Published : 24 Apr 2026, 05:01 PM
ঢাকার সাভারে রানা প্লাজা ধসের ১৩ বছরেও হতাহতরা পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সেইসঙ্গে আহতদের পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন তারা।
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধসে এক হাজার ১৭৫ জন শ্রমিক নিহত এবং আহত হন প্রায় দুই হাজার শ্রমিক। সেই থেকে দিনটি রানা প্লাজা দিবস হিসেবে পালন করে আসেছে বিভিন্ন সংগঠন।
শুক্রবার সকালে দিবসটি উপলক্ষে রানা প্লাজার সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন পালন করে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন। পরে রানা প্লাজার সামনে অস্থায়ী শহীদ বেদিতে ফুল দিয়ে নিহতদের স্মরণ করা হয়। এ সময় রানা প্লাজা ধসে নিহত শ্রমিকদের পরিবার ও আহত শ্রমিকরা অংশ নেন।
এ সময় তারা সরকারের কাছে রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানার ফাঁসি দাবি করে বিভিন্ন স্লোগান দেন। পাশাপাশি শ্রমিক হত্যার সঙ্গে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপ না থাকলেও পরিত্যক্ত জমিটির চারপাশ কাঁটাতার ও টিনের বেড়া দেওয়া হয়। তবে এখন বেড়ার আর কোনও অস্তিত্ব নেই। বর্তমানে জায়গাটিতে নানা লতাপাতার দখলে। সামনে বেদি। ফুটপাত জুড়ে থাকে রেন্ট-এ কারের গাড়ি। তবে ২৪ এপ্রিল এলে নানা কর্মসূচিতে কিছুটা প্রাণ ফিরে পায় জায়গাটি।
গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইন বিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন মিন্টু বলেন, অবিলম্বে আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

সেইসঙ্গে রানা প্লাজার ঘটনার সঙ্গে জড়িত ভবন মালিক, গার্মেন্টস মালিকসহ সংশ্লিষ্ট সব দায়ী ব্যক্তিদের সঠিক তদন্তের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিতের দাবি জানান তিনি।
সেই সময় রানা প্লাজার আট তলায় ‘নিউ স্টাইল লিমিটেড কারখানায়’ কাজ করতে বুলবুলি আক্তার। তিনি বলেন, “১৩ বছর ধরে পঙ্গু অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছি। দুবেলা দুমুঠো খাবারের জন্য প্রায়ই আত্মীয়স্বজনসহ বিভিন্ন মানুষের কাছে হাত পাততে হয়।
বর্তমান সরকারের কাছে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ, আহতদের পুনর্বাসন নিশ্চিত, উন্নত ও যথাযথ চিকিৎসা এবং ভবন মালিকের সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন তিনি।
রানা প্লাজার সপ্তম তলার ‘নিউ স্টাইল লিমিটেড কারখানায়’ কাজ করতেন মাসুদা বেগম। ঘটনার দিন ভবন ধসে চাপা পড়ে তার কোমরের দুটি হাড় ভেঙে যায়। দীর্ঘ চিকিৎসার পর তিনি হাঁটতে সক্ষম হলেও শারীরিকভাবে অসুস্থ।
এক সন্তানের আয়ের ওপর নির্ভরশীল মাসুদা ভাড়া বাসায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। মাসুদা বেগমের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর কিছু অনুদান পেলেও এখন তার আর কেউ কোনো খোঁজখবর নেয় না।
শুধু মাসুদা বেগম নন, তার মত আরও অনেক আহত শ্রমিক একই অভিযোগ করেছেন। হতাহতরা কেউ যথাযথ আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাননি। আহত ও নিহত শ্রমিকদের জন্য দ্রুত ক্ষতিপূরণ ও দোষীদের শাস্তির দাবি জানান তারা।
রানা প্লাজার পঞ্চম তলায় ‘প্যান্টম টেক্স লিমিটেডে’ কাজ করতেন পারুল বেগম। তিনি বলেন, “বর্তমানে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছি। সন্তানদের লেখাপড়া ও খাওয়া-পরার খরচ চালাতে পারছি না।”
সরকারের কাছে দাবি করছি, আহতদের সুচিকিৎসা, স্থায়ী পুনর্বাসন এবং যথাযথ ক্ষতিপূরণ যেন দেওয়া হয়। আহতদের জন্য রানা প্লাজার জায়গায় একটি হাসপাতাল বা ট্রেনিং সেন্টারের দাবি করেন পারুল।

রানা প্লাজা ধসে পড়ার পর প্রায় প্রতিটি শ্রমিক সংগঠনই শ্রমিকদের নিরাপদ কর্ম পরিবেশের আন্দোলন শুরু করে। নিহত ও আহতদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবিও করেন তারা। এ ছাড়া ২৪ এপ্রিলকে জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা করার দাবি তোলা হয়।
গার্মেন্টস অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজন বলেন, “ভবন মালিক সোহেল রানা ছাড়া অধিকাংশ আসামি এখনো স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে বলে আমরা দেখতে পাচ্ছি। তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”
আন্তর্জাতিক শ্রম আইনে এককালীন আয়ের ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণের বিধান থাকলেও, বাস্তবে ভুক্তভোগী অনেক শ্রমিক এখনো পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ পাননি বলে জানান তিনি।
রানা প্লাজা ধস: বিচারে গতি পেয়েছে হত্যা মামলা, ইমারত মামলায় মিলছে না সাক্ষী
রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ১৩ বছর: 'পা হারিয়েছি, কিন্তু ঠিকমত ক্ষতিপূরণ পাইনি’