সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক ইব্রাহিম হোসেন বলেন, “এই সমস্যায় আমরা তিন-চার বছর ধইরা ভুগতেছি। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে বাইশ ঘণ্টাই এখানে জ্যাম লাইগা থাকে। গর্তে একটা চাকা পড়লে ওঠার আর সুযোগ নাই। ঈদযাত্রায় এই সমস্যা আরো অনেক বাড়বো।”
মদনপুর অংশে দায়িত্ব পালন করছিলেন কাঁচপুর হাইওয়ে থানার এসআই কাজল কান্তি নাথ। তিনি বলেন, “এই রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ। কিছুদূর পরপর ভাঙা। যদিও সংস্কার কাজ চলমান আছে। কিন্তু রাস্তা খুব একটা প্রশস্ত না হওয়ায় গাড়ির চাপ সামলানো যায় না।”
“আমরা দিন-রাত কাজ করতেছি। আমাদের টিমও বাড়ানো হয়েছে”, যোগ করেন এ সার্জেন্ট।

এ বিষয়ে গাজীপুর রিজিওনাল হাইওয়ে পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার বদিউল আমিন চৌধুরী বলেন, “ভাঙাচোরা রাস্তার সংস্কার কাজ চলমান থাকায় চ্যালেঞ্জ রয়েছে ঠিকই কিন্তু আমরা এ নিয়ে পরিকল্পনাও করেছি। বিশেষ স্থানগুলোতে হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন থাকবে। একইসঙ্গে জেলা পুলিশ ও জেলা প্রশাসন থেকে আনসার সদস্যরাও থাকবেন মহাসড়কে।”
এ মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীতের কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সড়ক বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম। তবে, কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি কিছু জানাতে পারেননি।
সাইফুল বলেন, “এ প্রকল্পের দায়িত্বে রয়েছে সড়ক বিভাগের প্রধান কার্যালয়। কাজ কতটুকু এগিয়েছে, তা তারা বলতে পারবেন।”
ছয় লেনের কাজের ধীরগতিতে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ভোগান্তি
দেশের অন্যতম ব্যস্ত ঢাকা-সিলেট মহাসড়কটির ছয় লেনে উন্নীত করার কাজ ধীরগতিতে চলার কারণে গত চার বছর ধরে যানজট ও ধুলোবালির ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। সঙ্গে আছে অবৈধভাবে মহাসড়কে চলা তিন চাকার যানের দৌরাত্ম্য।
সরেজমিনে গত দু-তিন এ মহাসড়কের কাঁচপুর, যাত্রামুড়া, বরাব, রূপসি ও ভুলতা এলাকায় যানজট দেখা যায়। সড়কের বেশকিছু জায়গায় গর্ত, বৃষ্টির পানি জমে থাকার কারণে কোথাও কোথাও দীর্ঘ জট না থাকলেও দ্রুতগামী যানবাহন ধীরগতিতে চলতে দেখা গেছে। তবে, কয়েকটি স্থানে সাময়িকভাবে গর্ত ভরাটে সংস্কার কাজ চলতে দেখা গেছে।
রোববার বিকালে মহাসড়কটির তারাব বিশ্বরোড এলাকায় অন্তত ২৫ মিনিট ধরে কাঙ্ক্ষিত বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে পাওয়া যায় গৃহিনী মোসাম্মৎ সাথীকে। রূপগঞ্জ উপজেলার দিঘীবরাব এলাকার এ বাসিন্দা যাবেন রাজধানীর গুলিস্তানে।
তিনি বলেন, “প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছি কিন্তু বাস আসতে পারছে না। কারণ, যানজট। যানজট না থাকলে পাঁচ মিনিট পরপরই গাড়ি পাওয়া যেতো।”
“এ সমস্যা গত তিন-চার বছর ধরেই চলছে, কবে শেষ হবে তাও বোঝা যাচ্ছে না”, যোগ করেন তিনি।
যানজটের কারণে এ পথে গন্তব্যে পৌঁছাতে কয়েকগুণ বেশি সময় লাগে, বলছিলেন ব্যবসায়ী মনির হোসেন। সুতাবোঝাই পিকআপ ভ্যান নিয়ে তিনি বিশ্বরোড এলাকাতেই ২০ মিনিট ধরে বসে আছেন বলে অভিযোগ করেন।

