Published : 11 Sep 2025, 10:34 PM
কক্সবাজারের খুরুস্কুলে ‘জলবায়ু উদ্বাস্তুদের’ জন্য নির্মিত আশ্রয়ণ প্রকল্পে পুনর্বাসনে উপকারভোগীদের নতুন তালিকা তৈরি করতে গিয়ে বাধার মুখে ফিরে গেছেন জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে পৌর শহরের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সমিতি পাড়ায় কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিলুফার ইয়াসমিন চৌধুরীর নেতৃত্বে জেলা প্রশাসনের একটি দল তালিকা করতে যান।
এ সময় হাজারো নারী-পুরুষ সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। দুই ঘণ্টার বেশি সময় প্রশাসনের কর্মকর্তারা তাদের বোঝানোর চেষ্টা করে পরে ব্যর্থ হয়ে ফিরে যান। আন্দোলনকারীদের দাবি, পুনর্বাসন নয়, তারা বর্তমানে যেখানে আছেন সেখানেই স্থায়ী বন্দোবস্ত চান।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় করা চার হাজার ৪০৯ জন উপকারভোগীর তালিকা ‘ত্রুটিপূর্ণ, প্রশ্নবিদ্ধ ও পক্ষপাতদুষ্ট’ বিবেচনায় তা বাতিল করে অন্তর্বর্তী সরকার। ১৪ জুলাই প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। বাতিল করা তালিকায় প্রকল্পে ফ্ল্যাট বুঝে পাওয়া ৬০০ পরিবারও আছেন।

নতুন করে তালিকায় তৈরি করতে সরকারের নির্দেশে সকালে জেলা প্রশাসনের একটি দল ঘটনাস্থলে গেলে স্থানীয়দের বাধার মুখে পড়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, তাদের উচ্ছেদ করার জন্য তালিকাটি করা হচ্ছে, তাই এলাকার বাসিন্দারা বাধা দিচ্ছেন। সকাল থেকে সমিতি পাড়ার বাসিন্দারা রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন।
ইউএনও নিলুফার ইয়াসমিন বলেন, “একটি বিষয় খুব স্পষ্ট করে বলতে চাই, এখানে উচ্ছেদ শব্দটা প্রয়োগই হচ্ছে না, উচ্ছেদের কোনো বিষয় নাই। সরকার বলেছে, পুনর্বাসনের লক্ষে তালিকা প্রণয়ন করতে। আশ্রয়ণ প্রকল্পে যে ফ্ল্যাটগুলো তৈরি হয়েছে, সেগুলোতে যদি মানুষ না যায় তাহলে ফ্ল্যাটগুলো নষ্ট হয়ে যাবে। সরকারের সম্পদ নষ্ট হবে।
“অথচ এখানে এমন অনেক মানুষ আছে যারা ফ্ল্যাটগুলোতে যেতে আগ্রহী। আমরা সেই আগ্রহী মানুষদের খুঁজছি এবং তাদের বসবাসের জন্য তালিকা প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। আমরা কাউকে জোর করিনি।”
তিনি বলেন, এখানে এমন অনেক মানুষ আছে, যারা জেলা প্রশাসনে অনেকবার দরখাস্ত হয়েছেন। তারা নিজেরা স্ব-ইচ্ছায় পুনর্বাসনের কথা বলেছেন, নিরাপদ বাসস্থানের জায়গা খুঁজেছেন। অনেকে বলেছে, এখানে জোয়ার ভাটার পানি আসে। তাদের লবণ পানি পান করতে হয়।

