Published : 29 Dec 2025, 05:54 PM
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে কুড়িগ্রামের চারটি আসনে নির্বাচনি তৎপরতা জোরালো হয়ে উঠেছে। শহর-গ্রাম মুখর হয়েছে ভোটার ও প্রার্থীদের পদচারণায়।
উত্তরাঞ্চলের জেলা কুড়িগ্রামে রয়েছে নয়টি উপজেলা এবং চারটি সংসদীয় আসন। নির্বাচনি এলাকাগুলোতে সভা-সমাবেশ, উঠান বৈঠকের পাশাপাশি পোস্টার-বিলবোর্ড ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালাচ্ছেন প্রার্থীরা।
পাশাপাশি স্থানীয় ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে নিজেদের উপস্থিতির জানান দিচ্ছেন তারা। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ প্রার্থীদের সঙ্গে এবার কয়েকজন তরুণ প্রার্থীও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন।
আওয়ামী লীগহীন ভোটের মাঠে কুড়িগ্রামের চারটি আসনে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তবে জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশ নিতে পারলে হিসাব বদলে যেতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন।
কুড়িগ্রাম-২ আসনের প্রার্থী ও জেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক পনির উদ্দিন আহমেদ বলছেন, “সদরের এ আসন বরাবরই জাতীয় পার্টির ঘাঁটি ছিল। ধারাবাহিক ভাবে বিজয় লাভ করে লাঙ্গল।
“শুধুমাত্র গত ২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে অল্প ভোটে পরাজিত হই। এখানকার সাধারণ মানুষ মুখিয়ে আছে জাতীয় পার্টিকে ভোট দেওয়ার জন্য। আমাদের সাংগঠনিক ভিত অনেক মজবুত। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিজয় আমাদের নিশ্চিত।”
আর কুড়িগ্রাম জেলার চারটি নির্বাচনি আসেনর মধ্যে কম পক্ষে তিনটি আসেনে লাঙ্গল প্রতীকের জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি এ কে এম মোস্তাফিজুর রহমান।
কুড়িগ্রাম ১: জয়ের আশা জাপার, বিএপিরও
নাগেশ্বরী ও ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে বিএনপির টিকেট পেয়েছেন সাবেক এমপি ও কেন্দ্রীয় সদস্য সাইফুর রহমান রানা। মনোনয়ন পাওয়ার পর ধানের শীষ প্রতীকে ভোট পেতে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
তবে প্রার্থী পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে বিক্ষোভ অব্যাহত রেখেছেন কেন্দ্রীয় ড্যাবের যুগ্ম-সহ্সচিব ইউনুছ আলীর সমর্থকরা।
অন্য দলগুলোর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলাম, ইসলামী আন্দোলনের হারিসুল ইসলাম রনি এবং খেলাফত আন্দোলনের শহিদুল ইসলাম ফয়েজিও প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন।
জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি মোস্তাফিজুর রহমান, গণঅধিকার পরিষদের বিন ইয়ামিন মোল্লাসহ আরও কয়েকজন সম্ভাব্য প্রার্থীও জনসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।
বরাবরের মত এ আসনে স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন ভূরুঙ্গামারী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল হাই মাস্টার।
জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি এ কে এম মোস্তাফিজার রহমান কুড়িগ্রাম-১ আসনের পাঁচবারের সংসদ সদস্য। আওয়ামী লীগের প্রার্থী আসলাম সওদাগরের কাছে ২০১৮ সালের নির্বাচনে পরাজিত হলেও ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “নির্বাচনে প্রার্থী হতে জাপার কোনো আইনগত বাধা নেই। নির্বাচন কমিশন যদি আইনশৃঙ্খলা এবং সবার জন্য সুযোগ নিশ্চিত করতে পারে তা হলে কুড়িগ্রাম যে জাতীয় পার্টির ঘাঁটি তা প্রমাণ হবে।”
নাগেশ্বরী ও ভূরুঙ্গামারী উপজেলা ২৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত কুড়িগ্রাম-১ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ২৯ হাজার ১৬৩ জন।