“এ রাস্তার কাজই তো শেষ হয় না। আজকে বৃষ্টি হওয়াতে ধুলা নাই। নাহলে ধুলাতেও বসে থাকা যায় না। সরকারকে বলি, এ কাজটা দ্রুত যেন শেষ করে।”
এ মহাসড়কটিতে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে হাইওয়ে পুলিশের পাশাপাশি জেলা পুলিশের সদস্যদেরও কাজ করতে দেখা যায়।
সড়কে দায়িত্ব পালনরত জেলা পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের এএসআই মো. সাহাবুল বলেন, সংস্কার কাজের কারণে যানবাহনের গতি ধীর হলেই দীর্ঘ যানজট দেখা দেয়। তবে, তারা কয়েকটি পয়েন্টে কাজ করছেন।
লাঠি হাতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে দেখা যায় এক পরিবহন শ্রমিক নেতাকেও। মো. জহিরুল ইসলাম নামে ওই নেতা বলেন, সংস্কারকাজ ছাড়াও তিনচাকার ধীরগতির যানবাহনের অবাধে মহাসড়কে চলাচলও যানজটের আরেকটি কারণ।”
ছোট দুর্ঘটনায়ও দীর্ঘ জট ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে
এদিকে, সড়কের অবস্থা ভালো থাকলেও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কেও যানজটের আশঙ্কা করছেন এ পথের যান চালকরা। বিশেষত মহাসড়কের টোল প্লাজায় টোল সংগ্রহের ধীরগতি কিংবা দুর্ঘটনা বা যানবাহন বিকল হলেই চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়।
বাঁধন পরিবহনের বাস কন্ডাক্টার মঞ্জুর হোসেন বলেন, “এই রাস্তায় গর্ত বা ভাঙা তেমন নাই। কিন্তু এইখানে টোলপ্লাজায় টোল কালেকশনে দেরি হলেই জ্যাম লেগে যায়। তাছাড়া, কোথাও অ্যাক্সিডেন্ট হলে বা গাড়ি নষ্ট হয়ে গেলে মুহূর্তের মধ্যে লম্বা জ্যাম লেগে যায়।”
গত শুক্রবারও মেঘনা টোলপ্লাজা এলাকায় এক দুর্ঘটনার কারণে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়, এতে সাড়ে তিন ঘণ্টা এক জায়গাতেই বসে থাকতে হয়েছিল জানিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন এ পরিবহন শ্রমিক।
পাশাপাশি এই মহাসড়কের যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে যাত্রী-ওঠানামার কারণেও যানবাহনের ধীরগতি তৈরি হয়। যা ঈদযাত্রায় আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আশঙ্কা করছেন যাত্রীরা।
একইসঙ্গে বিভিন্ন স্থানে এলোমেলো পার্কিংও সড়কে গাড়ির জটলা তৈরি করে বলে অভিযোগ আছে।

পর্যাপ্ত জনবল মোতায়েনের প্রস্তুতি প্রশাসনের
যোগাযোগ করা হলে তিনটি মহাসড়কের একই সমস্যার কথা তুলে ধরেন জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) সোহেল রানাও।
তিনি বলেন, “ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দড়িকান্দি সেতুতে ছোট ছোট খানাখন্দ আছে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে সংস্কার কাজ চলছে। যাত্রামুড়া সেতুতে গাড়ি বেশি আটকে যাচ্ছে। বৃষ্টি হলে সড়কের প্রশস্ততাও কমে আসে। অন্যদিকে, কাঞ্চন-ভুলতা-বস্তুল-মদনপুরে এশিয়ান হাইওয়েতেও কাজ চলমান থাকায় যানজট দেখা যায়।”
এ তিন মহাসড়কের আশেপাশের আঞ্চলিক সড়কেও যানজট দেখা দিলে তার প্রভাব মহাসড়কে পড়ে বলেও জানান তিনি।
“আমরা প্রতিটি পয়েন্টে কনসার্ন অথরিটিকে বিষয়গুলো জানিয়েছি। ঈদের আগে অন্তত রাস্তাগুলোকে দ্রুত সংস্কার করার তাগিদ দিয়েছি। ঈদযাত্রা এবং কোরবানির পশুবাহী যানবাহন চলাচলে কোনো বিঘ্ন যাতে না ঘটে সেজন্য আমরা পর্যাপ্ত জনবল মোতায়েনের প্রস্তুতি নিয়েছি,” বলেন ওই কর্মকর্তা।

ঈদযাত্রা ভোগান্তিহীন করতে নানা উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির। তিনি বলেন, “রোজার ঈদে মানুষকে স্বাচ্ছন্দ্যে ঈদযাত্রা করতে দিতে সক্ষম হয়েছি। এবারও কিছু সমস্যা আমরা আইডেন্টিফাই করেছি। সেসব বিষয় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথাও হয়েছে। সড়ক বিভাগকে কাজ দ্রুত করার জন্য তাগিদ দেওয়া হয়েছে।”
মহাসড়কের পাশে পশুরহাট বসা নিয়ে জানতে চাওয়া হলে জেলা প্রশাসক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা মহাসড়কের পাশে হাট স্থাপনের বিষয়ে আগ্রহী ছিলাম না। কিন্তু সাইনবোর্ড ও কাঁচপুরের ওই স্থানে অনেক বছর ধরে হাট বসছে।
“ঐতিহ্যবাহী এ দুটি হাটের বিষয়ে এলাকাবাসীরও অনেক অনুরোধ ছিল। তাই ইজারা দিতে হয়েছে। কিন্তু হাটের কারণে যাতে সড়ক-মহাসড়কে কোনও বিশৃঙ্খলা না ঘটে, সেবিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিকভাবেও সেখানে আলাদা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।”
এ ছাড়া জেলা পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশের পাশাপাশি মহাসড়কে আনসার সদস্যরাও ট্রাফিকের দায়িত্বে থাকবেন বলে জানান জেলা প্রশাসক।