Published : 24 Dec 2024, 07:38 PM
মর্গ থেকে এক এক করে বের হচ্ছে মৃতদেহ। তাতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন স্বজনরা। স্বজনদের কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
এরই মধ্যে লাশ শনাক্ত করতে চাঁদপুর সদর হাসপাতালে ছুটে আসেন জাহাজের সুকানি নিহত আমিনুল মুন্সীর ভগ্নিপতি জাহিদ তুষার।
পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “জাহাজে হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি যখন জানতে পারি, প্রথমে বিশ্বাস হচ্ছিল না। হাসপাতালে এসে আমিনুলের মরদেহ শনাক্ত করি। এটি ডাকাতি নয়, আমাদের কাছে মনে হয়েছে, এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।”
সোমবার বিকালে চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার নীলকমল ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী এলাকায় মেঘনা নদীতে এমভি ‘আল বাখেরাহ’ জাহাজ থেকে পাঁচটি লাশ উদ্ধার করা হয়। এ সময় গুরুতর আহত আরও তিনজনকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক দুজনকে মৃত ঘোষণা করেন।

তাদেরই একজন ৪০ বছর বয়সী আমিনুল মন্সী। তিনি নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলার ইটনা ইউনিয়নের পাঙ্গারচর গ্রামের মজিবুর রহমানের ছেলে এবং আল বাখেরাহ’র সুকানি হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
আমিনুলের লাশ শনাক্ত করার পর তার ভগ্নিপতি জাহিদ তুষার কান্নায় ভেঙে পড়েন।
পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড কেন মনে হচ্ছে জানতে চাইলে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ছবি ও ভিডিও দেখে মনে হচ্ছে, এটি পরিকল্পিত। তা না হলে এভাবে কুপিয়ে হত্যা করত না। যদি ডাকাতরা ডাকাতি করত তাহলে মানিব্যাগ, মোবাইল ও অন্যান্য জিনিসপত্র লুট করত। এখন আমাদের দাবি, দ্রুত হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হোক যাতে দেশে এমন ঘটনা আর না ঘটে।”
নিহতের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার দাবি জানান তুষার।
আল বাখেরাহ জাহাজ থেকে লাশ উদ্ধারের পর মাস্টারসহ মোট আটজন কর্মী থাকার তথ্য দেয় মালিকপক্ষ। ইউরিয়া সার বোঝাই করে জাহাজটি সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়িতে বিসিআইসির ডিপোতে যাবার কথা ছিল বলে লাইটারেজ জাহাজ পরিচালনাকারী সংস্থা ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের কর্মকর্তা আতাউল করিম রঞ্জু জানিয়েছেন।
আমিনুল ছাড়া নিহত বাকিরা হলেন- ফরিদপুর জেলার সদর উপজেলার জোয়াইর এলাকার মো. কিবরিয়া (মাস্টার), একই এলাকার শেখ সবুজ (৩৫) লস্কর, নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলার লোহাগড়া এলাকার মো. সালাউদ্দিন (৪০) ইঞ্জিন চালক, মাগুরা জেলার মোহাম্মদপুর উপজেলার চরষশোমন্তপুর এলাকার মো. মাজেদুল (১৬) লস্কর, একই উপজেলার পলাশ বাড়িয়া এলাকার সজিবুল ইসলাম (২৬) লস্কর ও জাহাজের বাবুর্চি মুন্সীগঞ্জের রানা (২০)।
ছেলের লাশ শনাক্ত করতে এসে মাজেদুল ইসলামের বাবা আনিছ মোল্লাও কান্নায় ভেঙে পড়েন। ছেলের হত্যার বিচার চাই বলে আর্তনাদ করছিলেন তিনি।
চোখের জলে গাল ভাসিয়ে তিনি বলেন, “আমার ছেলে তো কিছুদিন আগে জাহাজে চাকরি নিয়েছিল। তাকে কেন মারল, কেন?”
জাহাজে যে সাতজন খুন হয়েছেন তাদের মধ্যে ফরিদপুরের গোলাম কিবরিয়া ও সবুজ শেখ সম্পর্কে মামা-ভাগ্নে। মঙ্গলবার সকালে বড় ভাই ও ভাগনের লাশ শনাক্ত করে এসে পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগ তুলেছেন আমান হোসেনও।
কিবরিয়া জাহাজের মাস্টার ও ভাগনে সবুজ লস্কর পদে জাহাজে কর্মরত ছিলেন। তাদের বাড়ি ফরিদপুর সদর উপজেলার জোয়াইর এলাকায়।
কিবরিয়ার ভাই আমান বলছিলেন, “এটি পরিকল্পিত। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।”
সবুজের ছোট ভাই রেজাউল করিম বলেন, “গত সোমবার বিকালের পর খবর আসে বড় ভাই জাহাজে খুন হয়েছেন। রাতেই ফরিদপুর থেকে রওনা হয়ে চাঁদপুর সরকারি হাসপাতালে আসি। পরে মরদেহ দেখে শনাক্ত করি। মরদেহ দেখে পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড মনে হচ্ছে। আমরা এর বিচার চাই।”

তবে জাহাজে সাত খুনের ঘটনাটি ‘ডাকাতি’ হিসেবে দেখছে না পুলিশ। সোমবার লাশ উদ্ধারের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন চাঁদপুর নৌ পুলিশের পুলিশ সুপার সৈয়দ মুশফিকুর রহমান।
মঙ্গলবার মোবাইল ফোনে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে কথা হয় মুশফিকুরের। তিনি বলেন, “ঘটনাটি ডাকাতি বলে মনে হয়নি। আমাদের কাছে মনে হয়েছে এটি একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড। প্রত্যেকটি মরদেহ আলাদা রুমে রুমে পড়েছিল। যা দেখে ‘পূর্বপরিকল্পিত’ মনে হয়।
“ইতোমধ্যে অনেকগুলো ক্লু পাওয়া গেছে, যা তদন্তের স্বার্থে বলা যাচ্ছে না। একটি পজিটিভ বিষয় হচ্ছে, হাসপাতালে আহত ব্যক্তির অবস্থা এখন আগে থেকে অনেক ভালো। আমরা তার কাছ থেকে অনেক কিছু জানতে পারব।”
মামলার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ঘটনাটি যেহেতু হাইমচরের নৌ সীমানায় পড়েছে, সেহেতু মামলাও সেখানেই হবে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলায় অনেক পরিবারের সদস্যরা বাদী হতে চাচ্ছেন। তাদের মধ্য থেকে একজনের সঙ্গে কথা বলে আমরা মামলাটি করব।”
এদিকে মঙ্গলবার দুপুরে নিহত সাতজনের মধ্যে ছয়জনের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের খবর জানান চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক মো মোহসীন উদ্দিন। কেবল জাহাজের বাবুর্চি মুন্সীগঞ্জের রানার (২০) লাশ হস্তান্তর প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২০ হাজার টাকা ও নৌ পুলিশের পক্ষ থেকে ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার জেলা প্রশাসন ও নৌ পুলিশের তরফ থেকে দুটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। এর আগে সোমবার শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আরেকটি তদন্ত কমিটি করা হয়।
জাহাজে ৭ খুন: ছয় শ্রমিকের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর, তদন্তে আরও
মেঘনার জাহাজে ৭ খুন: ডাকাতি নয়, 'ভিন্ন কিছু' দেখছে পুলিশ
মেঘনার সেই জাহাজের সুকানির শ্বাসনালী কাটা, ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি