Published : 07 Mar 2026, 11:01 AM
উপকূলীয় জনপদ খুলনার পাইকগাছা উপজেলায় লবণাক্ত জমিতে বার্লি চাষ করে সফলতা পেয়েছেন কৃষক। রবি মৌসুমে এক বিঘা জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে এ ফসল চাষ করেন তিনি।
কৃষি বিভাগ বলছে, শস্যটি অনেক উচ্চ পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ। এটির আটা দিয়ে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য (যেমন রুটি, শিশুখাদ্য, স্যুপ) তৈরি করা হয়। এমনকি রোগীর পথ্য হিসেবেও বার্লি খাওয়া হয়। বাজারে এর চাহিদা এবং দামও ভাল।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) খুলনার প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় কৃষিকে টেকসই করতে কৃষকদের প্রচলিত চাষাবাদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন বিকল্প তৈরি করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে বার্লি চাষকে বেছে নেওয়ার কথা বলেছেন তিনি।
উপজেলার কপিলমুনি এলাকায় বার্লি চাষ করা কৃষক মনিরুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবন উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকা। জমিতে রবি ফসল হিসেবে আগে গম এবং বোরো ধানের চাষ হত। এবার কৃষি গবেষণা বিভাগের পরামর্শে প্রথমবার এক বিঘা জমিতে বার্লি চাষ করেছেন তিনি। বিনামূল্যে বীজ ও সার পেয়েছেন।
মনিরুল বলেন, “বার্লির সঙ্গে এখানকার কৃষকরা পরিচিত নয়। চাষ সম্পর্কেও কোনো ধারণা না থাকায় শুরুতে ফলন হয় কিনা একটু চিন্তায় ছিলাম। কিন্তু এখন ফলন দেখে ভালো লাগছে। আশপাশের কৃষকরাও দেখতে আসছেন। অনেকে বার্লির বীজও রাখতে বলছেন।”
মনিরুলের পাশের জমির মালিক আমিরুল ইসলাম বলেন, “শুরুতে যখন শুনলাম মনিরুল ভাই বার্লি লাগাচ্ছেন, তখন মনে হইছিল বার্লি তো বিদেশে হয়, আমাদের দেশে হয় না। কিন্তু এখন দেখছি গাছের বৃদ্ধি ভালো, শীষও সুন্দর হইছে। আগামী মৌসুমে আমিও বার্লি চাষ করে দেখব।”
উপকূলীয় কৃষিতে বার্লিকে নতুন সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। পাইকগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা একরামুল হোসেন বলেন, বার্লি চাষ এ এলাকায় এটাই প্রথম। এটি কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট তদারকি করছে।

কপিলমুনি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, এলাকাজুড়ে চারদিকে নানা ফসলের সমাহার। এক পাশে সরিষা, অন্য পাশে গম, কোথাও পাট চাষের প্রস্তুতি চলছে। আবার কেউ কেউ রোপণ করেছেন বোরো ধানের চারা। এর মাঝখানে সবুজ বার্লির ক্ষেত আলাদাভাবে সবার নজর কাড়ছে।
ক্ষেতের এক প্রান্তে টাঙানো আছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাইনবোর্ড। সেখানে কৃষকের নাম এবং বারি বার্লি-৭ ও বারি বার্লি-১০ দুটি জাতের নাম লেখা রয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) ‘সরজমিন গবেষণা বিভাগ’ পাইকগাছা উপজেলার বৈজ্ঞানিক সহকারী জাহিদ হাসান বলেন, এ এলাকায় এটিই প্রথম পরীক্ষামূলক বার্লি চাষ। রবি মৌসুমে লবণাক্ততার কারণে যেখানে অন্য ফসল ঝুঁকিতে থাকে, সেখানে বার্লি হতে পারে সম্ভাবনাময় বিকল্প।
তিনি বলেন, বারি বার্লি-৭ ও বারি বার্লি-১০ জাত লবণসহিষ্ণু এবং উপকূলীয় অঞ্চলে চাষের জন্য উপযোগী। বারি বার্লি-৭ খাটো এবং ৯০ থেকে ১০৫ দিনের মধ্যে পরিপক্ব হয়। আর বারি বার্লি-১০ এর উচ্চতা ৯০ থেকে ৯৫ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে।
এটি লবণাক্ত জমিতেও হেক্টর প্রতি গড়ে দুই থেকে দুই দশমিক চার টন ফলন দেয় এবং ৮০ থেকে ৮৬ দিনের মধ্যে পাকতে শুরু করে বলে জানান বারির এ কর্মকর্তা।
পাইকগাছার জন্য বারি বার্লি-১০ তুলনামূলক বেশি উপযোগী জানিয়ে জাহিদ হাসান বলেন, অনুর্বর ও লবণাক্ত জমিতে স্বল্প খরচে বার্লি চাষ সম্ভব। গম এবং বার্লির উৎপাদন প্রায় সমান হলেও গমের চেয়ে বার্লির উৎপাদন খরচ অনেক কম। বার্লি চাষে পোকামাকড়ের আক্রমণ তুলনামূলক কম এবং সেচ ছাড়াও ফলনে বড় তারতম্য দেখা যায় না।
পরীক্ষামূলক আবাদ সফল হওয়ায় আগামী মৌসুমে চাষ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা আছে বলে তিনি জানান।
বারির গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্পের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মতিয়ার রহমান বলেন, পাইকগাছার আগে থেকে কয়রা উপজেলার লবণাক্ত এলাকায় গত ছয় বছর ধরে বার্লি চাষের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আনা বীজ দিয়ে প্রায় ১৫০টি নতুন লাইন তৈরি করা হয়। সেগুলো বড় প্লটে পরীক্ষামূলকভাবে চাষের প্রস্তুতি চলছে। সফল হলে দ্রুত কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট খুলনার প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় কৃষিকে টেকসই করতে কৃষকদের প্রচলিত চাষাবাদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন বিকল্প তৈরি করা জরুরি। দেশে বার্লির চাহিদা থাকলেও উৎপাদন কম হওয়ায় আমদানি করতে হয়।
তিনি বলেন, স্থানীয়ভাবে উৎপাদন বাড়ানো গেলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি বার্লিভিত্তিক শিল্পেরও বিকাশ ঘটবে। পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ এ ফসল মানুষের পাশাপাশি পশু খাদ্যেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।