Published : 21 Aug 2026, 07:27 PM
প্রত্যাবাসনের বিষয়টি শুধু মুখে না বলে ‘কৌশলগত পরিকল্পনা’ নিয়ে এগোনো উপর জোর দিয়েছেন রোহিঙ্গা নেতারা।
কক্সবাজারে ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ভবিষ্যৎ কতদূর’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় তারা এই অভিমত ব্যক্ত করেন। কক্সবাজার জেলা পরিষদ মিলনায়তনে বৃহস্পতিবার রাতে সভাটির আয়োজন করে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম বে ইনসাইট ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এমবোলডেন বাংলাদেশ।
বে ইনসাইট মিডিয়া গ্রুপের পরিচালক ও এমবোলডেন বাংলাদেশের চেয়ারম্যান হাসনা হুরাইনের সভাপতিত্বে সভাটি সঞ্চালনা করেন সংবাদিক সৌরভ দেব। প্রারম্ভিক বক্তব্য দেন এমবোলডেন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ইনজামাম উল হক।
সভায় ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গার সভাপতি সৈয়দ উল্লাহ বলেন, “শুধু মুখে বললে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হয় না। ২০১৮ সাল থেকে শুনছি প্রত্যাবাসন আজ হবে, কাল হবে। কিন্তু এসব কথার কোনো প্রতিফলন দেখছি না।”
রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের একক সমস্যা হিসেবেও দেখতে নারাজ তিনি। তার ভাষায়, এটি প্রথমত মিয়ানমারের, দ্বিতীয়ত বাংলাদেশের এবং তৃতীয়ত অন্য দেশগুলোরও সমস্যা।
রোহিঙ্গা যুবনেতা ও আরাকান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মুজিবুর রহমান বলেন, “আরাকানের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। ফলে প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে শুধু মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনা করলেই হবে না।”
তার মতে, চীন ও ভারতের সঙ্গে প্রয়োজনীয় চুক্তি ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হবে বাংলাদেশকে। এটা করতেই হবে।
নিজেদের পরিচয়ের প্রসঙ্গে আশ্রয় শিবিরের ক্যাম্প ইনচার্জ আরাফাতুল আলম বলেন, “রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের আরাকানের মানুষ এবং রোহিঙ্গা পরিচয় নিয়ে কারও কোনো বিভ্রান্তি থাকার কথা নয়।”
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও শরণার্থী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, “রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বহীন করে দেওয়ার প্রক্রিয়া মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ এবং এই পরিচয় অস্বীকারের রাজনীতিকে মোকাবিলা না করে প্রত্যাবাসনের আলোচনা এগোবে না।”
তিনি বলেন, ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের অধিকার সংকুচিত করা হয়।
রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণের বাস্তবতাকেও প্রত্যাবাসনের পরিকল্পনায় বিবেচনায় নেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি।
ইউএনএইচসিআরের কক্সবাজার সাব-অফিসের প্রধান মার্সেল কলুন বলেন, রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, কিন্তু নয় বছর পরও কীভাবে সেই প্রত্যাবাসন হবে তার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই।
“এটি এখনো একটি আকাঙ্ক্ষা, কিন্তু কীভাবে এটি বাস্তবায়ন করা হবে তার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই।”
উন্নয়নকর্মী ফারিহা হোসাইনও মনে করেন, নয় বছর কোনো ছোট সময় নয়। রোহিঙ্গা সংকট এখন আর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পর্যায়ে নেই; এটি দীর্ঘস্থায়ী সংকটে পরিণত হয়েছে।
ব্র্যাকের উপদেষ্টা সুব্রত চক্রবর্তী বলেন, শরণার্থী সংকটের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত তিনটি সমাধান হলো, প্রত্যাবাসন, স্থানীয়ভাবে একীভূত হওয়া এবং তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন। বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে একীভূত হওয়ার সুযোগ বাস্তবে নেই বলে মনে করেন তিনি। ফলে প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের পথও খোলা রাখা প্রয়োজন।
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, ১২ লাখের বেশি মানুষকে যদি ধাপে ধাপে ফেরত পাঠাতে হয়, তাহলে কাজটি কত দীর্ঘ হতে পারে তা সহজেই বোঝা যায়। শুধু মানুষকে সীমান্তের ওপারে পাঠিয়ে দেওয়াই প্রত্যাবাসন নয়। মর্যাদার সঙ্গে ফেরার নিশ্চয়তা থাকতে হবে।
উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হেলাল উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গাদের নিজেদের মধ্যেও বিভাজন রয়েছে। বিভিন্ন সংগঠন ও গোষ্ঠীর বিরোধ এবং ক্যাম্পের অভ্যন্তরীণ সংঘাত আন্তর্জাতিকভাবে রোহিঙ্গাদের একটি নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করছে।
অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার নাজমুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, এ ধরনের আলোচনা থেকে যদি নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের জন্য সুস্পষ্ট সুপারিশ তৈরি করা যায়, তাহলে সেটি সরকারের কাজে লাগতে পারে।