বর্ষা ঘিরে চলনবিলে নৌকার চাহিদা
“বড় নৌকার চেয়ে ছোট ডিঙি ও কোশা নৌকার চাহিদা বেশি। প্রতিটি ১০ থেকে ১২ হাতের নৌকা বানাতে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হয়।”
পাবনার চলনবিল এলাকায় বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে নৌকা তৈরির কাজ চলছে পুরোদমে। চলনবিল অঞ্চলের মানুষের বর্ষাকালের প্রধান বাহন নৌকা; তাই এই সময়ে এ বাহন তৈরির চাহিদা বাড়ে।
কারিগররা এখন কাঠ, হাতুড়ি, ও করাত নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
চলনবিল অঞ্চলে শ্যালো ইঞ্জিনচালিত যাত্রীবাহী ও মালবাহী নৌকার চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া মাছ ধরার জন্য ছোট ডিঙ্গি এবং নৌকা বাইচের জন্য বিশেষ নৌকাও তৈরি হয়। বর্ষাকালে এসব নৌকা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন অনেক মাঝি।
তবে কারিগরদের আক্ষেপ, আধুনিকতার ছোঁয়ায় এবং নতুন প্রজন্মের আগ্রহ না থাকায় এই পেশা এখন টিকে থাকার লড়াই করছে।
চাটমোহর উপজেলার হান্ডিয়াল ইউনিয়নের নৌকা কারিগর ৭০ বছরের প্রাণ কৃষ্ণ বলেন, “১৯৭০ সাল থেকে এ পেশায় আছি। তখন ধানের দাম ছিল ১৮ টাকা মণ, আর এখন ১ হাজার ৪০০ টাকা মণ। বর্তমানে মজুরি ভিত্তিতে কাজ করলে হাতপ্রতি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা পাওয়া যায়।
“নদীতে আগের মত পানি না থাকায় এবং বিলে অপরিকল্পিত বাঁধ, রাস্তা ও ছোট ছোট ব্রিজ নির্মাণের কারণে এখন নৌকার আগের মত চাহিদা নেই।”
তিনি বলেন, “চলনবিল অঞ্চলে প্রচলিত একটি প্রবাদ আছে। বছরে ১২ মাসের ৪ মাস নায়ে, আর ৮ মাস পায়ে। অর্থাৎ বর্ষাকালে এই অঞ্চলের মানুষ পানির উপর দিয়ে নৌকায় আর শুকনা মৌসুমে হেঁটে চলাচল করেন। তাই প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম ঘনিয়ে এলে নতুন নৌকা তৈরির ধুম পড়ে যায় এলাকায়।”
পাবনার চাটমোহর ও ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, উল্লাপাড়া ও শাহজাদপুর, নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার অনেক গ্রাম বর্ষায় ৩ থেকে ৫ মাস পানিবন্দি থাকে। নিচু এলাকায় এর চেয়েও দীর্ঘ সময় ধরে পানি জমে থাকে। ফলে এই সময়টায় নৌকাই হয়ে ওঠে মানুষের যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম।
চাটমোহর উপজেলার হান্ডিয়াল ইউনিয়নের নৌকা কারিগর মো. আব্দুল হামিদ বলেন, “আমি ১৭ বছর ধরে নৌকা তৈরির কাজ করি। আগের মতো আর বড় নৌকার চাহিদা নেই। এখন ছোট নৌকা বেশি তৈরি হচ্ছে। তবে এখন শুধু নৌকা তৈরি করে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।”
স্থানীয় নৌকা ব্যবসায়ী মো. মঞ্জিল হোসেন জানান, ৩৬ হাত লম্বা একটি নৌকা বিক্রি হয় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকায়। আর ১২ থেকে ১৩ হাত নৌকা বিক্রি হয় ৯ থেকে ১০ হাজার টাকায়।
“তবে আগে যে পরিমাণ নৌকা বিক্রি করতাম সে তুলনায় এখন নৌকা বিক্রি অনেকটাই কম।” বলেন তিনি।
চাটমোহরে ছাইকোলা গ্রামের নৌকা তৈরির কারিগর অলক মিস্ত্রিও ছোটবেলা থেকে নৌকা তৈরির কাজ করেন। একটি ছোট নৌকা তৈরি করতে দুই থেকে তিন দিন সময় লাগে বলে জানান তিনি।
অলক বলেন, বর্ষা মৌসুমে বিলে পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নৌকার চাহিদাও বেড়ে যায়। এ সময়টা নৌকা তৈরি কারিগরদের ব্যস্ততা বাড়ে। সারা বছর নৌকা তৈরি ছাড়াও ঘর, খাট, চেয়ার, টেবিল, ড্রেসিং টেবিল, আলনা, আলমারি ইত্যাদি তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন তারা।
“বড় নৌকার চেয়ে ছোট ডিঙি ও কোশা নৌকার চাহিদা বেশি। প্রতিটি ১০ থেকে ১২ হাতের নৌকা বানাতে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হয়। কিছু লাভ রেখে বিক্রি করা হয়।”
নৌকা কিনতে আসা নাটোরের জোনাইল এলাকার আলমাস উদ্দিন বলেন, “আমাদের গ্রাম বা এলাকাটি খুবই নিচু। সামান্য বর্ষাতেই রাস্তাঘাট তলিয়ে যায়। বর্ষার সময় একমাত্র বাহন হচ্ছে নৌকা।
“বর্ষার পানি বিলে আসার সঙ্গে সঙ্গে একমাত্র ভরসার বাহন হয়ে ওঠে নৌকা। নৌকার উপরই ভরসা করে সব কাজ সমাধান করতে হয়। তাই নৌকা কিনতে এসেছি।”
ছাইকোলা বাজারের নৌকা ব্যবসায়ী আব্দুল আলীম বলেন, “গত বছর নৌকার চাহিদা একটু কম ছিল, এবার পানি আসার শুরু থেকেই নৌকা বিক্রি গতবারের তুলনায় বেশি। আমাদের ব্যবসাটা মূলত পানির ওপর নির্ভর করে। পানি বেশি হলে নৌকার চাহিদা বাড়ে, এতে করে বিক্রির পরিমাণও বাড়ে।”
চাটমোহর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান হাসাদুল ইসলাম হীরা বলেন, “আমাদের উপজেলাসহ আশপাশের কয়েকটি উপজেলা চলনবিল অধ্যূষিত হওয়ায় নৌকার চাহিদা অনেক। কিছু কিছু গ্রামে বেশ অনেক পরিবার নৌকা তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করে। গ্রামঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ মাছ চাষ বা ধরা ও কৃষির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় নৌকা আসলে খুবই গুরুত্বর্পর্ণ আমাদের এলাকার মানুষের।
“বর্ষা মৌসুমে পাকা ধান নৌকা ছাড়া কেটে আনা সম্ভব নয়। তাই এ সময় সবার নৌকার প্রয়োজন হয়।”
নৌকা তৈরির ক্ষুদ্র এ শিল্পটি টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে আর্থিক সহযোগিতা প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এ বিষয়ে পাবনা বিসিক শিল্প নগরীরর উপ-মহাব্যবস্থাপক (ভারপ্রাপ্ত) মো. শামীম হোসেন বলেন, “আসলে বিল অঞ্চলে বর্ষা মৌসমে নৌকা একটি প্রয়োজনীয় বাহন। ওই এলাকায় যারা নৌকা তৈরির সঙ্গে জড়িত তারা আমাদের সাহায্য চাইলে আমরা সাধ্যমতো সহযোগিতা করবো।”
