Published : 10 Mar 2026, 11:59 PM
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় জামায়াতে ইসলামীর একটি ইফতার মঞ্চে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত এক ‘মাদক কারবারিকে’ দেখা গেছে; যিনি যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।
সোমবার জামায়াতের ইফতার মাহফিল মঞ্চে তাকে দেখা যায়। এ ঘটনার একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ালে শুরু হয় আলোচনা ও সমালোচনা।
ইফতার মঞ্চে থাকা সেতাবুর রহমান বাবু উপজেলার মাটিকাটা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য ছিলেন। এর আগে হেরোইনসহ গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যাওয়ার পর বরখাস্ত হন তিনি। তার বিরুদ্ধে হত্যাসহ আরও মামলা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ও রাজশাহী-১ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি। তবে গোদাগাড়ী উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মো. কামরুজ্জামানের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।
মো. কামরুজ্জামান বলেন, “বাবু যে একজন মাদক কারবারি এবং যুবলীগের নেতা- এটি আমি জানি। তবে তিনি মঞ্চে বসেছিলেন, এ বিষয়টি পরে শুনেছি। তাকে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। নেতারা ইফতার নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। এর মধ্যে তাদের চোখ এড়িয়ে হয়তো বাবু মঞ্চে বসে পড়েছেন।”
গোদাগাড়ী থানার ওসি হাসান বশির বলেন, বাবুর নামে বর্তমানে কোনো মামলা বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে কি-না, তা যাচাই করে বলতে পারবেন তিন। তবে তার নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে মাদক কারবারের সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, আইনি ব্যবস্থা থেকে কোনো ছাড় নেই বলে হুঁশিয়ারি দেন ওসি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার রেলগেইট এলাকায় বাবুর বাড়ি। এক সময় তিনি পাওয়ার টিলারের শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। পরে হেরোইনের কারবারে জড়িয়ে বিপুল অর্থসম্পদের মালিক বনে যান। পরবর্তীতে তিনি ইউপি সদস্য নির্বাচিত হন।
২০১৮ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখা-২ থেকে প্রকাশিত মাদক কারবারিদের একটি তালিকায় ৯ নম্বরে সেতাবুর রহমান বাবুর নাম আসে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজশাহীতে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের একশ্রেণির অসাধু রাজনীতিক ফেনসিডিল, হেরোইন ও ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকের কারবারে জড়িত।
এসব মাদক ব্যবসা এলাকায় নতুন মাদকসেবী তৈরি এবং অর্থের জোগান দিতে গিয়ে অনেকেই ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও খুনসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
বাবুর বিরুদ্ধে একাধিক মাদক মামলা রয়েছে। এ ছাড়া ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন মাটিকাটা এলাকায় একটি ভোটকেন্দ্র দখলকে কেন্দ্র করে বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। সেই ঘটনায় জেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রবিউল ইসলাম অরণ্য কুসুমের বাবা নজরুল ইসলাম নিহত হন।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর নজরুল ইসলামের বড় ছেলে মাসুম সরকার বাদী হয়ে বাবুকে প্রধান আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ওই এলাকায় জিয়া পরিষদের একটি কার্যালয় দখলের অভিযোগও রয়েছে বাবুর বিরুদ্ধে। গণ-অভ্যুত্থানের পর এ ঘটনাতেও তার বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা হয়।
মাটিকাটা ইউনিয়ন পরিষদের সচিব সাব্বির রহমান বলেন, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ১০০ গ্রাম হেরোইনসহ তৎকালীন ইউপি সদস্য সেতাবুর রহমান বাবু গ্রেপ্তার হন। বিষয়টি জেলা প্রশাসক স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে অবহিত করলে তাকে ইউপি সদস্য পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়। এরপর থেকেই তিনি বরখাস্ত অবস্থায় রয়েছেন।”
নিহত নজরুল ইসলামের ছেলে ও জেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রবিউল ইসলাম অরণ্য কুসুম বলেন, “শুনছি জামায়াতের ইফতার মাহফিল আয়োজনের অর্থ দিয়েছে বাবু। তা না হলে তাকে মঞ্চে বসতে দিবে কেন?”
তিনি বলেন, “বাবু ভোটকেন্দ্র দখল করতে গিয়ে আমার বাবাকে হত্যা করেছে। সেই ব্যক্তি এখন জামায়াতের মঞ্চে, একেবারে সংসদ সদস্যের পাশে দেখা যাচ্ছে। এটা খুবই দুঃখজনক।”