Published : 11 Aug 2026, 12:47 AM
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনকারীদের ‘বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পাল্টা আগুন দেওয়ার নির্দেশ’ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিয়েছিলেন বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যুক্তিতর্কের শুনানিতে তার একটি অডিও ‘ফোনালাপে’ তুলে ধরা হয়েছে।
একই সময়ে জমায়েত ছত্রভঙ্গ করতে ‘হেলিকপ্টার ব্যবহারে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ দেওয়া’ এবং ‘আন্দোলনকারীদের ওপর সহিংসতার দায় চাপানোর’ কথার অডিও ফোনালাপও ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়েছে।
সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ শেখ হাসিনার সঙ্গে ওবায়দুল কাদের ও হাছান মাহমুদের অডিও ফোনালাপ প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে প্রসিকিউশনের পক্ষে অডিওটি উপস্থাপন করে যুক্তি তুলে ধরেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম।
পরে তামিম এ দুই অডিও ‘ফোনালাপের’ কথোপকথনের একটি অনুলিপি দেন সাংবাদিকদের।
নথিতে থাকা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ ও ২১ জুলাই তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের সঙ্গে শেখ হাসিনার এসব ফোনালাপ হয়।
‘পাল্টা আগুন’ ও এমপিদের নির্দেশ
১৯ জুলাই দুপুর ২টা ৫৪ মিনিটের ফোনালাপে শেখ হাসিনা ও হাছান মাহমুদের কথোপকথনে ‘পাল্টা আগুনের’ কথা উঠে আসে।
শেখ হাসিনা বলেন, “ওরা আগুন দিয়ে পুড়াবেতো, তাদের বাড়ি-গাড়ি আছে এখন সেগুলো পাবলিক দিয়ে পুড়াবে আর কী করবে।”
এরপর তিনি বলেন, “এখন অন্য কিছু করে লাভ নাই তোরাও পুড়াবি আয় আমরাও পুড়াব।”
এই নির্দেশকে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ ‘টিট ফর ট্যাট’ বলে সমর্থন করেন এবং বলেন, গায়েবানা জানাজা পড়ে তারা ১০ মিনিটের মধ্যে মহল্লায় মহল্লায় চলে যাবেন।
শেখ হাসিনা তখন সংশোধন করে বলেন, মহল্লায় নয়, যার যার এলাকায় যেতে হবে। একইসঙ্গে তিনি প্রতিটি সংসদ সদস্যকে ডেকে এলাকায় ‘প্রোটেকশনের’ ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন।
এ কথোপকথনের পর ফোনালাপে ওবায়দুল কাদের যুক্ত হন। শেখ হাসিনা তাকে সেতু ভবনে আগুন দেওয়ার কথা তুলে ধরে সেখানে র্যাব পাঠানোর কথা বলেন।
তিনি বলেন, “আমাদেরও বাড়ি ঘরে আগুন দিচ্ছে ওদের বাড়ি ঘরে আগুন পাবলিক দিবে। ওদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কি কি আছে খুঁজে বের কর।”
হেলিকপ্টার দিয়ে ছত্রভঙ্গের নির্দেশ
এর আগে ১৯ জুলাই দুপুর ২টা ৩৮ মিনিটের ফোনালাপে ওবায়দুল কাদের তৎকালীন ডিএমপি কমিশনারের বরাত দিয়ে বলেন, পুলিশ সমাবেশের দিকে নজর দিচ্ছে না; বরং যারা আগুন দিচ্ছে বা সহিংসতা করছে, তাদের দিকে নজর দিচ্ছে।
এ কথা শুনে শেখ হাসিনা বলেন, “সে একা একাই নিজের মত করে বলতেছে কিসের জন্য আমিতো জানি না... সে যে একা একা করতেছে আইজিপির সাথে কথা বলে নিচ্ছে না?”