সব পরিস্থিতি বর্ণনা করে উপকারভোগীরা অনেকবার আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাস করতে চেয়েছেন বলে দাবি ইউএনও নিলুফার ইয়াসমিনের।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া স্থানীয় বাসিন্দা সিরাজুল হক বলেন, “আমরা এখানে যেমন আছি অনেক ভালো আছি। আমরা আমাদের ভিটেমাটি ছাড়তে চাই না। যদি আমাদের ভিটা ছাড়তে হয় তাহলে আমাদের জীবন নিয়ে নিতে হবে।
“আমরা তো কোনো ফ্ল্যাট চাইনি, আশ্রয়ণ প্রকল্পে আশ্রয় চাইনি, তাহলে কেন তারা আমাদের তালিকা করতে এসেছেন। আমরা কোনো উন্নত বাসস্থান চাই না, আমরা শুধু আমাদের জায়গা চাই, যেখানে আমরা যুগ যুগ ধরে বসবাস করছি।”
দরকার পড়লে মরে যাবেন তবুও জায়গা ছাড়বেন না বলে জানান মুসলিম উদ্দিন। তিনি বলেন, “রক্ত দিয়ে হলেও আমরা আমাদের ভিটা রক্ষা করব। যেখানে আমাদের জন্ম হয়েছে, আমরা সেখানেই মরব। আমাদের কোনো ফ্ল্যাট লাগবে না।”
ষাটোর্ধ্ব মো. বেলাল বলেন, “আমরা এই জায়গায় ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে বসবাস করছি। আমাদের জায়াগা কীভাবে কেড়ে নেয় আমরা দেখে নেব। আমাদের ভিটে মাটি কেড়ে নিতে দেব না।
“আমরা বন্যাভাসী। বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে বসবাস করছি আমরা। তবুও আমাদের কোনো আক্ষেপ নেই। আমরা সমিতি পাড়াবাসী সবাই একজোট হয়েছি। আমাদের ভিটেমাটি আমরা রক্ষা করেই ছাড়ব।”

উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির নেতা দিদারুল ইসলাম রুবেল বলেন, “আমরা অবৈধভাবে উচ্ছেদ হতে চাই না। কারণ এটি আমাদের ৪২ বছরের বাসস্থান। এখানে আমাদের বাবা-মার পেশা। বাচ্চাদের স্কুলও এখানে। এটি শুধু আমাদের বাসস্থান নয় আমাদের জীবিকারও জায়গা। তাই এই জায়গা ছেড়ে যেতে হলে আমাদের না খেয়ে মরতে হবে।”
এর আগে আশ্রয়ণ প্রকল্পে যাদেরকে বসবাসের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে অনেকেই এখন অনাহারে দিনযাপন করছেন বলে দাবি রুবেলের। তিনি বলেন, তাদের বাচ্চারা টোকাই হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও ছিনতাই করছে। এসব কেন করছে তারা? পেটের জন্যই তো।
“আমাদেরকেও যদি আশ্রয়ণ প্রকল্পে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে আমাদের বাচ্চারাও ছিনতাই শুরু করবে। তাদের ভবিষ্যৎও অন্ধকার হয়ে যাবে,” বলেন তিনি।
ফ্ল্যাটের তালিকা বাতিল হওয়ায় উপকারভোগীরা খুশি হয়েছেন, ওই ‘আয়না ঘরের’ মতো ফ্ল্যাটে কেউ যেতে চান বলে ভাষ্য রুবেলের।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. সালাউদ্দিন বলেছেন, ওই এলাকার বাসিন্দাদের হয়ে কিছু প্রতিনিধি তার কাছে গিয়েছিলেন পুনর্বাসনের দাবি নিয়ে। তারা তালিকা প্রণয়নের আগ্রহ দেখিয়েছেন।
তিনি বলেন, “বছরের শুরুর দিকে ওই এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা এসেছিলেন এবং সরকারের কাছে এর আগের তালিকাটি বাতিল করে নতুন করে তালিকা করার কথা বলেছেন। তারা বলেছেন, আগের তালিকাটি পক্ষপাতদুষ্ট ছিল। এসব দিক বিবেচনা করে স্থানীয় জনগণের আলোচনা ও চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে সেই তালিকাটি বাতিল করেছে সরকার।”

