Published : 13 Jun 2023, 12:09 AM
বিএনপি নির্বাচনে না আসায় অনেকটা প্রত্যাশামতই সহজ ও বিপুল ব্যবধানে জয় পেয়ে তৃতীয়বার খুলনা সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে জয়লাভ করেছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক।
সত্তরোর্ধ্ব এই প্রবীণ ও অভিজ্ঞ নেতা সোমবার দিনভর ভোট শেষে বেসরকারি ফলাফলে নিকটতম প্রার্থীর চেয়ে ৯৪ হাজার ভোট বেশি পেয়ে জয় পেয়েছেন।
ফলাফল অনুযায়ী, নৌকা প্রতীকে তালুকদার আব্দুল খালেক পেয়েছেন ১ লাখ ৫৪ হাজার ৮২৫ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আ. আউয়াল হাতপাখা প্রতীকে ভোট পেয়েছেন ৬০ হাজার ৬৪টি।
নির্বাচনে জয়ের পর এক প্রতিক্রিয়ায় তালুকদার আব্দুল খালেক সাংবাদিকদের বলেন, আগের অনেক কাজ বাকি আছে; কিছু কাজ চলমান- সেগুলো শেষ করতে চান তিনি। করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে যেসব কাজ এগিয়ে নিতে পারেননি সেগুলোকে এবার প্রধান্য দেবেন।
“আমি যখন নির্বাচিত হইছি, যে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী, খুলনাবাসী সবাইকে নিয়ে আমি কাজ করতে চাই।”
বিএনপির নির্বাচনে না আসার প্রসঙ্গটি উল্লেখ করে তিনি বলেন, “যে আজকে নির্বাচন করেনি তাকে নাগরিকত্ব সনদ, জন্ম নিবন্ধন নিতে হবে এই সিটি করপোরেশনের যারা কাউন্সিলর তাদের কাছ থেকে। উনি যতই আন্দোলন করুক, অন্য কেউ দিতে পারবে না, এরাই দেবে।”
১৯৫২ সালের ১ জুন বাগেরহাটের মল্লিকেরবেড় গ্রামে জন্মগ্রহণ করলেও খালেক ছাত্রজীবন থেকেই বেড়ে উঠেছেন খুলনা মহানগরীতে। জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক থাকা অবস্থায় ১৯৭৭ সালে তিনি খুলনা পৌরসভার মহসিনাবাদ এলাকা থেকে প্রথম কমিশনার হন; এ দায়িত্ব পালন করেন ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত।
এরপর ৪৬ বছরের নির্বাচনী রাজনীতিতে বহুবার নির্বাচন করলেও একমাত্র খুলনা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনেই ২০১৩ সালে মেয়র পদে তিনি একবার মাত্র পরাজয়ের মুখ দেখেছিলেন। এ ছাড়া আর কখনও তাকে পরাজয় স্বীকার করতে হয়নি।
খুলনা-বাগেরহাট মিলিয়ে প্রতাপের সঙ্গেই রাজনীতির অঙ্গনে রাজত্ব করছেন তিনি। এর মধ্যে ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ ও ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে বাগেরহাট-৩ (রামপাল-মোংলা) আসন থেকে সংসদ সদস্য হন। ১৯৯৬ সালে ত্রাণ ও দুর্যোগ প্রতিমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
বাগেরহাটের ওই আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য তার স্ত্রী হাবিবুন নাহার; যিনি বন ও পরিবেশ উপমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
১৯৮৪ সালে খুলনা সিটি করপোরেশন গঠনের পর এ পর্যন্ত ছয়বার নির্বাচন হয়েছে। এর মধ্যে তিনবার মেয়র হিসেবে বিএনপির প্রার্থীকে বেছে নিয়েছেন খুলনাবাসী। বাকি তিনবার জয় পেয়েছেন তালুকদার আব্দুল খালেক।
১৯৯৪ ও ২০০২ সালে মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বিএনপির শেখ তৈয়বুর রহমান।
২০০৮ সালের ৪ অগাস্ট অনুষ্ঠিত খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রথম মেয়র নির্বাচিত হন। সেবার তিনি ২৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিএনপির মনিরুজ্জামান মনিকে পরাজিত করেন। এ নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৭৭.৮০ শতাংশ।
