Published : 17 Jun 2026, 09:03 AM
আর এক সপ্তাহ পরে বয়স হবে ৩৯। বেশির ভাগ ফুটবলারের ক্যারিয়ারের এপিটাফ লেখা হয়ে যায় এর অনেক আগেই। কিন্তু নামটি যখন লিওনেল মেসি, সাধারণ হিসাবের গণ্ডিতে তো তাকে আটকে রাখা যায় না! এই বয়সেও নতুন ইতিহাস লিখলেন তিনি বিশ্বকাপে নিজের প্রথম হ্যাটট্রিক উপহার দিয়ে। বিশ্বকাপ ইতিহাসেও গোলের তালিকায় পৌঁছে গেলেন চূড়ায়। অধিনায়কের অবিস্মরণীয় দিনটিতে বড় জয়ে শিরোপা ধরে রাখার অভিযান শুরু করল আর্জেন্টিনা।
বিশ্বকাপের ‘জে’ গ্রুপের ম্যাচে আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলে হারাল বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা।
ক্যানসাস সিটিতে ম্যাচের সপ্তদশ মিনিটে দুর্দান্ত গোলে দলকে এগিয়ে দেন মেসি। ৬০তম মিনিটে প্রতিপক্ষ গোলকিপার লুকা জিদানের উপহার লুফে নিয়ে তিনি ব্যবধান বাড়ান। ৭৬তম মিনিটে আরেকটি দারুণ গোলে পূর্ণ করেন হ্যাটট্রিক।
এ দিন মাঠে নেমেই ইতিহাসে নাম লেখা হয়ে যায় তার। ছয়টি বিশ্বকাপ খেলা প্রথম ফুটবলার তিনিই। আর্জেন্টিনার প্রথম ফুটবলার হিসেবে ছুঁয়ে ফেলেন ম্যাচ খেলার ডাবল সেঞ্চুরিও। পরে উপলক্ষটি রাঙান তিনি ঐন্দ্রজালিক পারফরম্যান্সে।

১৬ গোল নিয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলের তালিকায় স্পর্শ করলেন তিনি সাবেক জার্মান ফরোয়ার্ড মিরোস্লাভ ক্লোসাকে।
২০০৬ সালের ১৬ জুন বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সর্বকনিষ্ঠ গোলস্কোরার হয়েছিলেন তিনি ১৮ বছর ৩৫৮ দিন বয়সে গোল করে। ঠিক ২০ বছর পর আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বেশি বয়সী গোলস্কোরারও তিনি।
ম্যাচের প্রথম দশ মিনিটেই ছিল দারুণ নাটকীয়তা। লড়াইটা তখন ছিল সমানে সমান।
চতুর্থ মিনিটে লাউতারো মার্তিনেসের দুর্বল হেড সহজেই ধরে নেন আলজেরিয়ার গোলকিপার লুকা জিদান।
পরের মিনিটেই মার্তিনেসের কাছ থেকে বল পেয়ে বাঁ প্রান্ত দিয়ে ভেতরে ঢুকে জিদারে পাশ দিয়ে চিপ করে বল জালে জড়ান মেসি। ধারাভাষ্যকার চিৎকার করে ওঠেন মেসির নামে। কিন্তু তার কণ্ঠ মিইয়ে আসে রেফারির বাঁশি শুনে, “স্বপ্নের মতো শুরু হতে পারত আর্জেন্টিনার…।” হতে পারত, কিন্তু হয়নি। কারণ, মেসি ছিলেন অফসাইড।
দুই মিনিট পর সেই অভিজ্ঞতা হয় আলজেরিয়ার। বক্সের একটু বাইরে থেকে আর্জেন্টিনার তিনজনের মধ্য থেকে চোখধাঁধানো পাস বাড়ান ফারিদ এল মেলালি শেইবি। সেই বল ধরে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে বল জালে জড়ান এহমেদ কেন্দুসি মাজা। কিন্তু তাদের আলজেরিয়ানদের উল্লাসের পর ভিএআর রেফারি জানান অফসাইডের সিদ্ধান্ত। মাজার বাড়িয়ে ধরা বাঁ হাতটুকু ছিল শুধু অফসাইড!
