Published : 29 Jul 2025, 12:53 PM
ফেইসবুকে এক ব্যক্তির তোলা ‘তদবির বাণিজ্য ও অর্থ পাচারের’ অভিযোগের জবাব দিতে গিয়ে ‘কয়েকজন মহারথীর’ বিরুদ্ধে ‘ষড়যন্ত্রের’ পাল্টা অভিযোগ এনেছেন তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলম।
হাজার কোটি টাকার চেয়ে ‘ইজ্জত ও রাষ্ট্রের আমানত’ গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করে তিনি ফেইসবুকে লিখেছেন, “সবার এখন গুজববাজ আর সুবিধাবাদী বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকা দরকার।”
নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ফেইসবুক পোস্ট এক দফা সম্পাদনাও করেছেন জুলাই অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতাদের প্রতিনিধি হিসেবে সরকারের উপদেষ্টামণ্ডলীতে দায়িত্ব পাওয়া মাহফুজ।
সোমবার রাত ২টা ৫১ মিনিটে ফেইসবুকে দেওয়ার ওই পোস্টে শুরুতে তিনি লিখেছিলেন “আজকাল অনেকের লেজকাটা যাচ্ছে বলে, আমার বিরুদ্ধে লেগেছেন। নূতন একটি দলের কয়েকজন মহারথী এতে জড়িত। সবই প্রকাশ পাবে। একটা সার্কেলে প্রায় সবাই দুর্নীতিগ্রস্ত কিন্তু একজন কোন টাকা ধরছেন না, এটা কার সহ্য হবে!”
তিনি এও লিখেছিলেন, “আমার নিকৃষ্ট শত্রুরাও গত ১২ মাসে আমার বিরুদ্ধে সব অভিযোগ করলেও দুর্নীতি বা আর্থিক অসঙ্গতির অভিযোগ করেনি। একটি নূতন দলের মহারথীদের অনেক অসুবিধা হচ্ছে তাতে।”
পরে রাত ৪টা ২৮ মিনিটে তা সংশোধন করে ‘একটি নূতন দলের’ বদলে ‘বিভিন্ন দলের মহারথীদের’ কথা বলেন মাহফুজ।
তিনি লেখেন, “আজকাল অনেকের লেজকাটা যাচ্ছে বলে, আমার বিরুদ্ধে লেগেছেন। বিভিন্ন দলের কয়েকজন মহারথী এতে জড়িত। সব ষড়যন্ত্রই প্রকাশ পাবে।
“পুনশ্চঃ আমার নিকৃষ্ট শত্রুরাও গত ১২ মাসে আমার বিরুদ্ধে সব অভিযোগ করলেও দুর্নীতি বা আর্থিক অসঙ্গতির অভিযোগ করেনি। বিভিন্ন দলের মহারথীদের অনেক অসুবিধা হচ্ছে তাতে।”
পোস্ট সংশোধনের একটি ব্যাখ্যাও সঙ্গে দিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা। লিখেছেন, “কয়েকটা বাক্য নিয়ে অযথাই জলঘোলা হচ্ছে, তাই এডিট করে দিলাম। জুলাই কতিপয় লোকের কাছে পলিটিকাল মবিলিটির ল্যডার। একটা না কয়েকটা দলের মহারথীরাই আমার/ আমাদের বিরুদ্ধে কাজ করছেন।”
মাহফুজের ওই পোস্টের মন্তব্যের ঘরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ফাহমিদুল হক প্রশ্ন করেছেন– “'নূতন একটি দলের মহারথীরা'... কি এক বিষম সংকটে দেশ!!”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র আবদুল্লা হিল বাকী লিখেছেন, “নতুন দল বলতে কারা? দলতো দুইটা এখন আলোচনায়। এনসিপিও আছে আপ-বাংলাদেশও আছে। নিজের ভাই-ব্রাদারদের দলের কারো বিরুদ্ধে কেউ বুঝেশুনে এমন স্টেটমেন্টতো দেয় না, দেওয়ার কথাও না! আপ-বাংলাদেশের কাউরে বুঝাইছেন নাকি কিছু? নাকি অন্য কেউ?”

