Published : 10 Apr 2026, 11:19 AM
পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ খেলাধুলা। সময়ের বিবর্তনে অনেক খেলা হারিয়ে গেলেও তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের হাত ধরে আজও টিকে আছে তাদের জাতীয় খেলা ‘ঘিলা’।
প্রতি বছরের মত এবারও পাহাড়ের বর্ষবরণ বা ‘বিষু’ উৎসবকে কেন্দ্র করে এই নান্দনিক খেলার জমজমাট আয়োজনে মেতেছে তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠী।
পাহাড়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বর্ষবরণ উৎসব শুরু হচ্ছে ১৩ এপ্রিল থেকে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নানা আয়োজনে এ উৎসব চলবে সপ্তাহজুড়ে।
এই বর্ষবরণ উৎসবকে ঘিরে প্রতি বছর তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায় ঘটা করে ‘ঘিলা খেলা’র আয়োজন করে। এক সময় এটি পাহাড়ের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হলেও বর্তমানে আনুষ্ঠানিকভাবে কেবল তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের মধ্যেই এ খেলার প্রচলন রয়েছে।
তঞ্চঙ্গ্যাদের কেন্দ্রীয় বিষু উৎসব উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক উজ্জ্বল তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, এবারে বিষু উৎসব উপলক্ষে ১২ এপ্রিল বিকালে বান্দরবানে রোয়াংছড়ি উপজেলা সদরে বেক্ষ্যং স্কুলের মাঠে আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে বান্দরবান ও রাঙ্গামাটি জেলার তঞ্চঙ্গ্যা অধ্যুষিত বিভিন্ন পাড়া থেকে ৪০টি ‘ঘিলা খেলা’ দলের ৮০০ খেলোয়ার অংশ নেবেন।
“এরই মধ্যে ৩২টি দল চূড়ান্ত করা গেছে। তার পাশাপাশি বিভিন্ন পিঠাপুলির আপ্যায়ন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও পরিবেশন করা হবে। বিষু ফুল ভাসানো হবে ১২ এপ্রিল।”

‘ঘিলা খেলা’র উৎপত্তি যেভাবে
তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের লোকজনের মতে, ‘ঘিলা খেলা’র সূচনা ঠিক কবে থেকে তা নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। তবে এটি যে বহু পুরনো তা বলা যায়। এক সময় এই খেলাটি সারা বছরই হত।
‘ঘিলা খেলা’ পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক ছোটন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, “কখন থেকে এই খেলা প্রচলন হয়েছে সুনির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। কিন্তু অনেক আগে এটা শুরু হয়েছে বলা যায়। সে সময় এটা সারা বছরেরই খেলা ছিল। তখনকার দিনে পাড়া-গ্রামে এখনকার মত ফুটবল, ক্রিকেট বা ক্যারামের প্রচলন ছিল না। ঘন অরণ্যে প্রকৃতির ফুল-ফলের উপর নির্ভর ছিল সবাই। ফলে ছেলেমেয়েরা বন-জঙ্গল থেকে ‘ঘিলা’ ফল সংগ্রহ করে নিজেদের মত করে খেলত।
“এ ছাড়া তঞ্চঙ্গ্যা সমাজের কোনো কারবারী (পাড়াপ্রধান), হেডম্যান কিংবা মহাজনদের ঘরে বেশ ঘটা করেও ‘ঘিলা খেলা’ আয়োজন করা হত। বিভিন্ন পাড়া থেকে লোকজন এসে এই খেলায় অংশ নিতেন। যার ঘরে আয়োজন করা হত এই খেলা, তারা খেলোয়ারদের শুকর অথবা ছাগলের মাংস দিয়ে ভাত খাওয়াতেন। সাধারণত বৈশাখ মাসে জুমচাষের জন্য জঙ্গল কাটার পর শুকানো হত। এর বাইরে জুমে অন্য কোনো কাজ থাকে না তখন। এই সময়ে আবার বিষু উৎসব চলে আসে। সামাজিকভাবে বিষু উৎসবে ‘ঘিলা খেলা’র আয়োজন করা হত। এদিনে মুরুব্বিদের কাছ থেকে আর্শীবাদও নেওয়া হত।”