দীর্ঘ নদীপথ এবং ভারতীয় সীমান্তবর্তী অঞ্চল হওয়ায় সীমান্তবাসীর নিরাপত্তা এবং মাদক ও গবাদিপশু চোরাচালান রোধ জনপ্রতিনিধিদের জন্য একটি বড় ‘চ্যালেঞ্জ’।
বিএনপির মনোনয়ন পাওয়া কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান রানা প্রতিটি নির্বাচনে ‘ভালো ভোট’ পেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকেন। নির্বাচনি এলাকার শহর ছাড়াও প্রত্যন্ত চরাঞ্চলগুলোতে তার জনপ্রিয়তা রয়েছে।
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে সামান্য ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে ‘কারচুপি’ করে শেষ মুহূর্তে হারিয়ে দেওয়া হয় বলে তার অভিযোগ।
রানা বলেন, “এ আসনে বিএনপির ভোট ব্যাংক থাকলেও জোট মহাজোটের কারণে বিএনপির প্রার্থী বারবার পরাজিত হয়েছে। আমার জনসংযোগ অব্যাহত রয়েছে। জনগণের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি।”
দুধকুমারের ভাঙনরোধ, কালিগঞ্জে দুধকুমার সেতু, সোনাহাট স্থলবন্দরে ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট চালু ও কর্মসংস্থানের জন্য ইপিজেড স্থাপন উন্নয়ন পরিকল্পনায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
এ আসনে জামায়াতে ইসলামের প্রার্থী রংপুর মডেল কলেজ সহকারী অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, “বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ন্যায় ও ইনসাফের ভিত্তিতে বৈষম্যহীন সমাজ কায়েম করে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়। নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কথা বলে প্রধান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছি।”
ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী হারিসুল ইসলাম রনি বলেন, “নির্বাচিত হলে নদী ভাঙন রোধ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পাশাপাশি ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে কাজ করব।”

কুড়িগ্রাম-২: উন্নয়ন, নদীভাঙন ও কর্মসংস্থান
‘জাতীয় পার্টির দুর্গ’ হিসেবে পরিচিত এ আসনে এবারও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবহ বিরাজ করছে।
এ আসনে বিএনপির সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ, জামায়াতে ইসলামীর ইয়াছিন আলী সরকার, ইসলামী আন্দোলনের মাওলানা নুর বখত মিয়া, এনসিপির আতিক মুজাহিদ ও খেলাফত আন্দোলনের মুফতি নুরুদ্দীন কাশেমীকে দল প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে।
এদিকে জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি পনির উদ্দিন আহমেদ ও নাগরিক অধিকারের মেজর (অব.) আব্দুস সালামও মাঠে প্রচার চালাচ্ছেন।
এছাড়া গণঅধিকার পরিষদ ও এবি পার্টিসহ আরো কয়েকটি দল প্রার্থী ঘোষণা দেবে বলে শোনা যাচ্ছে। আর বাম জোটের পক্ষ থেকে কমিউনিস্ট পার্টির আনছার আলী প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
সদর, ফুলবাড়ি ও রাজারহাট উপজেলার ২১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত কুড়িগ্রাম-২ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৬৭ হাজার ২০২ জন।
বিএনপির প্রার্থী সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে জনসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। ‘তারুণ্যের প্রতীক’ হিসেবে তিনি সাড়া ফেলেছেন।
কায়কোবাদ বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে শহর ও গ্রামের প্রতিটি পথে-প্রান্তরে প্রচার চালানোর পাশাপাশি মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে থেকেছি। নির্বাচিত হলে দীর্ঘদিনের উন্নয়ন বঞ্চনা ঘুচিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নদী ভাঙন, মাদক নিয়ন্ত্রণ ও চরের উন্নয়নে কাজ করব।”
জামায়াতে ইসলামীর ইয়াছিন আলী সরকারও জনমানুষের অধিকার বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি সামনে রেখে ভোটারদের ঘরে ঘরে যাচ্ছেন।
