Published : 08 Dec 2025, 10:13 PM
গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিশ্রুতির পরও এক যুগের বেশি সময় ধরে আটকে থাকা নারায়ণগঞ্জের কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যার বিচার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্বজনরা।
হত্যার ১৫৩ মাসেও অভিযোগপত্র না দেওয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে ত্বকীর বাবা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর যে কয়েকটি হত্যা মামলার দ্রুত বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তার একটি ছিল ত্বকী হত্যাকাণ্ড।
কিন্তু এ মামলার ৯৯ বার আদালতে তারিখ গেলেও তদন্তকারী সংস্থা র্যাব অভিযোগপত্র দাখিল করেনি। তারিখ শত হওয়ার আগেই ত্বকী হত্যার অভিযোগপত্র দাখিলের দাবি করছি।”
সোমবার সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ত্বকী হত্যা ও বিচারহীনতার ১৫৩ মাস উপলক্ষে আয়োজিত আলোক প্রজ্বালন কর্মসূচিতে এসব কথা বলেন তিনি।
রাব্বি বলেন, “এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত শামীম ওসমান, অয়ন ওসমান, আজমেরী ও শাহ নিজামসহ সকলকে অভিযোগপত্রে যুক্ত করতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি যে, এই সরকারের ত্বকী হত্যার বিরুদ্ধে কোনো দুরভিসন্ধি নাই, সুতরাং এই সরকার ত্বকী হত্যার অভিযোগপত্র দ্রুত দেবে এটি আমাদের আকাঙ্ক্ষা।”
রফিউর রাব্বি বলেন, “আমরা ত্বকীসহ নারায়ণগঞ্জের আশিক, চঞ্চল, বুলু, মিঠু- যাদেরকে এই ওসমান পরিবার হত্যা করেছে, সকল হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়েছি। কিন্তু কোনো হত্যার সুরাহা হয় নাই। আমরা সাগর-রুনি, তনু, মিতু হত্যারও বিচার চেয়েছি। এসব হত্যারও কোনো কুল-কিনারা হয় নাই।
“শেখ হাসিনা আয়নাঘর তৈরি করে শত শত মানুষকে গুম করেছে, খুন করেছে। আয়নাঘর দৃশ্যমান বন্ধ হলেও বিভিন্ন জায়গায় আবার আমরা টর্চারসেল তৈরি হওয়ার খবর পাচ্ছি।”
চব্বিশের আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জে যারা অংশগ্রহণ করেছিলেন, তারা ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদা দাবি করছেন, না দিলে মামলায় ঢুকানোর হুমকি দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন রাব্বি। তিনি বলেন, “ইতোমধ্যে অনেককে ঢুকিয়েছে তারা।
“অর্থাৎ টাকা খাওয়ার এই যে ফন্দি-ফিকির, যেটি আওয়ামী লীগ করেছে দীর্ঘ ১৫ থেকে ১৬ বছর, ঠিক একইভাবে আজকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলো করছে। প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থা এসব জানে। আমরা আশা করছি এসবের বিরুদ্ধে তারা ব্যবস্থা নেবে।”
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তারা আগামী ফেব্রুয়ারি নির্বাচন আয়োজন করবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
শেখ হাসিনার শাসনামলে নারায়ণগঞ্জ ‘আইয়ামে জাহেলিয়াতের’ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল মন্তব্য করে রাব্বি বলেন, “খুন, হত্যা, রাহাজানি, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্বের মধ্য দিয়ে নারায়ণগঞ্জের মানুষের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিল।
“শেখ হাসিনার পৃষ্ঠপোষকতায় তার স্নেহধন্য ওসমান পরিবারের এসব কর্মকাণ্ডের সমস্ত কিছুই তার জানা ছিল। তারপরও তিনি তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেন নাই। দেশের রাষ্ট্রপ্রধান এসব অরাজকতার পৃষ্ঠপোষক হওয়ায় নারায়ণগঞ্জের প্রশাসন ছিল ওসমান পরিবারের পক্ষে।”
ত্বকী হত্যাকারীদের তারা গ্রেপ্তার তো করেইনি বরং প্রশাসন এদেরকে বীর দর্পে চলাফেরা করার করার ব্যবস্থা করে দিয়েছে বলে অভিযোগ করেন রাব্বি।
এ সময় ত্বকী হত্যার বিচারের পাশাপাশি ‘নারায়ণগঞ্জের সন্ত্রাস ও দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে লড়াই করা’ সাবেক সিটি মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর মুক্তির দাবি করেন নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি মাহবুবুর রহমান মাসুম।
তিনি বলেন, “সরকারি দলের একজন জনপ্রতিনিধি হয়েও আইভী ওসমান পরিবারের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। সাত খুন, ত্বকী হত্যাসহ গুম ও খুনের বিরুদ্ধে এই নারী সাহসের সঙ্গে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন।
“সেই নারী আজ জেলখানায়। পাঁচটি মামলায় হাই কোর্ট জামিন দিলেও আরও পাঁচটি মিথ্যা মামলায় তাকে জড়িত করা হয়েছে। কিছু স্বার্থান্বেষী মহল এসব মামলা দিচ্ছে।”
নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি মনি সুপান্থের সভাপতিত্ব ও সাধারণ সম্পাদক দিনা তাজরিনের পরিচালনায় আলোক প্রজ্বালন কর্মসূচিতে ‘সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের’ সদস্যসচিব হালিম আজাদ, শিশু সংগঠক রথীন চক্রবর্তী, নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সভাপতি এবি সিদ্দিক, গণসংহতি আন্দোলনের জেলা সমন্বয়কারী তরিকুল সুজন, ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন, সমমনার সাবেক সভাপতি দুলাল সাহা, সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি জিয়াউল ইসলাম কাজল, জাহিদুল হক দিপু এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক ধীমান সাহা জুয়েল বক্তব্য দেন।