মন্তেব্যের ঘরেই তার এ প্রএশ্নর উত্তর দিয়েছেন উপদেষ্টা মাহফুজ আলম।
তিনি লিখেছেন, “জুলাইয়ের পক্ষের অনেকের দুর্নীতির খবর পাচ্ছি। এজন্য সার্কেল বলসি। কিন্তু, একটা ছোট অংশ বাদে জুলাইয়ের সব কর্মী এখনো আগের অবস্থায় আছে। দল শুধু এনসিপি না, আরো আছে। এনসিপির চেয়ে নূতন দল বা কিছু প্লাটফর্মের আরো বেশি লোক রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গে আছে। শুধু এনসিপিকে দায় দেয়া হচ্ছে। আর, নূতন দলের কিছু মহারথী রাজনীতির হিস্যার জন্য সব করতে রাজি। কিন্তু, তারাও জানেন আমি কতটা ক্লিন হ্যান্ডস রেখে চলছি।”
মহারথী বলতে উপদেষ্টা কাদের বুঝিয়েছেন, তা জানতে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও তার জবাব পাওয়া যায়নি।
কেন এই আলোচনা?
এ আলোচনার সূত্রপাত বনি আমিন নামের অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী এক ব্লগারের ফেইসবুক পোস্টের সূত্র ধরে।
সেখানে তিনি দাবি করেন, উপদেষ্টা মাহফুজের ‘বিভিন্ন লবিং ও ফাইলিংয়ের কমিশনের অর্থ’ অস্ট্রেলিয়ায় তার বড় ভাইয়ের ব্যাংক একাউন্টে জমা হচ্ছিল ৯ মাস ধরে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ‘সাড়ে ছয় কোটি টাকার লেনদেন’ অস্ট্রেলিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার (AUSTRAC) নজরে আসে এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্টটি ‘জব্দ’ করা হয়, বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন।

বনি আমিনের ওই দাবির বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। সোমবার রাতে অসট্র্যাক এর ওয়েবসাইটে এ সংক্রান্ত কোনো মিডিয়া রিলিজ খুঁজে পাওয়া যায়নি। অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যমেও এ বিষয়ে কোনো খবরও সামনে আসেনি।
তবে মাহফুজ আলমের ভাই, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক মাহবুব আলম মাহির সোমবার রাতেই এক ফেইসবুক পোস্টে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
নিজের একটি ব্যাংক হিসাবের লেনদেনের তথ্য প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, “বনি আমিন নামক ব্যক্তি ও কিছু মিডিয়ার প্রচারিত তথ্য আসলে মিথ্যা বৈ কিছু নয়। আমি অস্ট্রেলিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ছিলাম। অস্ট্রেলিয়ার একাউন্টটি ২৩ সাল থেকে খোলা।
“আমার ভাই মাহফুজ আলমের পক্ষ থেকে কোন তদবিরের কাজ আমি করিনি। কাউকে সে আজ পর্যন্ত করতেও দেয়নি। আমার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ব্যবসায় বাদে আমার কিংবা আমাদের পরিবারের কোন আর্থিক লেনদেনের ইতিহাস নেই।”

মাহবুব আলম মাহির লিখেছেন, “আমার বাবার ও মাহফুজের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়িক উদ্যোগগুলো আমি ও আমার বাবা পরিচালনা করছি। এখানে কোন অস্পষ্টতা নাই। সবই বাংলাদেশের আইন দ্বারা সিদ্ধ এবং পাবলিক ইনফরমেশন।”
তিনি হুঁশিয়ার করে বলেছেন, “আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে ক্ষমা চাইতে হবে। আমি অস্ট্রেলিয়ায় আইনজীবীদের সাথে কথা বলছি। প্রয়োজনে আইনি ব্যবস্থা নিবো “
উপদেষ্টা যা বলছেন
মূলত বড় ভাইয়ের পোস্টটি ফেইসবুকে শেয়ার করে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলম।
একটি ঘটনার কথা তুলে ধরে তিনি দাবি করেছেন, তার ভাইয়ের কাছে একজন তদবির নিয়ে এলেও তিনি তাতে সায় দেননি।
মাহফুজ লিখেছেন, “তদবিরের কথা উঠলো যখন, একটা ঘটনা বলি। আমাদের এক বন্ধু একজন ব্যক্তিকে আমার ভাইয়ার সাথে দেখা করায়। বিটিভির একটা টেন্ডারের কাজ করে দিলে তারা পার্সেন্টেজ দিবে এবং জুলাই নিয়ে কয়েকটা দেশে প্রোগ্রামের জন্য হেল্প করবে। আমি জানার পর এটা নিষেধ করে দেই। সদুদ্দেশ্যে হলেও রাষ্ট্রের আমানতের খেয়ানত করা যাবে না। পরবর্তীতে সে টেন্ডারের কাজ ও স্থগিত হয়।
“সে ব্যক্তি কনভার্সেশন রেকর্ড করে একজন সাংবাদিককে পাঠায়। সে সাংবাদিক যোগাযোগ করলে আমি বলে দিই, ভাই আমরা একাজ করতে দেইনি। আর, ঐ লোক ফাঁসানোর উদ্দেশ্যেই জুলাইয়ের প্রোগ্রামের কথা বলে একাজ করেছে। উনি আমার কথা বিশ্বাস করে আর রেকর্ডটি পাবলিক করেননি।”