অবশ্য পরের বার ২০১৩ সালে মনিরুজ্জামান মনির কাছেই তিনি হার মেনেছিলেন প্রায় ৬০ হাজার ভোটে। সেবার মনি এক লাখ ৮০ হাজার ভোট পেয়েছিলেন। তালুকদার আব্দুল খালেক পেয়েছিলেন এক লাখ ১৯ হাজার ভোট। তখন ভোটার ছিল ৪ লাখ ৪০ হাজার ৫৬৬ জন। ভোট পড়েছিল ৬৮ দশমিক ৭০ শতাংশ।
২০১৮ সালের নির্বাচনে তালুকদার আব্দুল খালেক এক লাখ ৭৪ হাজার ভোট পেয়ে দ্বিতীয়বারের মত মেয়র হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির নজরুল ইসলাম মঞ্জু পান এক লাখ নয় হাজার ভোট। তখন ভোটার ছিল ৪ লাখ ৯৩ হাজার ৯৩ জন। ভোট পড়েছিল ৬২ শতাংশ।
৫ লাখ ৪৩ হাজার ভোটারের এ নগরীতে এবার অবশ্য ভোটের হার আগের যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় কম পড়েছে। নির্বাচন কমিশন রাতে জানিয়েছে, এবার ভোট পড়েছে ২ লাখ ৫৭ হাজার ৯৩৬ ভোট। এরমধ্যে বৈধ ভোট ২ লাখ ৫৬ হাজার ২৭৭ আর বাতিল ভোট ১ হাজার ৬৫৯। ভোটের হার ৪৮.১৭ শতাংশ।
অবশ্য ভোটের আগ থেকেই ভোটারদের কেন্দ্রে উপস্থিত করার চ্যালেঞ্জ ছিল নির্বাচনের মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের। সবাই প্রচারের ভোটারদের কেন্দ্রে আসতে উৎসাহিত করেছেন।
জয়ের পর ভোটার উপস্থিতি নিয়ে এক প্রতিক্রিয়ায় বিজয়ী মেয়র পদপ্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক বলেন, “আমি মনে করেছিলাম, আমাদের ভোটার সব খুলনায় আছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের মিল-কারখানা বন্ধ থাকার কারণে তারা টাকা পয়সা যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন, তারা সেই টাকা নিয়ে তাদের যে জন্মস্থান, তাদের বাড়িঘর সেখানে গেছে।”
বর্ণময় রাজনৈতিক জীবনে ছাত্র আন্দোলন থেকে বেরিয়ে শিল্পাঞ্চল খ্যাত খুলনায় একপর্যায়ে শ্রমিক রাজনীতিতেও জড়ান খালেক। তিনি খুলনার মহসিনবাদ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের পর শ্রমিক লীগের খুলনা জেলা শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৩ সালে ২৫ ডিসেম্বর মঞ্জুরুল ইমামের মৃত্যুর পর ২০০৪ সালে খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন খালেক; এখনও তিনি সেই দায়িত্ব পালন করছেন। তার আগে একই কমিটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগে তালুকদার আব্দুল খালেকের সঙ্গে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এম ডি এ বাবুল রানা। তিনি বলেন, “খুলনার উন্নয়নে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এবং বিগত বছরগুলোর কাজের মূল্যায়ন করেই নগরবাসী আবারও খালেককে ভোট দিয়ে জয়ী করেছে।”
খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অন্যান্য প্রার্থীর মধ্যে জাতীয় পার্টি থেকে লাঙ্গল প্রতীকে শফিকুল ইসলাম মধু পেয়েছেন ১৮ হাজার ৭৪ ভোট, জাকের পার্টি থেকে গোলাপ ফুল প্রতীকে এস এম সাব্বির হোসেন পেয়েছেন ছয় হাজার ৯৬ ভোট ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে টেবিল ঘড়ি প্রতীকে এস এম শফিকুর রহমান পেয়েছেন ১৭ হাজার ২১৮ ভোট।
সোমবার সকাল ৮টা বিকেল ৪টা পর্যন্ত ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। তবে কিছু কিছু কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিত থাকায় ৪টার পরও ভোট নেওয়া হয়।
নির্বাচনে সাধারণ ২৯টি ওয়ার্ডে ১৩৪ জন এবং ১০টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে ৩৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।