ইয়াসিন বলছেন, “নির্বাচিত হলে দারিদ্যপীড়িত কুড়িগ্রামে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা, দরিদ্র জনগোষ্ঠী ও বেকার ভাই-বোনদের বেকারত্ব দূর করতে বন্ধ টেক্সটাইল মিলটি পুনরায় চালু করা হবে।
“পাশাপাশি নদী শাসন করে ধরলা নদীতে ধরলা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়নসহ নানামুখী উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দারিদ্র্য ঘুচানোর চেষ্টা করব।”
ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী কুড়িগ্রাম আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা নুর বখত মিয়া সাংগঠনিক মজবুত ভিত্তি ও চরমোনাই পীরের ভোট ব্যাংক অটুট রাখার দৃঢ় প্রত্যয়ে প্রচার চালাচ্ছেন।
আর এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক আতিক মুজাহিদ নির্বাচন সামনে রেখে ব্যাপক গণসংযোগ করছেন।
নুর বখত মিয়া বলেন, “ইসলামী আন্দোলনের বিরাট ভোটব্যাংক রয়েছে কুড়িগ্রাম-২ আসনে। জনগণ সুষ্ঠুভাবে ভোট দিতে পারলে আমার বিজয় হবে।”
এনসিপির আতিক মুজাহিদ বলেন, “তরুণ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চার শতাধিক চরে প্রয়োজনীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও চরভিত্তিক কর্মসংস্থানের উদ্যোগ গ্রহণ, তরুণদের কর্মসংস্থানে কুড়িগ্রাম হাইটেক পার্ক নির্মাণ, শিল্প সংস্কৃতির উন্নয়নে কুড়িগ্রাম শহরের পাশে ধরলা নদীর তীরে ২০ তলা ‘কুড়িগ্রাম টাওয়ার’ নির্মাণসহ বেশ কিছু ব্যতিক্রমী ও জনবান্ধব কর্মসূচি রয়েছে।”
কুড়িগ্রাম-২ আসনে সাত বার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন জাতীয় পার্টির তাজুল ইসলাম চৌধুরী, একসময় তিনি মন্ত্রীও ছিলেন।
২০০১ সালে জাতীয় পার্টি থেকে লাঙল প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হন তিনি। ২০০৮ সালে দলটির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ নির্বাচিত হলেও তিনি আসনটি ছেড়ে দিলে উপ-নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জাফর আলী বিজয়ী হন।
পরে ২০১৪ সালে তাজুল ইসলাম চৌধুরী জাতীয় পার্টি লাঙল প্রতীকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে জাতীয় পার্টির প্রার্থী পনির উদ্দিন আহমেদ লাঙল প্রতীক নিয়ে সংসদ সদ্য নির্বাচিত হন। তবে ২০২৪ সালের নির্বাচনে পনিরকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য হন স্বতন্ত্র প্রার্থী হামিদুল হক।
কুড়িগ্রাম-২ আসনের এনসিপির প্রার্থী এবং রংপুর বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক আতিক মোজাহিদ বলেন, এবার কুড়িগ্রামের মানুষ উন্নয়ন বণ্টনবৈষম্যের বিষয়ে বুঝতে পেরছেন। তাই আগের মতো ভুল করবে না ভোটাররা। এখন তারুণ্যের জয়জয়কার অবস্থা।
তিনি বলেন, “গ্রাম শহর সর্বত্র মানুষের মাঝে পরিবর্তনের আওয়াজ উঠেছে। রাজনীতির পুরাতন বন্দোবস্ত পরিবর্তন ঘটাতে গত বছর ৫ আগস্টের পর থেকে মাঠ চষে বেড়াচ্ছি। মানুষের আকাঙ্খা বুঝতে পেরেছি। আমার বিশ্বাস এ আসেন আমাদের বিজয় সুনিশ্চিত।”

কুড়িগ্রাম-৩: বিএনপিতে প্রার্থী বদলের চাপ
এ আসনে বিএনপির প্রার্থী, দলের চেয়ারপারসনের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা এবং জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি তাসভীর উল ইসলাম গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।
অন্যদিকে বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল খালেকের সমর্থকরা প্রার্থী পরিবর্তনের জন্য আন্দোলন করছেন।
এছাড়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় অফিস সম্পাদক ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব আলম সালেহী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী আক্কাস আলী সরকার ও গণ অধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদের সদস্য এস এম নুরে এরশাদ সিদ্দিকী ও খেলাফল মজলিসের মামুনুর রশীদ প্রার্থী হিসেবে প্রচার চালাচ্ছেন।
উলিপুরের জনগণের উন্নয়নে জন্য কাজ করতে চান বিএনপি প্রার্থী তাসভীর উল ইসলাম।
তিনি বলেন, “আমি একজন শিল্প উদ্যেক্তা মানুষ হিসেবে আগামী দিনে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলে নদীভাঙ্গন রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ও বেকার সমস্যা সমাধানে জুট মিলসহ শিল্প কলকারখানা স্থাপন করব।”
আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে বিএনপির কোনো ‘বিকল্প নেই’ মন্তব্য করে বিএনপি প্রার্থী বলেন, “উলিপুরের নির্বাচনের মাঠ সেভাবেই তৈরি হয়েছে।”
উলিপুর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত কুড়িগ্রাম-৩ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৪৭ হাজার ২৬২ জন।
আসনটি এক সময় জাতীয় পার্টির ঘাঁটি থাকলেও দুই দশক ধরে জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে পালাবদলের মাধ্যমে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে আসছে। এবারে বিএনপির পাশাপাশি ছাড় দিতে নারাজ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনও।
১৯৯১ সালে কুড়িগ্রাম-৩ সংসদীয় আসনে আওয়ামী লীগের আমজাদ হোসেন তালুকদার নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৯৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত আসনটি জাতীয় পার্টির দখলে ছিল।
এই আসনে জাতীয় পার্টির এমপি প্রয়াত এ কে এম মাইদুল ইসলাম বেশ কয়েকবার নির্বাচিত হয়ে একাধিকবার মন্ত্রীও হয়েছিলেন। তবে এরশাদের মৃত্যুর পর জাপার সাংগঠনিকভাবে অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে।
২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এম এ মতিন নির্বাচিত হন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি কম থাকলেও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সৌমেন্দ্র প্রসাদ পান্ডে গবা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
জামায়াতের প্রার্থী আলম সালেহী বলেন, “স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরেও সাম্য মানবিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার যে প্রতিশ্রুতি ছিল তা পূরণ হয়নি। আমার আন্তর্জাতিক অঙ্গন এবং বাংলাদেশে যে অভিজ্ঞতা রয়েছে এসব অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে মাস্টারপ্লান অনুযায়ী শিক্ষা, কর্মসংস্থান, বাসস্থান, স্বাস্থ্য, মানবিক ও আধুনিক আত্মনির্ভরশীল উলিপুর গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখি।”
আসনটি ফিরে পেতে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া উলিপুর উপজেলা জাতীয় পার্টির সদস্য সচিব আব্দুস সোবহান বলেন, যদি আসন্ন নির্বাচন ‘সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক’ হয় তাহলে জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশ নেবে এবং উলিপুর থেকে তিনি লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্ধিতা করবেন। এজন্য তিনি শহর গ্রাম সর্বত্র চষে বেড়াচ্ছেন।
এ আসনের জাতীয় পার্টির প্রার্থী আব্দুস সোবহান বলেন, “গত নির্বাচনে ইন্জিনিয়ারিং করে আমাকে হারিয়ে দেওয়া হয়। অথচ এ আসনটিতে বরাবরই জাতীয় পার্টির রিজার্ভ ভোট ব্যাংক রয়েছে। যা আর কোনো দলের নেই।
“আমি গত নির্বাচনের পর থেকে গ্রাম গঞ্জে হাটে মাঠে চষে বেড়াচ্ছি। মানুষের সুখে দুঃখে পাশে থাকছি। নদী ভাঙন বন্যা সব সময় পাশে থেকেছি। তরুণ ও যুবকদের খেলাধুলা এবং সামাজিক কাজে পাশে থাকছি ধারাবাহিক ভাবে। তাই বিশ্বাস করি সামনের নির্বাচনে জনগণ আমার পাশে থাকবে।”

কুড়িগ্রাম-৪: দুই ভাই দুই দলের প্রার্থী
চিলমারী, রৌমারী ও চর রাজিবপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে প্রধান দুটি দল থেকে দুই ভাই প্রার্থী হওয়ায় নানা আলোচনা চলছে। এখানে বিএনপির প্রার্থী আজিজুর রহমান ও জামায়াতের প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক আপন ভাই।
