Published : 06 Dec 2025, 01:34 AM
অসুস্থ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে নেওয়া যাবে কি না, সেটি নির্ভর করছে তার শারীরিক অবস্থার ওপর।
বিএনপি নেতারা বলছেন, খালেদা জিয়ার অবস্থা অনুকূল হলে মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শ অনুযায়ী তাকে লন্ডনে নেওয়া হবে।
তার শারীরিক অবস্থা উড়োজাহাজে দীর্ঘ ভ্রমণের ধকল নিতে পারবে কি না, সে বিষয়ে চিকিৎসা দল সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরেই আসবে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স।
কথা ছিল শুক্রবার সকালেই খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কাতারের আমিরের বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে লন্ডনে নেওয়া হবে।

তবে শুক্রবার সকালেই তার লন্ডনযাত্রা পেছানোর খবর এসেছে। প্রথমে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের যান্ত্রিক ত্রুটিকে যাত্রা পেছানোর কারণ হিসাবে বলা হলেও খালেদা জিয়ার অবস্থার অবনতির বিষয়টিও আলোচনায় আসছে।
বিএনপির একজন শীর্ষ নেতা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, খালেদা জিয়ার মেডিকেল বোর্ড বৃহস্পতিবার তাকে বিদেশে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছিল। কিন্তু রাতে বৃহস্পতিবার রাতেই তার শারীরিক অবস্থার কিছুটা অবনতি ঘটে। যাত্রা পিছিয়ে যাওয়ার এটাও একটি কারণ।
এর মধ্যে শুক্রবার লন্ডন থেকে ঢাকায় এসেছেন খালেদা জিয়ার বড় ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমান।
পেশায় চিকিৎসক জুবাইদা নিজেও তার শাশুড়ির জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সদস্য। সকালে ঢাকায় নামার পর বিমানবন্দর থেকে তিনি সরাসরি এভারকেয়ার হাসপাতালে যান। গত ২৩ নভেম্বর থেকে বসুন্ধরার ওই হাসপাতালে ভর্তি আছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।
তার রোগমুক্তি কামনা করে শুক্রবার জুমার নামাজের পর সারাদেশে কয়েক হাজার মসজিদে এক যোগে দোয়া হয়েছে। বিএনপির বিভিন্ন ইউনিটের উদ্যোগে চলছে দোয়ার আয়োজনও।

যাত্রা পেছাল
খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ড উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে যুক্তরাজ্যে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দেওয়ার পর জানানো হয়, গত জানুয়ারির মত এবারও কাতারের আমিরের বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে লন্ডনে পাঠানো হবে। কথা ছিল সেই এয়ার অ্যাম্বুলেন্স শুক্রবার সকালেই তাকে নিয়ে লন্ডনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবে।
সেদিনই জানানো হয়, খালেদা জিয়ার বড় পুত্রবধূ জোবাইদা রহমান ঢাকায় আসার পরে তিনিও এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে লন্ডনে যাবেন শাশুড়ির সঙ্গে।
একদফা সময় পেছানোর পর জুবাইদা রহমানসহ শুক্রবার সকাল থেকে দুপুরের মধ্যে লন্ডন যাত্রার যে তথ্যটি ছিল এদিন সকালেই তাতে পরিবর্তন আসে।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সকালে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘কারিগরি ত্রুটির কারণে’ এয়ার অ্যাম্বুলেন্স শুক্রবার আসছে না। সব ঠিক থাকলে সেটা শনিবার পৌঁছাতে পারে।
“ম্যাডামের শরীর যদি যাত্রার উপযুক্ত থাকে এবং মেডিকেল বোর্ড যদি সিদ্ধান্ত দেয়, তাহলে ইনশাল্লাহ ৭ তারিখ (রোববার) ফ্লাই করবেন।”
তবে সকালেই আভাস মেলে, কাতার আমিরের ব্যক্তিগত বহরের এয়ার অ্যাম্বুলেন্স এর আগে যেটা এসেছিল, সেটা এবার আসছে না।