তিনি বলেন, “এভাবে পরবর্তীতে ‘ঘিলা খেলা’ আনুষ্ঠানিকভাবে বর্ষবরণ বিষু উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। খেলার পাশাপশি ঘিলা ফলকে সবসময় সুন্দর ও পবিত্রতম প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
“কোনো শিশু ভূমিষ্ট হওয়ার পর ঘিলা ফলের বীজ দোলনার এক পাশে ঝুলে রাখা হত। আবার কেউ কেউ ঘরে দরজার উপর বা দেয়ালেও ঝুলিয়ে রাখতেন। তাদের বিশ্বাস, এই ঘিলা ফল থাকলে অপদেবতারা আসতে পারে না। আসন্ন কোনো বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা পেয়ে থাকেন তারা।”
সেই বিশ্বাস থেকে এখনও বিভিন্ন পাড়া-গ্রামে ঘিলা ফল ব্যবহার করতে দেখা যায়। তবে বর্তমান সময়ে অনেকেই একে সৌন্দর্যের প্রতীক এবং দুর্লভ বস্তু হিসেবে সংগ্রহ করে রাখেন। বিশেষ করে পাহাড়ে বিভিন্ন খাবার রেস্তোরাঁ, দোকান ও কিছু কিছু এনজিও অফিসে ঘিলা ফল ঝুলিয়ে রাখতে দেখা যায়।
খেলার নিয়ম
ছোটন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ‘ঘিলা খেলা’র চারটি ধরন থাকলেও বর্তমানে মূলত ‘কুচুক’ ও ‘মত্ত’- এই দুই ধরনই বেশি প্রচলিত। আগে খেলোয়াড়ের সংখ্যা নির্দিষ্ট ছিল না, তবে এখনকার নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি দলে ১১ জন করে খেলোয়াড় মাঠে নামেন। অতিরিক্ত আটজন খেলোয়াড় ও একজন টিম ম্যানেজারসহ একটি দলে মোট ২০ জন সদস্য থাকেন। এ ছাড়া প্রতিটি দলে বাধ্যতামূলকভাবে অন্তত চারজন নারী খেলোয়াড় রাখতে হয়।

তিনি বলেন, ‘মত্ত’ ধরনের খেলায় বড় পিচ বা মাঠ প্রয়োজন হয়। এ কারণে তুলনামূলকভাবে ‘কুচুক’ পদ্ধতিতেই বেশি খেলা অনুষ্ঠিত হয়। এবারের আয়োজনেও ‘কুচুক’ পদ্ধতিতে খেলার জন্য মোট ১৭টি পিচ প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রতিটি পিচের নাম দেওয়া হয়েছে ঐতিহ্যবাহী নামে।
“প্রতিটি পিচের দৈর্ঘ্য ১৮ ফুট এবং প্রস্থ ১২ ফুট নির্ধারণ করা হয়েছে। আর খেলায় ব্যবহৃত প্রতিটি ঘিলার বীজের আকার চারদিক থেকে অন্তত চার ইঞ্চি হতে হবে।”
এ ছাড়া বাংলাদেশ তঞ্চঙ্গ্যা কেন্দ্রীয় বিষু উৎসব উদযাপন কমিটি লিখিতভাবে ‘ঘিলা খেলা’র নিয়ম তৈরি করেছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ‘ঘিলা খেলা’য় মোট ১৩টি রাউন্ড রয়েছে। সেগুলো হল কুচুক, তত্তরা, তত্তরা কুচুক, আদু, ঘারা, ঘারা কুচুক, জিং, আঙ্গুল (খ্যগা), তোয়াৎতোয়া, সামালেক, লাপজাপ, ঘ হক ও ভব্বই।
তার মধ্যে ঘারা রাউন্ডে দুই পয়েন্ট, সামালেক রাউন্ডে তিন পয়েন্ট, ভব্বই রাউন্ডে পাঁচ পয়েন্ট এবং বাকি রাউন্ডে এক পয়েন্ট করে নির্ধারণ করা হয়েছে।
‘ঘিলা খেলা’য় প্রতিটি রাউন্ডকে তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় ‘উজান্তি’ বলা হয়। একটি পিচে ১১টি ঘিলার বীজ দণ্ডায়মান অবস্থায় সাজানো থাকে। প্রতিটি রাউন্ডে দুই দলের সদস্যরা পর্যায়ক্রমে একজন করে খেলোয়াড় অংশ নেয়। খেলোয়াড়কে পা ও হাঁটু ব্যবহার করে বিশেষ কৌশলে একটি ঘিলার বীজ ছুড়ে ফেলতে হয়।

ছোড়া বীজটি পিচের যে স্থানে গিয়ে পড়ে, সেখান থেকেই খেলোয়াড় হাতের আঙুল দিয়ে টোকা মেরে সাজানো অন্যান্য ঘিলার বীজ ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। এভাবেই প্রতিটি ‘উজান্তি’ রাউন্ডে খেলা এগিয়ে চলে।
পাড়ায়-পাড়ায় প্রস্তুতি
বিষু উৎসবে ‘ঘিলা খেলা’য় অংশ নেওয়ার আগে চলে যার যার দলের প্রস্তুতি। যারা খেলায় অংশ নেবেন তাদের পাড়ায় এখন থেকে চলছে সে ধরনের প্রস্তুতি। একটা দলে ২০ জন করে সদস্য থাকে। তবে খেলায় অংশ নেন ১১ জন।
তার মধ্যে একজন ব্যবস্থাপক রয়েছেন, যিনি সার্বিকভাবে দল পরিচালনা করেন বলে জানিয়েছেন বান্দরবান শহরে ‘ঘিলা খেলা বালাঘাটা একাদশ’ দলের সহকারী ব্যবস্থাপক রঞ্জন তঞ্চঙ্গ্যা।
তিনি বলেন, “আমাদের দল অনেক পুরনো। যখন থেকে বিষু উৎসবে ‘ঘিলা খেলা’ শুরু হয়েছে, তখন থেকেই দলটি আছে। প্রত্যেক বছর অংশগ্রহণ করা হয়। এবার ‘ঘিলা খেলা’য় অংশ নেওয়ার জন্য মার্চের ২৩ তারিখ থেকে প্রস্তুতি নেওয়া শুরু হয়েছে।

“এক দলে ১১ জন খেলোয়ার হলেও অতিরিক্ত ৩০-৪০টা ঘিলা ফলের বীজ রাখতে হয়। অনেক সময় খেলার পর ফেটে যায় অথবা হারিয়ে যায়। এজন্য উৎসবের আগে প্রত্যেক বছর নতুন করে সংগ্রহ করতে হয়।”
রোয়াংছড়ি উপজেলা সদরে বটতলা পাড়া বাসিন্দা ও কেন্দ্রীয় বিষু উৎসব উদযাপন কমিটির সদস্য চন্দনজয় তঞ্চঙ্গ্যা বলছিলেন, “জাতীয় ‘ঘিলা খেলা’ তঞ্চঙ্গ্যাদের একেবারে সংস্কৃতির অংশ। আগে আমাদের পূর্বপুরুষরা খেলত। এক সময় যুবক বয়সে আমরাও খেলেছি, নেতৃত্ব দিয়েছি। এখন বিভিন্ন পাড়ার যুবক-যুবতীরা উৎসবের সময় খেলে। ১৯৯৪-৯৫ সালের দিকে প্রথমবারের মত তঞ্চঙ্গ্যাদের ‘জাতীয় ঘিলা খেলা গোল্ড কাপ টুর্নামেন্ট’ প্রতিযোগিতা আমাদের এখানে আয়োজন করা হয়েছিল।
“এখন একেক বছর একেক জায়গায় আয়োজন করা হয়। আমাদের রোয়াংছড়ি বটতলা পাড়া দল ২০১৭ ও ২০১৮ সালে প্রতিযোগিতায় টানা দুইবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। মাঝখানে কোভিডের কারণে ‘ঘিলা খেলা’ হয়নি। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত প্রত্যেক বছর নিয়মিত হয়ে আসছে। এ বছর আমরা স্বাগতিক দল হিসেবে আছি। প্রত্যেক দিন সন্ধ্যায় আমাদের পাড়ার দলে ‘ঘিলা খেলা’ চর্চা করা হয়।”
‘ঘিলা’ ফল স্থানীয় উদ্ভিদ
‘ঘিলা’ ফলের ইংরেজি নাম Entada rheedii। এটি ‘African Dream Herb’ (আফ্রিকান স্বপ্নের ভেষজ) নামেও পরিচিত। এই উদ্ভিদটি দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার ও ইন্দোনেশিয়া ছাড়াও দক্ষিণ আফ্রিকা এবং অস্ট্রেলিয়াতেও পাওয়া যায়। এটি Mimosoideae উপগোত্রভুক্ত একটি বড় কাঠজাত লতা বা আরোহী উদ্ভিদ, যা প্রায় ১২০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে।

এর বীজের খোসা অত্যন্ত শক্ত ও টেকসই হওয়ায় এগুলো দীর্ঘ সময় সমুদ্রের পানিতে ভেসে থাকতে পারে। গাছের বাকল বাদামি রঙের এবং পাতা সাধারণত ২-৪ জোড়া, সমসংখ্যক ও উল্টো ডিম্বাকার আকৃতির। ফুলের রঙ হালকা ক্রিম বা ফ্যাকাসে সাদা। সাধারণত এটি জঙ্গল বা নদীর ধারের আর্দ্র পরিবেশে জন্মে।
‘ঘিলা’ খেলার আয়োজকেরা জানান, এক সময় আশপাশের বনজঙ্গলেই এই ফল সহজে পাওয়া যেত। কিন্তু বন উজাড় হওয়ার কারণে এখন আর আগের মতো সহজলভ্য নয়। বর্তমানে এটি মূলত দুর্গম রিজার্ভ বন বা ঘন জঙ্গলে পাওয়া যায়। ফলে দিন দিন এটি দুর্লভ হয়ে উঠছে।
দূরবর্তী বনাঞ্চলে বসবাসকারী লোকজনের মাধ্যমে সংগ্রহ করে আনতে হচ্ছে বলেও তারা জানান।
বনের উপাদানের সঙ্গে উৎসব জড়িত
পাহাড়ে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর উৎসব ও খেলাধুলা সম্পর্কে জানতে চাইলে বান্দরবান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইন্সটিটিউটের (কেএসআই) পরিচালক নুক্রাচিং মারমা বলেন, “পাহাড়ের প্রতিটি সম্প্রদায়ের নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও খেলাধুলা রয়েছে, যার বড় একটি অংশ সরাসরি বনের উপাদানের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। মূলত বনের গাছপালা, বিভিন্ন ফল ও ফুল এই অঞ্চলের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।”
“ঘিলার বীজ হারিয়ে গেলে একটা ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলাও হারিয়ে যাবে। আগের মত বন না থাকায় এগুলো এখন দুষ্প্রাপ্য হয়ে যাচ্ছে। তবে এগুলো রক্ষার্থে মানুষ আগের তুলনায় সচেতনও হচ্ছে।”