আজিজুর রহমান রৌমারী উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি। আর মোস্তাফিজুর রহমান রৌমারী উপজেলা জামায়াতের সাবেক আমির।
এই ‘পারিবারিক লড়াইয়ের’ ভেতরেও বিএনপির প্রার্থী আজিজুর রহমানের জন্য নতুন অস্বস্তি তৈরি করেছেন জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক সম্পাদক মমতাজ হোসেন লিপি। প্রার্থী পরিবর্তনের দাবি জানানোসহ এলাকায় জনসংযোগ অব্যাহত রেখেছেন তিনি।
এ আসনে জয় পেতে প্রত্যন্ত চরাঞ্চল চষে বেড়াচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী সাবেক উপজেলা আমির মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাকও।
এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী সহকারী অধ্যাপক হাফিজুর রহমান, খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মুফতি শাহাদত হোসাইনও প্রচারে ব্যস্ত।
গণসংযোগ করছেন গোলাম হাবীব দুলাল, রুকুনুজ্জামান শাহীন, নদী চর ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ সাদ কাশেম ও এনসিপির রৌমারী উপজেলা শাখার সদস্য সচিব জোবায়েদ হোসেন।
১৫টি ইউনিয়নের কুড়িগ্রাম-১ আসনটিতে মোট ভোটার ৩ লাখ ৩৮ হাজার ৪০৬।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মধ্যে লড়াইয়ের সম্ভবনা রয়েছে। নির্বাচন সামনে রেখে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার উন্নয়ন, নদীভাঙন রোধ, সীমান্তে নিরাপত্তা, মাদক প্রতিরোধ, শিক্ষা-স্বাস্থ্যের উন্নতি ও বেকার সমস্যার সমাধান চান ভোটাররা।
আসনটিতে ২০০১ সালে জাতীয় পার্টির প্রার্থী গোলাম হাবিব দুলাল লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের টিকিট নিয়ে নৌকা প্রতীকে জাকির হোসেন, ২০১৪ সালে জাতীয় পার্টি-জেপির রুহুল আমিন বাইসাইকেল প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে ফের নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের জাকির হোসেন।
সব শেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাবেক ছাত্রনেতা বিপ্লব হাসান পলাশ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
বিএনপির প্রার্থী আজিজুর রহমান আজিজুর রহমান বলেন, “প্রতিনিয়ত নদ-নদী ভাঙনে দিশেহারা এই অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের পাশাপাশি ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন রোধে স্থায়ীভাবে সমাধানে কাজ করব।
“চরের কোমলমতি শিশুদের পড়াশোনার মান উন্নয়ন, রৌমারীতে ট্রেন চলাচলের ব্যাবস্থা, ব্রহ্মপুত্র নদে সেতু নির্মাণে কাজ করার পরিকল্পনা আছে।”
জামায়াতে ইসলামীর মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক বলেন, “দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও বঞ্চনার শিকার এই অঞ্চলের মানুষের জীবন মান উন্নয়নে কাজ করব। এলাকায় কর্মসংস্থানের ব্যাবস্থা করব যাতে তাদের কাজের জন্য ঢাকায় যেতে না হয়। ব্রহ্মপুত্র নদে একটি সেতু দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।”
নির্বাচিত হলে নদী ভাঙন রোধ, যোগাযোগ ব্যাবস্থার উন্নয়ন, কৃষি খাতে আধুনিকরণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবা সম্প্রসারণের আশা দিয়েছেন ইসলামী আন্দোলনের মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক হাফিজুর রহমান।
তিনি বলেন, “মানুষের আশা-আকাঙ্খাকে সামনে রেখে উন্নয়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।”
জাতীয় পার্টির (জেপি) সাবেক সংসদ সদস্য রুহুল আমিন বলেন, “নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হওয়ার পর যদি আসন্ন নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয় তাহলে দলীয় সিদ্ধান্ত মোতাবেক নির্বাচনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।”