ম্যাচের প্রথম বৈধ গোলের জন্যও খুব বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি। সপ্তদশ মিনিটেই মেসির জাদুর ঝলক। রদ্রিগো দে পল মাঝমাঠ থেকে বল বাড়ান মেসির দিকে। বল দিয়ে দ্রুত একটু এগিয়ে বক্সের বাইরে থেকে দুই ডিফেন্ডারের মাঝ দিয়ে বাঁ পায়ের গোলা ছোড়েন তিনি। গোলকিপার জিদানের কিছু করার ছিল না। উড়ন্ত ডাইভ দিয়েও বলের নাগাল পাননি তিনি।
বিশ্বকাপে বক্সের বাইরে থেকে তার পঞ্চম গোল এটি, ১৯৬৬ আসর থেকে এখনও পর্যন্ত যা বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ।
২০০৬ বিশ্বকাপে মেসির অভিষেক আসর ছিল কিংবদন্তি জিনেদিন জিদানের শেষ বিশ্বকাপ। ২০ বছর পর সেই মেসি নিজের শেষ বিশ্বকাপে গোল করলেন জিদানের ছেলের বিপক্ষে।
আগে গোল হজম করে বিশ্বকাপে কখনোই জিততে পারেনি আলজেরিয়া। আগের ছয়টি তারা হেরেছে, জিতেছে দুটি।
এরপর বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে খেলতে থাকে আর্জেন্টিনা। হাইড্রেশন বিরতির পর একটু গুছিয়ে ওঠে আলজেরিয়া।
৩৭তম মিনিটে প্রায় ৪০ মিটার দূর থেকে ফ্রি কিকে সরাসরি গোলের চেষ্টা করেন মেসি। কিন্তু বল চলে যায় বেশ ওপর দিয়ে।
৩৯তম মিনিটে কাছ থেকে নেওয়া শেইবির শট ফেরান এমি মার্তিনেস। পরের মিনিটেই শেইবির হেড বাইরে চলে যায়।
প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে আনিস হাজ মুসা বক্সের ভেতর দুজনকে কাটিয়ে বর বাড়ান মাঝখানে। সেখানে একজনের পায়ে লেগে গতি হারানো বল সহজেই মুঠোয় নেন আর্জেন্টিনার গোলকিপার মার্তিনেস।
একদম শেষ সময়ে ফ্রি কিক থেকে আলিক্সেস মাক আলিস্তেরের হেড উড়ে যায় গ্যালারিতে।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুটা হয় একটু ঢিমেতালে। ৫১তম মিনিটে বক্সের মাথা থেকে মেসির শট ওপর দিয়ে চলে যায়।
দুই মিনিট পর মেসির চমৎকার পাস থেকে লাউতারো মার্তিনেসের শট ফিরিয়ে দেন জিদান। মেসির সেই গোলের পর ম্যাচে প্রথমবার লক্ষ্যে বল রাখতে পারে আর্জেন্টিনা।
৬০তম মিনিটে বক্সের অনেক বাইরে থেকে মাক আলিস্তেরের গড়ানোর শট শুয়ে পড়ে ঠেকালেও নিরাপদ করতে পারেননি জিদান। বরং বল পেয়ে যান সামনেই ফাঁকায় থাকা মেসি। আলতো টোকায় বল জালে জড়ান তিনি। তার ক্যারিয়ারের সহজ গোলগুলির একটি।
ধারাভাষ্যকাররা আলোচনা করছিলেন, এত কিছু অর্জন করলেও বিশ্বকাপে এখনও হ্যাটট্রিক নেই মেসির। এসব আলোচনার মধ্যেই ৬৫তম মিনিটে দারুণভাবে বল নিয়ে ছোটেন। ধারাভাষ্যকারের কণ্ঠে উত্তেজনা, “এটিই কী সেই মুহূর্ত….!”
কিন্তু না, মেসির বাঁ পায়ের আরেকটি গোলা দারুণ দক্ষতায় ফিরিয়ে দেন জিদান।
সেই মুহূর্তটি আসে একটু পরই। পাল্টা আক্রমণে নিকো গন্সালেরে কাছ থেকে বল পেয়ে বক্সের ঠিক মাথা থেকে দারুণ এক গড়ানো শটে জিদানকে পরাস্ত করেন তিনি।
৭৯তম মিনিটে তুলে নেওয়া হয় তাকে। গোটা গ্যালারি উঠে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানায় তাকে।
ম্যাচের বাকি সময়ে আর তেমন কিছু হয়নি। মেসিময় ম্যাচে আরও কিছু হওয়ার প্রয়োজনও নেই!