Published : 24 Aug 2026, 01:56 AM
‘ও আরাকান হান্দেদ্দে দিল্লান, হতোদিন তোয়ার ন দেখির মুক্কান’- অর্থাৎ, ‘ও আরাকান হৃদয় কাঁদছে, কতদিন তোমার মুখ দেখিনি।’
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে এখন এই গানটি যেন প্রত্যাবাসনের আকাঙ্ক্ষারই আরেক ভাষা। শিশু-কিশোর থেকে তরুণ, বয়োবৃদ্ধ, শিবিরের নানা প্রান্তে বাজছে গানটি।
নিজের জন্মভূমি আরাকানের জন্য গাওয়া গানটি রোহিঙ্গা সংগীতশিল্পী রুহেল খানের কণ্ঠে ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও, ইউটিউবে গানটির দর্শক প্রায় ৪০ লাখ।
কিন্তু যে গান নিজের ভূমিতে ফেরার আকুতি জানায়, সেই গানের শিল্পী রুহেল খানই এখন আরাকানে নেই, এমনকি বাংলাদেশেও নেই। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি যথাযথ প্রক্রিয়ায় তৃতীয় দেশ হিসেবে কানাডায় ‘পুনর্বাসিত’ হয়েছেন তিনি।
রুহেল খানের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে তার ঘটনা শরণার্থীশিবিরে তৈরি হওয়া একটি নতুন বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করছে, আরাকানে ‘প্রত্যাবাসনের’ স্বপ্নের পাশাপাশি তৃতীয় কোনো দেশে ‘পুনর্বাসিত’ হয়ে নতুন জীবন শুরুর স্বপ্নও এখন শিক্ষিত ও দক্ষ রোহিঙ্গা তরুণদের একটি অংশের মধ্যে জায়গা করে নিচ্ছে।
‘আমার হৃদয় কখনও মেনে নেবে না’
২০২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি অস্ট্রেলিয়ায় গেছেন কক্সবাজারের ৮ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এক তরুণ। ক্যাম্পে তিনি ফটোগ্রাফির কাজ করতেন এবং বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবেও যুক্ত ছিলেন। অস্ট্রেলিয়া থেকে দীর্ঘ সময় অনলাইনে কথা বললেও নিজের নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি তিনি। ধরে নেওয়া যাক তার নাম ‘আয়াসুল’।
২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসার সময় আয়াসুলের বয়স ছিল ১৪ বছর। এরপর প্রায় নয় বছর কেটেছে কক্সবাজারের শিবিরে।
কেন অস্ট্রেলিয়ায় গেলেন- এই প্রশ্নের উত্তরে আয়াসুল বলেন, “প্রায় নয় বছর হয়ে গেছে। খুব, খুব কিছু হারায় ফেলছি।”
বাংলাদেশে আসার সময় উন্নত জীবনের প্রত্যাশা ছিল না। কিন্তু দীর্ঘদিন শিবিরে থাকার পর পরিস্থিতি তাকে নতুন জীবনের সন্ধানে যেতে বাধ্য করেছে।
তবু অস্ট্রেলিয়াকে নিজের স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে ভাবতে পারছেন না আয়াসুল। সুযোগ থাকলে তিনি এখনি আরাকান চলে যেতে চান।
“আমি চাই না যে আমি অস্ট্রেলিয়াতে থাকবো, আমি এখানে বাড়ি করবো। এটা আমার হৃদয় কখনো মেনে নেবে না।”
মিয়ানমারের বুথিডং এলাকায় ছিল তার বাড়ি। সেখানে এখনও তার দাদু-ভাই বেঁচে আছেন, যিনি মিয়ানমার সরকারের একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক। বাবা মারা গেছেন ২০২৩ সালে। মা এখন তার সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ায়।
আর তার ভাই-বোনদের একটি অংশ এখনও বাংলাদেশে। অর্থাৎ, একটি পরিবারের সদস্যরা এখন ছড়িয়ে আছেন তিন জায়গায়- মিয়ানমার, বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শিবির এবং অস্ট্রেলিয়ায়।
অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে আয়াসুল একটি অনুবাদ সংস্থায় কাজ করছেন। পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে পড়াশোনা করছেন।
তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়ায় এসে তার জীবন থেমে নেই। রোহিঙ্গাদের অনেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গিয়ে ডাক্তার, প্রকৌশলী, পাইলটসহ নানা পেশায় কাজ করছেন, এই বাস্তবতাও তিনি তুলে ধরেন। কিন্তু তার নিজের স্বপ্নের কেন্দ্রে এখনও আরাকান।
শিবিরে তৈরি হচ্ছে ‘তৃতীয় দেশের’ স্বপ্ন