জেলা প্রশাসক বলেন, “প্রশ্ন উঠেছিল কীভাবে পক্ষপাত ছাড়া একটি তালিকা প্রণয়ন করা যায়। যাতে উপযুক্তরা সেই প্রকল্পে স্থান পায়। তারপর সেখানে স্থানীয় জনগণকে একটি কমিটি গঠন করার প্রস্তাব দেই। এরপর এলাকাবাসীকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
“কমিটি গঠনের পর অনেকবার তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। এরপর এই প্রথমবার তালিকাটি যাতে পক্ষপাতদুষ্ট না হয় সেদিকে লক্ষ্য রেখে আমরা আগানোর চেষ্টা করছি। পাশাপাশি সেই এলাকার মানুষের প্রতিনিধিত্ব যেন বজায় থাকে সেদিকেও লক্ষ্য রাখছি।”
সালাউদ্দিন বলেন, “উচ্ছেদের কথাটি কোত্থেকে আসেছে, সেটি আমার বোধগম্য নয়। তবে কেউ যদি অসাধু কোনো উদ্দেশ্য সাধনের জন্য এই উচ্ছেদ শব্দটি আলোচনায় এনে থাকেন তাহলে তাদেরকে চিহ্নিত করাটা খুব জরুরি।
“কারণ যারা সেখানে বসবাস করছেন, তারা কিন্তু অনেক কষ্টে দিনযাপন করছেন, অর্থনৈতিক ভাবেও তারা কষ্টে আছেন। তাই আমরা তাদের কষ্ট লাঘবের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।”
উচ্ছেদ আতঙ্কে ফ্ল্যাট পাওয়া ৬০০ পরিবার
পুরনো তালিকা বাতিল করা হলেও, সেই তালিকার ৬০০ পরিবার বর্তমানে আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাস করছেন। তাদের বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
মধ্যম কুতুবদিয়াপাড়ার বাসিন্দা ছিলেন রুহুল আমিন। তার বাড়ি ছিল মহেশখালী ধলঘাটায়। একানব্বইয়ের ঘূর্ণিঝড়ের পর ছোট বেলাতেই মা-বাবার সঙ্গে চলে আসেন। কুতুবদিয়া পাড়াতেই বড় হন রুহুল। ফ্ল্যাট পাওয়া ৬০০ পরিবারের মধ্যে তিনিও আছেন। এখন পরিবার নিয়ে থাকেন খুরুস্কুলের আশ্রয়ণ প্রকল্পে।
রুহুল আমিন বলেন, “২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আমাদের জায়গা কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর আমাদেরকে উত্তর পাড়ায় স্থানান্তরিত করা হয়। পরে বিমানবন্দর সম্প্রসারণের জন্য আবার উচ্ছেদ করা হয়।
“আমাদের জায়গা সিভিল এভিয়েশনকে দেওয়ার কারণে আমাদের ব্যবস্থা এখানে করা হয়। ওখান থেকে আমার পরিবারসহ ৬০০ পরিবারের জায়গা বুঝে নিয়ে ফ্ল্যাট হস্তান্তর করে।”

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, “সঠিক তদন্তের মাধ্যমে যদি তালিকা করা হয়, তাহলে আমরা থাকতে পারব। সঠিক নিয়মে আমরা এখানে আসছি। তাই আমরা এই জায়গা ছাড়ব না।”
প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা নিয়ে রুহুল বলেন, “এখানে এখনও সুপেয় পানির ব্যবস্থা নেই, আমাদের জীবিকার হদিস নেই। কোনোমতে শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁই নিয়ে বেঁচে আছি।”
আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাস করেন দিনমজুর মো. আরমান। তিনি বলেন, “আমরা কাউকে টাকা দিয়ে এখানে আসিনি। আমরা শুধু গাড়ি ভাড়া দিয়ে চলে এসেছি। এখানে পক্ষপাতের কোনও প্রশ্নই আসে না। ৬০০ পরিবারের মধ্যে শুধু পাঁচ শতাংশ নিম্ন মধ্যবিত্ত। বাকিরা একদম অসহায় দরিদ্র পরিবার।
“আমরাতো ইচ্ছা করে এখানে আসি নাই। সরকার চাইলেই আমাদেরকে উচ্ছেদ করতে পারে না। উচ্ছেদ করলে আমরা কোথায় যাব। ওরা আমাদের কাছ থেকে জায়গা নিয়েছে। আমাদেরকে আগের জায়গা আবার ফিরিয়ে দিলে আমরা চলে যাব।”
আশ্রয়ণ প্রকল্পের ফ্ল্যাট বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে প্রকল্পের বাসিন্দা আব্দুল আজিজ বলেন, “দারিদ্রতা অনেক বড় জিনিস। এখানে ফ্ল্যাট পাওয়ার পর যদি আমার কোনও বড় রোগ হয়, তখন আমি এই ফ্ল্যাট দিয়ে কি করব? আমার তো বিক্রি করতেই হবে। তেমনই অসহায়ত্বের কারণে অনেকে বিক্রি করেছেন হয়ত।”
তবে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক সালাউদ্দিন বলেন, “আশ্রয়ণ প্রকল্পে বর্তমানে যারা আছেন, তাদের উচ্ছেদের নির্দেশ আসেনি। আর তারা যদি প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত হন, তাহলে অবশ্যই নতুন তালিকায় তারাও আসবেন।”