দুপুরে নয়াপল্টন মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়ে সাংবাদিকদের মির্জা ফখরুল বলেন, “দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ। তিনি ফ্লাই করতে পারবেন কি না, সেটা ডাক্তাররা বা মেডিকেল বোর্ড নিশ্চিত করলেই তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে লন্ডন নিতে হবে।
“চিকিৎসকরা প্রাণপণে চেষ্টা করছেন এবং আশা করছেন যে, আগামীকাল যদি এয়ার অ্যাম্বুলেন্স এসে পৌঁছায়, তাহলে আগামী পরশু অর্থাৎ রোববার তাকে লন্ডনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।”
তবে বিকালে অন্য খবর আসে। ঢাকায় কাতার দূতাবাসের জনসংযোগ কর্মকর্তা আসাদুর রহমান আসাদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, কাতারের আমিরের (রয়্যাল ফ্লিটের) এয়ার অ্যাম্বুলেন্স আসছে না। তবে কাতার সরকার জার্মানির একটি কোম্পানি থেকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে দিচ্ছে। সেটা ঢাকায় এসে খালেদা জিয়াকে লন্ডনে নিয়ে যাবে।
শনিবার বিকালে ওই এয়ার অ্যাম্বুলেন্স ঢাকায় পৌঁছাতে পারে বলে দূতাবাস থেকে প্রাথমিক ধারণা দেওয়া হলেও একটি সূত্র জানিয়েছে, বিষয়টি আরো বিলম্বিত হতে পারে।
তিনি বলেন, “এয়ার অ্যাম্বুলেন্স শনিবার আসার জন্য যে প্রস্তুতি, সেটা এখনো নেওয়া হয়নি। খালেদা জিয়ার মেডিকেল টিমের ওপর বিষয়টা নির্ভর করছে। তবে সেটা শনিবার আসছে না এ বিষয়টি মোটামুটি নিশ্চিত।”
রাতে দূতাবাস সূত্র জানায়, সবকিছু নির্ভর করছে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার ওপর। তার মেডিকেল টিম যখন চাইবে, এয়ার অ্যাম্বুলেন্স তখন আসার প্রস্তুতি নেবে।
আর খালেদা জিয়ার চিকিৎসা দলের একজন দায়িত্বশীল সদস্য জানান, তার অবস্থার পরিবর্তন হয়নি, বেশ সংকটাপন্ন। তার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ড দুপুরে এবং সন্ধ্যায় দুই দফা বৈঠক করেছে। এই দুইটি বৈঠকে বিএনপির চেয়ারপারসনের স্বাস্থ্য রিপোর্টগুলো পর্যালোচনা করা হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক জাহিদ হোসেন বলেন, “কিছু পরীক্ষা বোর্ড দিয়েছে। সেগুলো করা হচ্ছে। এর বেশি কিছু বলা নেই।”
এদিকে শুক্রবার সন্ধ্যায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের থেকে আসা একটি ভিভিআইপি ফ্লাইট পরিচালনার অনুরোধের অনুমোদন দিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) ফ্লাইট সেফটি রেগুলেশন্স (এফএসআর) বিভাগ। বেবিচক থেকে জানানো হয়েছে, এখন সুবিধামত সময়ে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স আসতে পারে।
৭৯ বছর বয়সী সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দীর্ঘ দিন থেকে আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিসের পাশাপাশি কিডনি, লিভার, ফুসফুস, হৃদযন্ত্র, চোখের সমস্যাসহ নানা জটিলতায় ভুগছেন।
২০২০ সালে কারাগার থেকে মুক্তির পর দলের কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তিনি সরাসরি অংশ নেননি।
তবে চলতি বছরের শুরুতে লন্ডনে চিকিৎসা করিয়ে আসার পর তাকে ঘিরে বিএনপিতে নতুন করে উদ্দীপনা তৈরি হয়। আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি তিনটি আসনে ভোট করবেন বলে বিএনপির পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়।
এর মধ্যে গত ২৩ নভেম্বর রাতে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ফুসফুসে সংক্রমণ ধরা পড়ায় তাকে ভর্তি করে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে নেওয়া হয় ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে।

সরকার তাকে ‘ভিভিআইপি’ ঘোষণা করার পর সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্ব নেয় এসএসএফ ও পিজিআর।
তিন বাহিনীর প্রধানদের পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান মঙ্গলবার রাতে এভারকেয়ারে গিয়ে খালেদা জিয়াকে দেখে আসেন। এরপর বুধবার রাতে সেখানে যান প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন তালুকদারের নেতৃত্বে এভারকেয়ার হাসপাতালের ১২ সদস্যের একটি মেডিকেল বোর্ড খালেদা জিয়ার চিকিৎসার তদারক করছিলেন। চীন ও যুক্তরাজ্য থেকেও কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক গত কয়েক দিনে দেশে আসেন চিকিৎসা সহায়তা দেওয়ার জন্য।
এর মধ্যেই বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টায় এভারকেয়ার হাসপাতালে বৈঠকে বসে খালেদা জিয়ার মেডিকেল বোর্ড। যুক্তরাজ্য ও চীন থেকে আসা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাও বৈঠকে অংশ নেন।
বৈঠক শেষে বেলা ২টা ৪০ মিনিটে এভারকেয়ারের সামনে সংবাদ সম্মেলনে আসেন ডা. জাহিদ হোসেন। তিনি জানান, খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার সিদ্ধান্ত দিয়েছে মেডিকেল বোর্ড।
আগের খবর:
যে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স আসছে খালেদার জন্য
খালেদা জিয়ার অবস্থা অপরিবর্তিত, জুবাইদা ফের হাসপাতালে
রোববারের আগে খালেদা জিয়ার লন্ডনযাত্রা হচ্ছে না
জার্মানি থেকে 'ভাড়া করে' এয়ার অ্যাম্বুলেন্স পাঠাচ্ছে কাতার
নির্জন কারাবাস থেকেই খালেদা জিয়ার 'নানা রোগের সূচনা': ফখরুল