আয়াসুলের মত আরও অনেক তরুণ এখন তৃতীয় কোনো দেশে যাওয়ার সম্ভাবনাকে ভবিষ্যতের একটি ‘পথ’ হিসেবে দেখছেন।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন কোনো অনানুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া নয়। বাংলাদেশ সরকারের অনুমতি নিয়েই বিভিন্ন সংস্থা এ কাজ করে।
তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী ইউএনএইচসিআর প্রাথমিক তথ্য শেয়ার করে। এরপর সংশ্লিষ্ট দেশের নির্ধারিত সংস্থাগুলো বিভিন্ন যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নেয়। পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে বিষয়টি শেষ পর্যন্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের দপ্তরে আসে এবং ক্যাম্প থেকে বের হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। অর্থাৎ, এটি একটি সরকারি অনুমোদিত প্রক্রিয়া।
মিজানুর রহমান জানান, ২০০১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে প্রায় এক হাজার রোহিঙ্গা পুনর্বাসিত হয়েছিলেন। ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত এ সংখ্যা সাত হাজারের কিছু বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গেছেন যুক্তরাষ্ট্রে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রের এ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ায় তুলনামূলক কম সংখ্যক রোহিঙ্গা পুনর্বাসিত হচ্ছেন।
কিন্তু সংখ্যাটি কম হলেও এর প্রভাব নিয়ে শরণার্থী ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ আছে।
মিজানুর রহমান বলেন, শিবিরের শিক্ষিত তরুণদের একটি অংশ এখন মনে করছে, তাদেরও কোনো একসময় উন্নত দেশে পুনর্বাসন হবে।
“তাদের প্রত্যেকে চিন্তা করে, নারী-পুরুষ সবাই, তারা কোনো না কোনো উন্নত দেশে পুনর্বাসিত হবেন। এটি আসলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার জন্য হাতাশার।”
তার মতে, এত বড় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন করা বাস্তবসম্মত নয়। পৃথিবীর কোথাও এত বড় জনগোষ্ঠীকে একসঙ্গে তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের নজির নেই। এটি এক ধরনের ‘ভুল স্বপ্ন’।
ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা রিপ্রেজেন্টেটিভের প্রেসিডেন্ট সৈয়দ উল্লাহও মনে করেন, তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান নয়।
তার ভাষায়, “প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ বলেন, শিক্ষিত বলেন, পুনর্বাসন রোহিঙ্গাদের সমাধান না। রোহিঙ্গাদের একমাত্র সমাধান প্রত্যাবাসন।”
তিনি প্রশ্ন তোলেন, এক বছরে শিবিরগুলোতে যেখানে প্রায় ৩০ হাজার শিশু জন্ম নিচ্ছে, সেখানে নয় বছরে ছয়-সাত হাজার মানুষকে তৃতীয় দেশে নিয়ে গেলে সেটি কীভাবে সংকটের সমাধান হবে?
আয়াসুলের মতো তরুণদের কাছে এটি হয়তো আরেকটি সম্ভাবনা, শিক্ষা, কাজ, নিরাপত্তা এবং স্বাভাবিক জীবনের সুযোগ।
‘পুনর্বাসনের মানসিকতা তৈরি হচ্ছে’
ক্যাম্প-৯ এর ক্যাম্প ইনচার্জ মুহাম্মদ আরাফাতুল আলম তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের আরেকটি দিক তুলে ধরছেন। তিনি বলেন, “শিবিরে তৃতীয় দেশে যাওয়ার একটি মানসিকতা তৈরি হচ্ছে। অনেকেই এটিকে বাংলাদেশ থেকে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া বা অন্য কোনো উন্নত দেশে যাওয়ার ‘গেটওয়ে’ হিসেবে দেখছেন।”
সংগীত শিল্পী রুহেল খানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, যে তরুণ নিজের ভূমি আরাকানের জন্য গান গেয়ে মানুষের আবেগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তার তৃতীয় দেশে চলে যাওয়ার ঘটনাটি সেই সংযোগের প্রশ্নও তৈরি করছে।
“সে যদি তার জনগণকে, তার মানুষকে, তার কমিউনিটির মানুষকে… এক লাখ মানুষের সামনে এই গান গাইতো, হয়তো সবাই আরাকানে যাওয়ার জন্য লাইন ধরতো। এখন ছেলেটা চলে গেছে কানাডায়। কীভাবে সে গান গাইবে, কীভাবে কানেক্ট করবে তার জনগোষ্ঠীকে?”
