Published : 22 May 2026, 12:24 PM
জামালপুরের বকশীগঞ্জের বগারচর ইউনিয়নের হতদরিদ্রদের জন্য বরাদ্দ করা ভিজিএফের কার্ড বিএনপি নেতাদের হাতে তুলে দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সোহেল রানা পলাশ নিজ কার্যালয়ে কার্ডগুলো বিএনপি নেতাদের দেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
কার্ড হস্তান্তরের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
দুই মিনিট তিন সেকেন্ডের সে ভিডিওতে দেখা যায়, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সোহেল রানা পলাশ ভিজিএফ কার্ড গুছিয়ে বকশীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি হাসিবুল হক সঞ্জুর হাতে তুলে দিচ্ছেন।
পাশে বগারচর ইউনিয়ন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বেলায়েত হোসেন বুলাল এবং সাধারণ সম্পাদক সফিউল আলমের পাশে বসা ছিলেন।
এ সময় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বিএনপি নেতাদের উদ্দেশ্যে বলেন, “সিনিয়র সহসভাপতির নির্দেশনা মোতাবেক বরাদ্দকৃত কার্ড আমি উপজেলা সিনিয়র সভাপতির কাছে হস্তান্তর করলাম। এতে যেন আমাদের এই ইউনিয়ন পরিষদের উপরে কোনো চাপ যেন না আসে। এই চাপ থেকে বঞ্চিত রাখবেন আপনারা।
“এ কথা এই জন্য বলতেছি, এটা আসতে পারে যেহেতু আমার এই কার্ডগুলা আমার উপজেলায় দেয়ার নির্দেশনা ছিল। আমি এখানে বাধ্য হয়ে আমি সিনিয়র সভাপতির হাতে তুলে দিলাম।”
ভিজিএফ এর কার্ডগুলো বুঝে নিয়ে বকশীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি হাসিবুল হক সঞ্জু সেগুলো ইউনিয়নের নেতাদের হাতে তুলে দেন।
এ সময় তিনি বলেন, “আমি বকশীগঞ্জের সিনিয়র সহসভাপতি হিসেবে আজকের এই বগরচর ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের কাছ থেকে কার্ড বুঝে নিলাম এবং বুঝে নিয়ে আমি আমার বগরচর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকের হাতে হস্তান্তর করলাম।”
তখন উপস্থিতদের মাশাআল্লাহ বলতে ও হাত তালি দিয়ে অভিনন্দন জানাতে শোনা যায়।
পরে হাসিবুল হক সঞ্জু ওই ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক এবং নয় ওয়ার্ডের সভাপতি, সেক্রেটারি এবং অঙ্গসংগঠনের সভাপতি, সেক্রেটারিকে মিলিতভাবে বসে সিন্ধান্ত নিয়ে কার্ডগুলো সুন্দরভাবে বিতরণের জন্য নির্দেশ দিতেও ভিডিওতে দেখা যায়।
বকশীগঞ্জের উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, আসন্ন কোরবানির ঈদ উপলক্ষে বগারচর ইউনিয়নের হতদরিদ্র, দুস্থ ও অসহায় পরিবারের জন্য মোট ৮০ হাজার ৪৮০ কেজি চাল বরাদ্দ দেয়া হয়। বরাদ্দকৃত চালের বিপরীতে ৮ হাজার ৪৮টি ভিজিএফ কার্ড দেয়া হয়েছে। প্রতিটি কার্ডের মাধ্যমে সুবিধাভোগী পরিবার ১০ কেজি করে চাল পাবেন।
জানা গেছে তার মধ্যে অর্ধেক অর্থাৎ চার হাজার ২৪টি কার্ড বিএনপি নেতাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, স্থানীয় প্রশাসনের গঠিত কমিটির মাধ্যমে ইউনিয়নের প্রকৃত দুস্থ ও হত দরিদ্রদের তালিকা তৈরি করে এই কার্ড বিতরণ করার কথা।
কিন্তু প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা বা তদারকি কর্মকর্তার (ট্যাগ অফিসার) উপস্থিতি ছাড়াই এভাবে বিপুল পরিমাণ কার্ড দলীয় নেতাদের হাতে তুলে দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইউনিয়নের কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, ভিজিএফের চাল আসে গরিব মানুষের জন্য, কোনো দলের জন্য না। চেয়ারম্যান যদি অর্ধেক কার্ডই দলীয় নেতাদের হাতে দিয়ে দেন, তবে আমাদের মতো সাধারণ গরিব মানুষ চাল পাবে কীভাবে?
তাদের অভিযোগ- কার্ডগুলো এখন বিএনপি নেতাকর্মীদের আত্মীয়-স্বজন আর পছন্দের মানুষদের মাঝে ভাগাভাগি হবে। প্রকৃত অভাবীরা চাল থেকে বঞ্চিতই থেকে যাবে।
এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সোহেল রানা পলাশ বলেন, “উপজেলা বিএনপি থেকে নির্দেশনা দেয়া ছিল, তাই ভিজিএফের বরাদ্দকৃত কার্ডের অর্ধেক উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি হাসিবুল হক সঞ্জুর হাতে তুলে দিয়েছি। যাতে আমাদের ইউনিয়ন পরিষদের ওপর কোনো চাপ না আসে।”
তবে দল থেকে এ ধরনের কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি জানিয়ে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম প্রিন্স বলেন, “হতদরিদ্রদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি ভিজিএফের কার্ড যাতে গরিব অসহায় ব্যক্তিরা পান, সে বিষয়ে দলের নেতাকর্মীদের খেয়াল রাখতে বলা হয়েছে মাত্র। আর কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।”
এ বিষয়ে হাসিবুল হক সঞ্জুর মন্তব্য নেয়ার জন্য তার মোবাইলে একাধিকবার কল দিলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) হাবিবুর রহমান সুমন বলেন, “ওই ইউনিয়নের জন্য একজন ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ট্যাগ অফিসারের উপস্থিতিতে প্রকৃত উপকারভোগীদের মাঝে কার্ড ও চাল বিতরণ করতে হবে। কোনো রাজনৈতিক দলের কাছে এভাবে ভিজিএফ এর কার্ড হস্তান্তরের কোনো বিধান নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।”
বকশীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুরাদ হোসেন বলেন, “সরকারি ত্রাণ বা ভিজিএফ কার্ড কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মাধ্যমে বিতরণের আইনি সুযোগ নেই। নিয়মবহির্ভূতভাবে কার্ড হস্তান্তর করা হয়ে থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”