দলীয় লোকজন জড়ো করার কৌশল হিসেবে কাদের বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে সমাবেশ না করে ‘গায়েবানা জানাজা’ পড়ার প্রস্তাব দেন।
শেখ হাসিনা তাতে সায় দিয়ে বলেন, “আর যেখানে যেখানে বেশি ওরা জমায়েত করতে থাকবে র্যাবকে বলতে হবে, বিজিবি ওরা রেডি আছে হেলিকপ্টার ওরা হেলিকপ্টার থেকে ইয়ে করবে ছত্রভঙ্গ করবে।”
গ্রেপ্তার ও জোট নেতাদের প্রসঙ্গ
শেখ হাসিনা ও ওবায়দুল কাদেরের ফোনালাপে আন্দোলনকারীদের জমায়েতের স্থান নিয়েও কথা বলতে শোনা যায়। শেখ হাসিনা মনে করেছিলেন, জমায়েত হয়তো প্রেস ক্লাবের সামনে হবে। ওবায়দুল কাদের তাকে জানান, প্রেস ক্লাব খালি।
এসময় রুহুল কবির রিজভীকে গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গ উঠলে শেখ হাসিনা বলেন, “আমি বলছি যে কয়টারে পার উঠায়া নিয়া যাও।”
১৪ দলের প্রসঙ্গ উঠলে রাশেদ খান মেননের বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, “মেনন ভাইতো বলছে এদেরকে সমর্থন দিতে এখানেতো আবার জামাত আছে।”
বিদেশি কূটনীতিকদের ব্রিফিং ও মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ
হাছান মাহমুদ ২১ জুলাইয়ের ফোনালাপে শেখ হাসিনাকে বিদেশি কূটনীতিকদের ব্রিফিংয়ের বিষয়ে অবহিত করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ ৮৫ জন কূটনীতিককে ব্রিফিং করা হয়।
হাছান মাহমুদ বলেন, মিডিয়াকে ডাকলে তারা উল্টাপাল্টা সংবাদ করতে পারে–এ কারণে কোনো মিডিয়াকে ডাকা হয়নি। শুধু বিটিভি ও মন্ত্রণালয়ের ক্যামেরা ছিল।
শেখ হাসিনা তার এ পদক্ষেপের প্রশংসা করেন।
কানাডার হাই কমিশনারের মানবাধিকার নিয়ে করা প্রশ্নের জবাবে হাছান মাহমুদ বিটিভি, মেট্রো রেল ও ডেটা সেন্টারে আগুন দেওয়ার বিষয় তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আমেরিকা, ব্রাসেলস বা ফ্রান্সেও পুলিশ আক্রান্ত হলে গুলি করে।”
ইন্টারনেট সংযোগ নিয়ে কূটনীতিকদের উদ্বেগের প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, “না, খুব ভালো হয়েছে; চুপ করে থাকো। ইন্টারনেট কানেকশন এতক্ষণ (থাকলে) উল্টাপাল্টা অনেক কিছু কইতো।”
এ ফোনালাপে আন্দোলন ও হত্যার দায় ছাত্র এবং বিরোধী দলের ওপর চাপানোর কৌশল নিয়েও কথা বলতে শোনা যায়।
শেখ হাসিনা বলেন, ছাত্ররা অগ্নিকাণ্ডের দায় নিতে অস্বীকার করার পরই পুলিশ ও সরকার অ্যাকশনে গিয়েছিল।
তিনি হাছান মাহমুদকে কোটা বাতিলের প্রজ্ঞাপন নিয়ে প্রচার করতে বলেন। সরকার প্রজ্ঞাপন বাতিল করেনি; বরং হাই কোর্ট তা বাতিল করেছে এবং সরকারই আপিল করেছে- এগুলো তুলে ধরতে বলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, “খুনি তারা এই আন্দোলনের নামে আন্দোলন করছে আর তাদের উপর ভর করেছে এই জামাত বিএমপি [বিএনপি] সমস্ত খুন করছে।”
হাছান মাহমুদ বলেন, বিদেশিদের কাছে তিনি ‘রিলিজিয়াস অ্যাক্টিভিস্ট’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন।
তার ভাষ্য, বিদেশিরা এটি বিশ্বাস করে। শেখ হাসিনা এতে সায় দিয়ে বলেন, “এরা তো সব তালেবানি স্টাইলেইতো করছে।”
‘ছাত্ররা নিজেরাই গুলি করে মারছে’
ফোনালাপের শেষ দিকে শেখ হাসিনা বলেন, “আর গুলি করেতো ছাত্র মারা হয়নি; ছাত্ররা নিজেরা নিজেরাই তো করছে। এরাইতো গুলি করে মারছে...”
তিনি নেতাদের এ বয়ান প্রচারের নির্দেশও দেন।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ, জুলাই-অগাস্টে আন্দোলন দমনে আসামিরা ‘সমন্বিতভাবে নির্দেশ, প্ররোচনা ও উসকানিমূলক বক্তব্য’ দেন। কোথাও কোথাও ‘সশস্ত্র হামলা, কঠোর দমন-পীড়ন ও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণেও’ আসামিরা ভূমিকা রাখেন। এর ফলে দেশজুড়ে হত্যা ও ব্যাপক সহিংসতা হয়।
এ মামলায় তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ২৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। গত ৪ অগাস্ট থেকে ট্রাইব্যুনালে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু হয়।
এর আগে গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের দেওয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়।
ওবায়দুল কাদের ছাড়া এ মামলার পলাতক অন্য ৬ আসামি হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগ সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান।
কাদের ও আরাফাতের কল রেকর্ড ট্রাইব্যুনালে: ‘মারামারির ভিডিও দেখালে চ্যানেল বন্ধ’