জাতিসংঘের সাবেক কর্মকর্তা ও ব্র্যাকের উপদেষ্টা সুব্রত চক্রবর্তী মনে করেন, “বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে রোহিঙ্গাদের একীভূত হওয়ার সুযোগ নেই। ফলে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ সীমিত। প্রত্যাবাসন অবশ্যই মূল সমাধান; কিন্তু সেটি যখন অনিশ্চিত, তখন তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন কিছু মানুষের জন্য একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে।”
তার মতে, “ছয়-সাত হাজার মানুষকে পুনর্বাসিত করা সংখ্যার বিচারে খুব বেশি নয়। কিন্তু একটি পরিবার যখন স্থায়ীভাবে নতুন একটি দেশে জায়গা পায়, তখন তার পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও একটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়।”
সুব্রত চক্রবর্তী বলেন, পুনর্বাসন সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেলেও এর চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া উচিত।
“অন্তত এরকম বছরে যদি পাঁচ থেকে এক লাখ লোককেও আমরা রিসেটেলমেন্টের আওতায় নিতে পারি, এটা একটা ভালো প্রভাব পড়বে। কিন্তু আমাদের মূল হচ্ছে প্রত্যাবাসন।”
তবে প্রত্যাবাসনের অতীত অভিজ্ঞতা নিয়ে তার উদ্বেগ আছে।
২০১৮ ও ২০১৯ সালে দুবার প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কার্যকর হয়নি। তার মতে, তখন বাংলাদেশ সরকার এককভাবে প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নিতে চেয়েছিল। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর যথেষ্ট সম্পৃক্ততা ছিল না।
ফলে প্রত্যাবাসনের জন্য গাড়ি, অস্থায়ী আশ্রয়- সব প্রস্তুত থাকার পরও যারা ফেরার কথা ছিল, তাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি।
তার মতে, ভবিষ্যতে প্রত্যাবাসন করতে হলে বাংলাদেশের কূটনৈতিক উদ্যোগের পাশাপাশি জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর কার্যকর সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।
‘প্রত্যাবাসন দরকার, তৃতীয় দেশও একটি অপশন’
শরণার্থী বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিন তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনকে সরাসরি প্রত্যাবাসনের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখছেন না। তার মতে, “প্রত্যাবাসন অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু প্রত্যাবাসনের জন্য যে শর্তগুলো দরকার, সেগুলো এখনও পূরণ হয়নি।
তিনি বলেন, “শরণার্থীদের শুধু খাবার ও আশ্রয় দিয়ে টিকিয়ে রাখা সংকটের সমাধান করে না; বরং দীর্ঘস্থায়ী করে। তাই নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন এবং আন্তর্জাতিকভাবে দায় ভাগ করে নেওয়ার উদ্যোগও থাকা দরকার।”
রাহমান নাসির উদ্দিনের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ২০২২ সালে এক লাখ রোহিঙ্গাকে নেওয়ার একটি উদ্যোগ নিয়েছিল। অস্ট্রেলিয়াতেও মিয়ানমারের সামরিক নিপীড়নে বাস্তুচ্যুতদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আশ্রয় দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
তার প্রশ্ন, “এসব সুযোগ বাংলাদেশ কেন আরও কার্যকরভাবে অনুসন্ধান ও কাজে লাগাবে না?”
আরও পড়ুন:
'শুধু মুখে বললে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হবে না, দরকার পরিকল্পনা'
মিয়ানমারের 'ফিরিয়ে নেওয়ার' বিবৃতিকে 'নাটক' বলছেন রোহিঙ্গারা
উখিয়ায় রোহিঙ্গা শিবিরে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত, নিজ দেশে ফিরতে রোহিঙ্গাদের বিক্ষোভ
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে নিহত ৫: ‘ছাত্রীরা কোরআন পড়ছিল, মুহূর্তেই সব শেষ’
একরাতে নয়জনের প্রাণহানি: ‘মৃত্যু বুকে নিয়েই ঘুমায়’ সাড়ে ৩ লাখ রোহিঙ্গা