Published : 10 Aug 2026, 05:33 PM
জুলাই আন্দোলনের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সেতুমন্ত্রী আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ দলটির সাত নেতার বিরুদ্ধে যুক্তিতর্কের চতুর্থ দিনে একটি অডিও ফোনালাপ উপস্থাপন করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, ৩ মিনিট ২৭ সেকেন্ডের এই অডিও রেকর্ডটি ওবায়দুল কাদের ও তৎকালীন তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাতের মধ্যকার।
সেখানে শোনা যায়, কোনো টেলিভিশনে সংঘাত বা মারামারির ভিডিও দেখালে তাদের ‘এনিমি অব দ্য স্টেট’ বা ‘রাষ্ট্রের শত্রু’ ঘোষণা করে বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে কাদেরকে জানাচ্ছেন আরাফাত।
সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ অডিও ফোনালাপটি প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে প্রসিকিউশনের পক্ষে অডিওটি উপস্থাপন করে যুক্তি তুলে ধরেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম।
এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, সুলতান মাহমুদ ও সহিদুল ইসলাম সরদার। আসামিপক্ষের আইনজীবীরাও ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন।
নথিতে থাকা তথ্য অনুযায়ী, ফোনালাপটি ২০২৪ সালের ২০ জুলাই দুপুর ২টার সময়ের। জুলাই আন্দোলন চলাকালে টেলিভিশন সম্প্রচার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কথা বলছিলেন ওবায়দুল কাদের ও আরাফাত।
ফোনালাপে ওবায়দুল কাদের প্রথমে বলেন, “এই যে যারা কথা শোনে না, আমি তো প্রত্যেকটা টিভি চ্যানেলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।”
জবাবে আরাফাত বলেন, তিনি এরই মধ্যে দুয়েকটি চ্যানেল বন্ধ করে দিয়েছেন এবং অন্যদেরও সতর্ক করেছেন।
এ সময় ওবায়দুল কাদের টেলিভিশনগুলো যাতে সংঘাতের খবর না দেয়, সে বিষয়ে জোর দেন।
তখন আরাফাত বলেন, তিনি টেলিভিশন স্টেশনগুলোকে নির্দেশ দিয়েছেন, সংঘাত বা মারামারির ভিডিও দেখালে তাদের ‘এনিমি অব দ্য স্টেট’ ঘোষণা করা হবে এবং আজীবনের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হবে।
“আমি থ্রেট করে রাখছি আজকে। আর ওই যে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটগুলোকে (লোক) বসায় রাখছি যে, আপনি কনস্ট্যান্টলি দেখবেন, যে টিভি ক্ল্যাশের ছবি দেখাবে সাথে সাথে অফ করে দেবেন। আমার কোনো পারমিশনের জন্য মেসেজ পাঠাবেন না।
“আপনাকে অটোপারমিশন দিয়ে রাখলাম। আর উইদাউট পারমিশনটা অফ করবেন না আজ। এই ব্যবস্থা নিয়ে রাখছি কাদের ভাই আজকে।”
ফোনালাপে আন্দোলনকারীদের বিষয়েও কাদেরের সঙ্গে আরাফাতের কথা হয়। ওবায়দুল কাদের পরিস্থিতি জানতে চাইলে আরাফাত দাবি করেন, কোটা আন্দোলনকারীরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে।
আরাফাত বলেন, “একদল হল কোটা আন্দোলনকারী স্টুডেন্ট, যাদের সাথে আমরা আলাপ করছি। আরেকটা হল তৃতীয় পক্ষ অর্থাৎ জামায়াত-বিএনপি সন্ত্রাসীরা, যারা পোড়াচ্ছে। সো কারফিউ ডিসিশন হচ্ছে, জামায়াত-বিএনপি সন্ত্রাসী যারা পোড়াচ্ছে, তাদের বিপক্ষে। আর কোটা আন্দোলকারী ছাত্রদের সাথে আমাদের ডিসকাশন হচ্ছে, আলোচনা করে সলিউশনে যাচ্ছি। এই হচ্ছে আমাদের ন্যারেটিভ এখন।”
ওবায়দুল কাদের ওই বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন। কথোপকথনের শেষাংশে আরাফাত বলেন, আলোচনার পর তিনি গণভবনে এসেছেন এবং একটি ব্রিফ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, তিনি বাড়ি ফিরেছেন এবং সেখানে ছোটখাট ব্রিফ করেছেন। এ সময় তিনি আহত দলীয় নেতাকর্মীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন। আরাফাত চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন।
এর আগে ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আরেকটি ফোনালাপ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হয়। সেখানে আন্দোলনকারীদের মারার জন্য কাদেরকে উসকে দিতে শোনা যায় বলে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ, জুলাই-অগাস্টে আন্দোলন দমনে আসামিরা ‘সমন্বিতভাবে নির্দেশ, প্ররোচনা ও উসকানিমূলক বক্তব্য’ দেন। কোথাও কোথাও ‘সশস্ত্র হামলা, কঠোর দমন-পীড়ন ও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণেও’ আসামিরা ভূমিকা রাখেন। এর ফলে দেশজুড়ে হত্যা ও ব্যাপক সহিংসতা হয়।
এ মামলায় তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ২৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। গত ৪ অগাস্ট থেকে ট্রাইব্যুনালে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু হয়।
এর আগে গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের দেওয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়।
ওবায়দুল কাদের ছাড়া এ মামলার পলাতক অন্য ৬ আসামি হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগ সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান।
আরও পড়ুন: