Published : 27 Jan 2026, 04:23 PM
দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে দুদকের করা মামলায় সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার নঈমুল হক চৌধুরীকে কারাগারে পাঠিয়েছে আদালত।
মঙ্গলবার দুপুরে সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মুন্সী আব্দুল মজিদ এ আদেশ দেন বলে জানিয়েছেন দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) শফিউল আলম।
পিপি শফিউল আলম বলেন, দুপুরে নঈমুল আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করেন। পরে আদালত জামিন নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয়।
নঈমুল হক চৌধুরী সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক পর্যায়ে পরিচালক (অর্থ) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে গত বছর দুদকের করা মামলার অভিযোগপত্রে নঈমুলকে দুই নম্বর আসামি করা হয়। মামলার প্রধান আসামি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য মোর্শেদ আহমেদ চৌধুরী এখনও পলাতক রয়েছেন।
এর আগে রোববার একই মামলায় মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও আটজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে কারাগারে পাঠায় আদালত।
তারা হলেন- বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকিউরমেন্ট অফিসার আব্দুল মুনিম, সেকশন অফিসার রিংকু দাস, চৌধুরী রুম্মান আহমেদ, লোকমান আহমেদ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা সুরঞ্জিত রঞ্জন তালুকদার, রবিউল আলম বকুল, মোহাম্মদ রাশেদুল ইসলাম ও অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর রুহুল আমিন।
তারাও আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করেন। পরে আদালত তাদের জামিন আবেদন না মঞ্জুর করে কারাগারে পাঠায়। এর আগে এ মামলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও কয়েকজন কর্মকর্তা কারাভোগ করেছেন।
গত বছরের ২৪ এপ্রিল নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য, ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারসহ ৫৮ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আদালত।
ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়মের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পদে নিয়োগ ও পদোন্নতি দেওয়ার অভিযোগে করা মামলায় ৫৮ জনের বিরুদ্ধে ২০ এপ্রিল আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় দুদক।
মামলার এজাহারে বলা হয়, ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন-ইউজিসি। পরে অভিযোগ আমলে নিয়ে ইউজিসি ২০২৩ সালে তদন্ত করে।
তদন্তে তৎকালীন উপাচার্য মোর্শেদ আহমেদ চৌধুরী ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মো. নঈমুল হক চৌধুরীর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম ও দুর্নীতির সত্যতা পাওয়া যায়। পরে দুদকের সিলেটের সমন্বিত জেলা কার্যালয় তৎকালীন উপাচার্য, ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারসহ ৫৮ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ১ এপ্রিল মামলা করে।
মামলায় তৎকালীন উপাচার্য মোর্শেদ আহমেদ চৌধুরী ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার নঈমুল হক চৌধুরী ছাড়া আরও ৫৬ কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়।
তাদের মধ্যে আছেন- ফাহিমা খানম চৌধুরী, অঞ্জন দেবনাথ, মাইদুল ইসলাম চৌধুরী, মো. গোলাম সরোয়ার, মো. বিলাল আহমদ চৌধুরী, শমসের রাসেল, গাজী মো. ফারাজ, আবদুল মুনিম, রিংকু দাস, আতিক শাহরিয়ার ধ্রুব, খালেদা চৌধুরী, আশরাফুল ইসলাম, জান্নাতুল ফেরদৌসী, চৌধুরী রোম্মান আহমদ, সাজু ইবনে হান্নান খান, বেলাল উদ্দিন, লোকমান আহমেদ, চৌধুরী জুলফিকার খালেদ, মো. মোশারফ হোসেন, হালিমা বেগম এবং সুরঞ্জিত চন্দ্র তালুকদার।
দুদকের অভিযোগপত্রে বলা হয়, সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১৮ এর ১২-এর ১০ উপধারা অনুযায়ী উপাচার্য কোনো শূন্য পদে অ্যাডহক নিয়োগের ক্ষেত্রে অস্থায়ীভাবে অনধিক ছয় মাসের জন্য নিয়োগ দিতে পারবেন এবং প্রয়োজনে মেয়াদ অনূর্ধ্ব ছয় মাস পর্যন্ত বাড়াতে পারবেন। পরবর্তী সময়ে হয় চাকরি নিয়মিত করতে হবে অথবা অব্যাহতি দিতে হবে।
কোনোভাবেই আবার অ্যাডহকে নিয়োগ বা মেয়াদ বাড়াতে পারবেন না। তবে তৎকালীন উপাচার্য আইন লঙ্ঘন করে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অ্যাডহক নিয়োগ দেন এবং অবৈধভাবে মেয়াদ বাড়ান। এ কাজে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার তাকে সহযোগিতা করেন।
ইউজিসির অনুমোদন ছাড়া নিয়োগের পাশাপাশি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন বাজেট থেকে বেআইনিভাবে বেতন-ভাতা দেওয়া হয় বলেও অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে।
এতে বলা হয়, “বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে কর্মরত আছেন ২৩৯ জন। এর মধ্যে ইউজিসি অনুমোদিত পদ আছে ১১২টি। এসব অনুমোদিত পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ৯৮ জনকে। তাদের বেতন-ভাতা ইউজিসি থেকে ব্যাংকের মাধ্যমে দেওয়া হয়। অন্যদিকে অতিরিক্ত ১৪১টি পদে নিয়োগ দেওয়া হলেও ইউজিসির অনুমোদন নেওয়া হয়নি এবং তাদের বেতন-ভাতা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুদান থেকে পাওয়া। এসব অতিরিক্ত নিয়োগের ব্যাপারে ইউজিসি কিংবা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নেওয়া হয়নি।
২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া নিয়োগে ৪৬ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বয়স-সংক্রান্ত যোগ্যতা না থাকলেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগপত্রে বলা হয়।
এতে আরও বলা হয়, বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও ১৮ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়োগ, শিক্ষাগত যোগ্যতায় তৃতীয় শ্রেণি থাকা সত্ত্বেও চারজনকে নিয়োগ এবং অ্যাডহকে নিয়োগ দেওয়া সত্ত্বেও তিন কর্মকর্তাকে দশম গ্রেড থেকে নবম গ্রেডে এবং সাত কর্মকর্তাকে ১৪তম গ্রেড থেকে দশম গ্রেডে পদোন্নতি দেওয়া হয়।
এ ছাড়া দুজন কর্মকর্তার সংশ্লিষ্ট পদে চাহিদা মোতাবেক ডিগ্রি না থাকলেও অবৈধভাবে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয় বলে অভিযোগপত্রে দাবি করেছে দুদক।