Published : 25 Oct 2025, 11:21 AM
খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলায় পিটাছড়া বনে ২৬ প্রজাতির সাপের সন্ধান মিলেছে।
তবে উপস্থিতি বাড়লেও এলাকায় সাপের দর্শনে মানুষ আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেনি বলে জানান ‘পিটাছড়া বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ উদ্যোগ’ এর প্রতিষ্ঠাতা মাহফুজ রাসেল। তিনি একে বিরল ‘মানুষ ও সাপের সহাবস্থান’ বলে বর্ণনা করেছেন।
সুষ্ঠু ও প্রাকৃতিকভাবে বন সংরক্ষণ, শিকার বন্ধ ও বন উজাড় না হওয়ায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে তোলা এ বনে সাপের বৈচিত্র্য বেড়েছে বলে মনে করছে বনবিভাগ। বিপন্নতার মাঝেও তারা একে ‘ইতিবাচক’ হিসেবে দেখছেন।
লন্ডন থেকে দেশে ফিরে ২০১৭ সালে দুর্গম পিটাছড়ায় পাহাড় কিনে বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন মাহফুজ রাসেল। শুরুতে এর আয়তন ছিল পৌনে পাঁচ একর; পরে তার আয়তন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ একরে। এর মধ্যে ৩৬ একরে রয়েছে সবুজ পাহাড় আর বৃক্ষ।
এ বনে ছড়ার পাশাপাশি রয়েছে অসংখ্য ছোট ছোট ঝিরি। এখানে বৃক্ষ ও লতাগুল্ম ৫০০ প্রজাতির এবং ১৭ প্রজাতির বাঁশ রয়েছে।

পিটাছড়া বনে দীর্ঘদিন ধরে সাপ নিয়ে কাজ করছেন ‘স্নেক রেসকিউ টিম’ এর প্রতিষ্ঠাতা সিদ্দিকুর রহমান রাব্বি। তিনি বলছিলেন, এখন পর্যন্ত পিটাছড়ায় দুধরাজ, বেতআছড়া, ঘরগিন্নি, ঝাউয়ের ঘরগিন্নি, হলুদ ছোপ ঘরগিন্নি, গ্রিন পিট ভাইপার, মক ভাইপার, ইন্দো-চীনা দাঁড়াশ, পদ্ম গোখরা, কৃষ্ণ কালাচ, শঙ্খনী, গ্রিন ক্যাট স্নেক বা সবুজ ফনিমনসা, টাউনি ক্যাট স্নেক বা খয়েরি ফনিমনসা, লাল গলা ঢোড়া, জলঢোড়া, ব্যান্ডেড কুকরী, লাউডগা, হেলে, চেরাপুঞ্জি কিলব্যাক, পাকড়া উদয় কাল বা হোয়াট ব্রাডেট কুকরি, রাসেলস কুকরি, ব্রাাহ্মণী দুমুখো সাপ, ডায়ার্সের দুমুখো সাপ, অজগর, কিং কোবরা ও দাঁড়াশের সন্ধান পাওয়া গেছে। ভবিষ্যতে হয়ত আরও প্রজাতি পাওয়া যাবে।
তিনি বলেন, “প্রকৃতির ‘ইকোলজিকাল ইন্ডিকেটর’ সাপের উপস্থিতি ও ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশের সহায়ক। কোনো বনে সাপের বৈচিত্র্যপূর্ণ উপস্থিতি থাকলে সে বনের প্রাণীদের সুষ্ঠু বাস্তুসংস্থান টিকে থাকে। পিটাছড়া প্রমাণ করে সঠিকভাবে বন ব্যবস্থাপনা করলে প্রকৃতিতে জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব।”

‘পিটাছড়া বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ উদ্যোগ’ এর প্রতিষ্ঠাতা মাহফুজ রাসেল বলেন, “এখানে এখন বন দেখার জন্য গবেষক, বন্যপ্রাণী বিষয়ক আলোকচিত্রী, নির্সগ্রপ্রেমীরা প্রায় প্রতি সপ্তাহে আসেন। তারা বনে ঘুরে বেড়ান, রাতযাপনও করেন।
“এই আট বছরে কেউ সাপের দ্বারা আক্রান্ত হয়নি। অনেকবার এমন হয়েছে, আমরা বসে গল্প করছি, আড্ডা দিচ্ছি, সাপ আমাদের পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে কিন্ত কাউকে আক্রমণ করছে না। বলা যায়, মানুষ ও সাপের স্বাভাবিক সহবস্থান রয়েছে।”
বনের ‘ইকো সিস্টেম’ ভালো থাকায় এত প্রজাতির সাপ দেখা যাচ্ছে বলে মনে করেন মাহফুজ রাসেল। তার ভাষ্য, “সাপ থাকায় এখানে সুষ্ঠু খাদ্যশৃঙ্খলা বা বাস্তুসংস্থান তৈরি হয়েছে। সাপ যেমন বিভিন্ন ক্ষতিকর প্রাণী খাচ্ছে। তেমনি সাপ খেয়ে ভেজী, শকুন, গুইসাপসহ অন্যান্য প্রাণী বেঁচে আছে।”

জীব-বৈচিত্র্যের কথা জানতে পেরে বেশ কয়েকবার পিটাছড়া বন ভ্রমণ করেছেন খাগড়াছড়ির বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. ফরিদ মিঞা। তিনি বলেন, “সাপ দেখলেই মেরে ফেলতে হবে এরকম মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। পিটাছড়া এত প্রজাতির সাপ থাকলেও কাউকে দংশন করেনি। তাদের স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকতে দিতে হবে। এরা প্রকৃতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।”
সাপ শিকার ও পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান এই বনকর্মকর্তা।
বনবিভাগ জানিয়েছে, ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনে প্রায় সব সাপের প্রজাতি সংরক্ষিত। সংরক্ষিত সাপের প্রজাতি হত্যা বা পাচার করলে সর্বোচ্চ ১২ বছর কারাদণ্ড ও ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।