Published : 29 Dec 2025, 07:01 PM
নির্বাচন কমিশনের সংলাপে না ডাকাসহ ছয় কারণ তুলে ধরে আগামী ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দিয়েছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক দল বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি।
দলটির দাবি, নির্বাচন কমিশন বিশেষ ‘রাজনৈতিক চাপে নিরপেক্ষতা হারিয়েছে’, আর ‘একপেশে’ নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার।
আওয়ামী লীগে মতো কার্যাক্রমে নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও এবং নিবন্ধন স্থগিত না হলেও সোমবার ওয়ার্কার্স পার্টির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নির্বাচন থেকে বিরত থাকার বিষয়টি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি কিছু অভিযোগও তোলা হয়েছে।
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগের জোটে থাকা ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন সরকারের মন্ত্রীও ছিলেন।
গত বছরের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। আন্তর্জতাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাশাপাশি সাবেক মন্ত্রীদের মধ্যে মেননের বিচার প্রক্রিয়া চলছে।
গত বছরের ২২ অগাস্ট ঢাকার গুলশান থেকে মেননকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তারিখ রেখে ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী সোমবার মনোনয়পত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন ওয়ার্কার্স পার্টি ভোটে না আসার ঘোষণা দিল।
এদিন ১৪ দলের আরেক শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল
মেননের নেতৃত্বাধীন ওয়ার্কাস পার্টি বলছে, গণতান্ত্রিক পথযাত্রায় জনগণের মতো তারাও ভয়ভীতিহীন অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন প্রত্যাশা করে। তার জন্য পার্টি ‘প্রস্তুতিও’ গ্রহণ করেছিল।
“প্রধান নির্বাচন কমিশনার কর্তৃক জাতির উদেশ্যে দেওয়া ভাষণে সুষ্ঠু নির্বাচনের আশা ধ্বনিত হলেও বাস্তবে নির্বাচন প্রক্রিয়ার ধাপগুলো ক্রমান্বয়ে এখন ধূসর হয়ে উঠছে, দূরে সরে যাচ্ছে, নির্বাচনকে অনিশ্চিত করে তুলছে।”
ওয়ার্কার্স পার্টি নির্বাচন থেকে বিরত থাকার কারণ তুলে ধরে বলেছে, “প্রথমত: নির্বাচন কমিশন ‘বিশেষ রাজনৈতিক চাপে’ প্রথমেই নিরপেক্ষতা হারিয়ে নিবন্ধন থাকার পরও ওয়ার্কার্স পার্টিসহ অনেক দলকেই নির্বাচন প্রস্তুতিকালে সংলাপে ডাকে নাই ও চিঠিও প্রদান করে নাই। উপরন্তু ওয়ার্কার্স পার্টি ১০ দফার একটি প্রস্তাবনা সিনিয়র সচিবের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছিল।
“দ্বিতীয়ত: তফসিল ঘোষণা পরবর্তীতে দেশে আইনশৃঙ্খলার চূড়ান্ত অবনতি ঘটেছে।”
দলটি রাজনৈতিক খুন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তাহীনতা, পোশাককর্মী দীপু চন্দ্র দাসের হত্যাকাণ্ড, মাজার, পীরের খানকা, বাউলদের ওপর হামলা, প্রার্থীর ওপর আক্রমণ, সংবাদপত্রের কার্যালয়ে হামলা ও আগুন দেওয়া, ছায়ানট ভবন ও উদীচী কার্যালয় তছনছের ঘটনা তুলে ধরেছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে নির্বাচন কমিশন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সকল ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে, যা নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে বলে দাবি করেছে ওয়ার্কার্স পার্টি।
দলটি তৃতীয়ত কারণ হিসেবে নির্বাচনে জামানতসহ সিডি কেনার শর্ত এবং মূল্যের বিষয়টি তুলে ধরেছে। তারা মনে করছে, এতে কালো টাকার ব্যবহার বাড়বে এবং গণমানুষ, সৎ ও যোগ্য মানুষকে নির্বাচনের মাঠ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা অবাধ নির্বাচনের পরিবেশ ও ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করে না।
চতুর্থ কারণ হিসেবে ওয়ার্কার্স পার্টি বলেছে, অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন থানার লুট হওয়া অস্ত্র ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হয়নি, যা নির্বাচনি সহিংসতায় ব্যবহৃত হওয়ার শঙ্কা তৈরি করেছে।
ওয়ার্কার্স পার্টি মনে করছে, সেসব অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ সংকুচিত হচ্ছে।
দলটি পঞ্চম কারণ হিসেবে যে বক্তব্য দিয়েছে তাতে পরিকল্পিতভাবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার কথা বলা হয়েছে।
ওয়ার্কার্স পার্টি তাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও তার সহযোগী সংগঠনের কার্যালয় সরকার সমর্থিত ‘মবগোষ্ঠী’ গেল ১৩ নভেম্বর থেকে দখলে রাখার অভিযোগ তুলেছে। দলটি বলছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে দেওয়া ১০ দফা স্মারকলিপি ও আবেদন পাঠালেও তাদের কার্যালয়ের দখল পুনরুদ্ধারে নির্বাচন কমিশনের কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।
পুলিশ, সেনাবাহিনী, আদালতের শরণাপন্ন হলেও কোনো প্রতিকার না পাওয়ার কথা তুলে ধরে ওয়ার্কার্স পার্টি বলেছে, গোটা বিষয়টি একটি ভয়ভীতিহীন নিরপেক্ষ পরিবেশ নির্দেশ করে না।
রাশেদ খান মেননের মুক্তি, সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা, পলিটব্যুরোর সদস্য মুস্তফা লুৎফুল্লাহ, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রফিকুল ইসলাম পিয়ারুল, টিপু সুলতানসহ নেতাকর্মীদের মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানানোর বিষয়টি তুলে ধরেছে দলটি।
তারা ভোটে না যাওয়ার ষষ্ঠ কারণ হিসেবে নির্বাচনে সকলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন কোনো উদ্যোগ না নেওয়ার কথা বলেছে।
ওয়ার্কার্স পার্টি বলেছে, “বিগত সরকারের ঘাড়ে সুষ্ঠু অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হওয়ায় দোষ চাপিয়ে ৫ আগস্ট ২০২৪ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গঠিত ড. ইউনূসের সরকার পুনরায় সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ ব্যতীত একপেশে নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছেন। পুনরায় একটি ভুল প্রক্রিয়ায় এদেশের জনগোষ্ঠীর বিরাট অংশের ভোটারদের ও দলকে নির্বাচনের বাইরে ঠেলে দিচ্ছেন, যা আগামী নির্বাচনে গণতন্ত্রের পথ মসৃণ হবে না।
“রাজনৈতিক সংকট এড়িয়ে দেশে শান্তি, স্থিতিশীলতা আসবে না। নতুন সংকটে দেশ পতিত হবে। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি এখনও মনে করে নির্বাচনের পরিবেশ ফেরাতে সরকারের উচিত হবে সকল পক্ষের জন্য নির্বাচনের পথকে বিকশিত করে সকলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। সেটি করতে না পারলে ব্যর্থতার দায়ভার অন্তর্বর্তী সরকারকেই নিতে হবে।”