Published : 28 Nov 2024, 11:37 AM
খাগড়াছড়ির রামগড় পৌর শহরের বিভিন্ন এলাকায় দেখা মিলছে ‘বিপন্ন’ প্রজাতির চশমাপরা হনুমান। কয়েক বছর ধরে পৌরসভার ডেবারপাড়, জগন্নাথপাড়া, গর্জনতলী এলাকায় এরা বিচরণ করছে।
কয়েক বছর আগেও এদের সংখ্যা ছিল ১৩ থেকে ১৫টি; তবে বর্তমানে তা বেড়ে ২০ থেকে ২৫টি হয়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দা নিজাম উদ্দিন লাভলু জানান।
তিনি বলেন, “আমার বাড়ির পিছনে হনুমানের দলটি প্রায়ই হানা দেয়। বাঁশ ঝাড়ের কচি ডগা খেয়ে সাবাড় করে দিয়েছে। এ ছাড়া ফলের মৌসুমে এরা প্রায়ই এসে আম, কাঁঠাল খেয়ে যায়। তবে এখন গাছের কচি পাতা খায়। কয়েকদিন পর পর তারা আসে। দলবদ্ধভাবে আসে; কিছুক্ষণ অবস্থান করে আবার চলে যায়।”

এরই মধ্যে কয়েকটি হনুমান বৈদ্যুতিক তারে জড়িয়ে মারা গেছে জানিয়ে নিজাম উদ্দিন লাভলু বলেন, “খাবারের অভাবেই মূলত তারা লোকালয়ে মানুষের কাছাকাছি আসছে। অনেকে গুলতি বা টিল ছুড়ে তাদের তাড়ানোর চেষ্টা করছে। এতে আহতও হয়।”
দুই চোখের চারপাশে গোলাকার বৃত্তের মত সাদা রং থাকায় এদের ‘চশমাপরা’ হনুমান বলে। ইংরেজি নাম Phayre's Leaf Monkey; বৈজ্ঞানিক নাম Trachypithecus phayrei.
এদের শরীরের বেশিরভাগ অংশই ধূসর কালো রঙের। লেজ বেশ লম্বা। লোমশ শরীর। মাথা ও শরীরের দৈর্ঘ্য ৫৩ সেন্টিমিটার এবং লেজের দৈর্ঘ্য ৭৬ সেন্টিমিটার।
বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়াও সিলেট বিভাগের বিভিন্ন বনে এদের দেখা যায়। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) লাল তালিকায় চশমাপরা হনুমানকে ২০২১ সালে ‘বিপন্ন’ প্রজাতির প্রাণী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

রামগড়ে একটি বেসরকারি সংস্থায় কফি প্রকল্পে কাজ করেন খাগড়াছড়ি হিল অর্কিড সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সাইথোয়াই মারমা। তিনি বলছিলেন, চশমাপরা হনুমানের দলটি প্রায়ই তাদের প্রকল্প এলাকায় যায়।
“রামগড় ছাড়া জেলার অন্য কোথাও এখনো চশমাপরা হনুমান চোখে পড়েনি। তারা এখন সংকটে আছে। কারণটা হচ্ছে, নির্বিচারের বন উজাড়। খাদ্য সংকটের কারণে তারা লোকালয়ে আসছে। তারা মানুষের সঙ্গে একটা সাংঘর্ষিক পর্যায়ে চলে যাচ্ছে।”
চশমাপরা হনুমানসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী বিপন্ন হওয়ার জন্য নির্বিচারে বন উজাড় ও মনোকালচারকে দায়ী করেছেন পিটাছড়া বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠতা মাহফুজ রাসেল। খাগড়াছড়ির মাটিরাঙায় দীর্ঘদিন ধরে প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণে কাজ করছেন তিনি।
তিনি বলেন, “এখানে যেভাবে বন উজাড় হচ্ছে। তাতে বন্যপ্রাণীর আবাস নষ্ট হয়েছে। আমরা বন উজাড় করে কাসাভা, সেগুন, রাবারসহ মনোকালচার গড়ে তুলছি। এক ফসলি জমির কারণে পাহাড়ের অধিকাংশ গাছপালা। যে কারণে বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে আসছে।

“বনে থাকার মত পরিবেশ নেই। চশমাপরা হনুমান, লজ্জাবতী বানরসহ বেশকিছু প্রাইমেট এখন বিলুপ্তির পথে। বন ও বণ্যপ্রাণী রক্ষায় জেলা প্রশাসন, বনবিভাগ ও কৃষি বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।”
খাগড়াছড়ি বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. ফরিদ মিঞা বলেন, খাগড়াছড়ির বনবিভাগে বন্যপ্রাণীর সুরক্ষায় বনবিভাগের কোনো বরাদ্দ নেই। তবে কেউ যাতে বন্যপ্রাণী শিকার করতে না পারে সেজন্য বনবিভাগের পক্ষ থেকে সচেতনতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
“আমরা সব সময় চেষ্টা করছি, কেউ যাতে বন্যপ্রাণী শিকার না করে। এর আগে আমরা বেশকিছু বন্যপ্রাণী উদ্ধার করেছি। রামগড় রেঞ্জ কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে চশমপরা হনুমান রক্ষায় যাতে সচেনতামূলক উদ্যোগ নেওয়ার।”