Published : 05 Sep 2025, 10:15 PM
ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসকের সরকারি বাসভবনের সীমানা প্রাচীর থেকে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মারক গ্রাফিতি’ মুছে ফেলা হয়েছে। এ নিয়ে সমালোচনার মুখে আবার গ্রাফিতি আকার কথা জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক।
বৃহস্পতিবার রাতে এক ফেইসবুক পোস্টে এ কথা জানিয়েছেন ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক মুফিদুল আলম।
তবে জেলা প্রশাসকের একের পর এক ‘বিতর্কিত’ কর্মকাণ্ড গ্রহণযোগ্য নয় বলে ক্ষোভ জানিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও নাগরিক সমাজের নেতারা।
নগরের ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে ঐতিহাসিক সার্কিট হাউস মাঠ সংলগ্ন জেলা প্রশাসকের সরকারি বাস ভবন। তার বাস ভবনের সামনে দিয়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের চলাচল। গত বছরের জুলাই-অগাস্ট আন্দোলনের পর জেলা প্রশাসকের বাসভবনের দেয়ালজুড়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী, দুর্নীতিবিরোধী ও রাষ্ট্র সংস্কারধর্মী গ্রাফিতি আঁকা হয়।
সম্প্রতি সেই সীমানা প্রাচীরে আঁকা জুলাই-অগাস্টের চেতনার গ্রাফিতি প্রায় ১৮ লাখ টাকা ব্যয়ে মুছে দিয়ে সাদা রঙে ঢেকে দেওয়া হয়েছে; যা নিয়ে ক্ষোভ দেখিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র ও নাগরিক সমাজের নেতারা।

তারা বলছেন, ইতিহাস সাক্ষী, চব্বিশের ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়ে শিক্ষার্থীরা শহরের বিভিন্ন দেয়াল, এমনকি জেলা প্রশাসকের সরকারি বাসভবনের দেয়ালেও আঁকেন বিপ্লবী গ্রাফিতি।
ফ্যাসিবাদবিরোধী স্লোগান, রাষ্ট্র সংস্কারের বার্তা ও জুলাই-অগাস্টের অগ্নিঝরা স্মৃতি ফুটে ওঠে এসব দেয়ালে। কিন্তু এক বছরের মাথায় সেসব চিত্র সাদা রঙে ঢেকে দেওয়ায় ‘ইতিহাস মুছে’ ফেলার ‘ষড়যন্ত্র’ বলে মনে করছেন নাগরিক সমাজ।
জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া ময়মনসিংহ জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি গোকুল সূত্রধর মানিক বলেন, “জুলাই আন্দোলনের স্পিরিট ইচ্ছে করলেই জেলা প্রশাসক ধারণ করতে পারবেন না। যার বড় প্রমাণ গ্রাফিতি মুছে ফেলা।

“জুলাই-অগাস্ট আন্দোলনের পূর্বে তিনি কি ছিলেন, এক হাজার ছাত্রকে জিজ্ঞেস করবেন, তাহলে উত্তর পাবেন। তিনি চব্বিশের পক্ষে না বিপক্ষে। তিনি বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, গ্রাফিতি অংকন করে দিবেন, বললেই হল! গত বছর টাউন হলের গ্রাফিতি মুছে কি অংকন করেছেন, দেখতেই পারছেন।”
জুলাই আন্দোলনের আরেক যোদ্ধা জেলা ছাত্র ফ্রন্টের আহ্বায়ক আরিফুল হাসান বলেন, “ডিসি একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছেন। আন্দোলনের পর ছেলে-মেয়েরা হাসিনা সরকারের অপকর্ম গ্রাফিতির মাধ্যমে তুলে ধরেছিলেন। গ্রাফিতি হচ্ছে মূলত আন্দোলন ও প্রতিবাদের ভাষা।
“দেয়ালের স্লোগানগুলো আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করেছে। এর আগে সার্কিট হাউস মাঠে ‘সালামি মঞ্চের’ চারপাশে ইটের গাঁথুনি, হরিকিশোর রায়রোডে হেরিটেজ বাড়ি ভাঙা এবং সাহিত্য সংসদ গুঁড়িয়ে দিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন ডিসি।”
‘সমাজ রুপান্তর সাংস্কৃতিক সংঘের’ সভাপতি ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, “গ্রাফিতি আন্দোলনের প্রতিচ্ছবি; যা মানুষ দেখে ধারণ করে। এক বছর যেতে না যেতেই তা মুছে ফেলে কিসের ইঙ্গিত? জেলার সর্বোচ্চ কর্মকর্তার বাসভবনের দেয়ালে যদি এমন হয়, তাহলে অন্য স্থানে কি হবে?”

ময়মনসিংহ মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা কামরুল আহসান মোহাম্মদ এমরুল বলেন, “জুলাইয়ের এক বছর যেতে না যেতেই গ্রাফিতি মুছে ফেলা কোনোভাবেই ঠিক হয়নি। এটা গণঅভ্যুত্থানের চেতনাবিরোধী। জেলা প্রশাসক দেয়াল সংস্কার করবেন সেটা কয়েকজনের সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নিলেই পারতেন।”
ময়মনসিংহ জেলা বিএনপির সদস্যসচিব মোহাম্মদ রোকনুজ্জামান সরকার রোকন বলেন, “জেলা প্রশাসক জুলাই-অগাস্ট আন্দোলনের স্পিরিট ধারণ করলে এমনটি করতে পারতেন না। দেয়াল সংস্কার অন্যভাবেও করা যেত।”
গ্রাফিতি মুছে ফেলার বিষয়টি জানতে জেলা প্রশাসকের মোবাইলে একাধিকবার কল করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তার সরকারি মোবাইল নম্বরে বার্তা পাঠিয়েও কোনো উত্তর মেলেনি।
তবে জেলা প্রশাসনের এনডিসি সাইফুল্লাহিল গালিব বলেছেন, দেয়াল সংস্কারের জন্য গ্রাফিতি মুছে দেওয়া হয়েছে। পরে নতুন করে আবার আঁকা হবে।
ওইদিন রাতে ‘ডিসি ময়মনসিংহ’ ফেইসবুক পোস্টে একটি বিবৃতি দিয়েছেন জেলা প্রশাসক মুফিদুল আলম। সেখানে তিনি বলেছেন, “২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট জেলা প্রশাসনের বাংলো, দেয়াল, গেইট এবং পাঁচটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
“ভবন ও দেয়াল মেরামত করার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে অনেক লেখালেখি করার পর কিছু আর্থিক বরাদ্দ পাওয়া যায়। কাজ না করলে অর্থ ল্যাপস হয়ে যাবে। তবে কাজ করতে গিয়ে গ্রাফিতিতে সিমেন্টের আঁচড় লাগে। এটা নিয়ে ভুল বুঝাবুঝির অবকাশ নেই। মেরামত শেষ হলে আমি পূর্বের চাইতে আরও সুন্দর ও মনোমুগ্ধকরভাবে গ্রাফিতি অংকন করে দিব।”
প্রায় ১৮ লাখ টাকা ব্যয়ে জেলা প্রশাসক বাসভবনের এক হাজার ৮০০ বর্গফুট দেয়াল কয়েক ফুট উঁচু করে রঙ, দেয়ালের ৩০০ ফুটে কাঁটাতার লাগানোর কাজ পেয়েছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মাহবুব এন্টারপ্রাইজ।