Published : 13 Aug 2025, 07:01 PM
বরেণ্য বুদ্ধিজীবী যতীন সরকার তার প্রায় নয় দশকের জীবনের বেশিরভাগটাই কাটিয়েছেন দেশ ও মানুষের মুক্তি সংগ্রামের লড়াইয়ের কাতারে থেকে। সারাজীবন তিনি তার সমস্ত বৌদ্ধিক শক্তি ও চেতনা দিয়ে গণমানুষের মুক্তির জন্যই লড়াইয়ের খোরাক জুগিয়ে গেছেন। নিজের বিশ্বাস, আদর্শ আর ধ্যানের জগত থেকে কেউ তাকে কোনোদিন একবিন্দু সরাতে পারেননি।
যতীন সরকারের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এসে বুধবার বিকালে ভক্ত-অনুরাগী, স্বজন-সহযোদ্ধারা এইভাবেই তার জীবন ও কর্মকে তুলে ধরেছেন। তাদের সবার চোখে ছিল জল, আর যতীন সরকারের প্রতি শ্রদ্ধায় তারা ছিলেন অবনত।
প্রগতিশীল বাম ধারার বুদ্ধিজীবী, স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক, শিক্ষক যতীন সরকার বুধবার বিকাল পৌনে ৩টায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। পরে তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর ময়মনসিংহ জেলা কার্যালয়ে। সেখানেই রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা শ্রদ্ধা জানান।
এর আগে বিকাল ৪টায় সাদা কাপড়ে মোড়ানো যতীন সরকারকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ থেকে বের করা হয়। মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে ধরাধরি করে তুলেন স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। এমন বিদায় কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তারা।
যতীন সরকারের ছেলে সুমন সরকার বলছিলেন, “বাপি এভাবে চলে যাবে বুঝতে পারিনি। তার চলে যাওয়া দেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। পরিবার নিয়ে না ভাবলেও তিনি সবসময় দেশ নিয়ে ভাবতেন। বাপির শূন্যস্থান দেশ পূরণ করতে পারবে না। সারাটা জীবন তিনি দেশকে নিয়ে ভেবে গেছেন। বাপির মনন, চিন্তা, কর্ম এই দেশ এবং দেশের গণমানুষকে নিয়ে আবর্তিত হয়েছে। তিনি ছিলেন প্রকৃত বাঙালি। সবাই তার জন্য প্রার্থনা করবেন।”

মেয়ে সুদীপ্তা সরকার বলেন, “বাপুজি তো চলেই গেল। এখন সাহিত্য অঙ্গন বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গন বলেন, দেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হল। তারপরেও বাপুজি তার স্বাভাবিক ও পরিপূর্ণ জীবন কাটিয়েছেন। ঘটনাবহুল ও বর্ণাঢ্য ৯০ বছরের জীবন। তার যাত্রা পরিপূর্ণ হয়েছে এই পৃথিবীতে। তার কর্মে মানুষের মাঝে বেঁচে থাকবেন তিনি। আপনারা তাকে প্রার্থনায় রাখবেন।”
যতীন সরকারের মৃত্যুর খবর শহরে ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই ছুটি আসেন হাসপাতালে। পরে সেখান থেকে মরদেহের সঙ্গে যান উদীচী কার্যালয়ে। সেখানে তার মরদেহে উদীচী ও সিপিবির পতাকা দেওয়া হয়। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সেখানে আন্তর্জাতিক গেয়ে তাকে শেষ বিদায় জানানো হয়।
সিপিবি ময়মনসিংহ জেলা কমিটির সভাপতি এমদাদুল হক মিল্লাত বলেন, “আমরা তার ধরেই ছাত্ররাজনীতি ও গণমানুষের মুক্তির সংগ্রামের পাঠ নিয়েছি। তিনি প্রজন্ম তৈরি করেছিলেন। তিনি ছিলেন আমাদের মার্কসবাদ পাঠের অন্যতম শিক্ষক।
“যতীন সরকার এদেশের বামপ্রগতিশলীল চিন্তা-ধারার বাতিঘর ছিলেন। আমাদের পার্টির সম্পদ ছিলেন তিনি, কিন্তু তিনি তার কর্ম-জ্ঞানে সব মানুষের হয়ে ওঠেছিলেন। আমরা আজকে সেই মহান শিক্ষক ও সম্পদকে হারিয়ে ফেলেছি। এটা একটা ইতিহাসের সমাপ্তিও। মানুষের মুক্তির সংগ্রামের জন্যই আমাদের তাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।”
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ইয়াজদানী কোরায়শী কাজল বলেন, “আমরা চেয়েছিলাম তিনি একটু সুস্থ হবে তাকাবেন এবং তিনি এমন একটা অবস্থায় যাবেন চারদিকটা বুঝতে পারবেন। নেত্রকোনায় তার বাড়িতে গিয়ে চোখ মেলে তাকাতে পারলে স্বস্তি পেতেন। কিন্তু তিনি অজ্ঞান অবস্থায় চলে গেলেন।
“কিন্তু যতীন সরকার আসলে যাননি। তার অসংখ্য কর্মকাণ্ড তিনি রেখে গেছেন। অসংখ্য বক্তব্য, অসংখ্য লেখা সব জায়গায় আমরা তাকে খোঁজে পাব। তার বদৌলতে তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন। তিনি আমাদের আদর্শিক গুরু ছিলেন, যতদিন আমি এবং আমার পরম্পরা বেঁচে থাকবে- আমরা তার আদর্শ ধারণ করব।”
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক জাকিউল ইসলাম বলেন, “অধ্যাপক যতীন সরকার ৮ অগাস্ট ভর্তি হয়েছিলেন। উনি সরাসরি আইসিইউতে ভর্তি হন। উনার আগে থেকে ঢাকায় চিকিৎসা চলছিল। কিডনি, নিউমোনিয়া অন্যান্য মাল্টিপল জটিলতায় তিনি মারা যান।”
এদিকে উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী নেত্রকোণা জেলা সংসদের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ময়মনসিংহ থেকে যতীন সরকারের মরদেহ প্রথমে সরাসরি তার বাসস্থান শহরের রামকৃষ্ণ মিশন রোডের ‘বানপ্রস্থে’ যাবে। সেখানে পরিবার ও স্বজনদের শ্রদ্ধার নিবেদনের জন্য রাখা হবে। এই বাড়িতেই তিনি আড়াই দশকের বেশি সময় বসবাস করেছেন।
এরপর সেখান থেকে রাত ৮টায় যতীন সরকারকে নিয়ে যাওয়া হবে নেত্রকোণা শহরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখানে নেত্রকোণাবাসীর পক্ষ থেকে তার প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা জানানো হবে। শহরের রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, ময়মনসিংহ ও ঢাকা থেকে আসা ভক্ত-অনুরাগীরা এই শিক্ষাগুরুর প্রতি তাদের শেষ শ্রদ্ধা জানাবেন।
এরপর রাত ১১টায় বারহাট্টা রোডে নেত্রকোণা কেন্দ্রীয় মহাশ্মশানে তার শেষকৃত্য হবে। পরিবার, স্বজন ও সুহৃদদের সঙ্গে আলোচনা করেই এই কর্মসূচি নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান উদীচী জেলা সভাপতি।
১৯৩৬ সালের ১৮ অগাস্ট নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার চন্দ্রপাড়া গ্রামে যতীন সরকারের জন্ম। আর্থিক অনটনের কারণে শিক্ষা জীবন টেনে নিতে কৈশোর থেকেই তাকে টিউশনসহ নানা কাজে যুক্ত হতে হয়েছে।
নেত্রকোণা কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়ার সময় ছাত্রসংসদের সাহিত্য সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন যতীন। পরে ১৯৫৭ সালে ময়মনসিংহে গিয়ে ভর্তি হন আনন্দমোহন কলেজে।
বিএ পরীক্ষা দিয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন নেত্রকোণার আশুজিয়া হাইস্কুলে। বারহাট্টা সিকেপি পাইলট হাই স্কুলেও পড়িয়েছেন কিছুদিন। পরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পড়তে ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে।
সেখান থেকে এমএ পাস করে ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর হাই স্কুলে বাংলার শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন যতীন সরকার। ১৯৬৪ সালে বাংলার প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন ময়মনসিংহ শহরের নাসিরাবাদ কলেজে।
আরও পড়ুন: