Published : 20 Apr 2026, 06:26 PM
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বারবার আশ্বাস দেওয়ার পরও দেশে কীভাবে একের পর এক ‘মব সন্ত্রাসের’ ঘটনা ঘটছে, সেই প্রশ্ন জাতীয় সংসদে তুলেছেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা।
তিনি বলেছেন, “আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আজকে উপস্থিত আছেন। উনি একবার না দুইবার না, কয়েক দফা আমাদেরকে আশ্বস্ত করেছিলেন বাংলাদেশে আর মবের কালচার হবে না। উনি আমাদেরকে আশ্বস্ত করেছিলেন বাংলাদেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি হবে না। উনি আশ্বস্ত করেছিলেন বাংলাদেশের মানুষ ন্যায়বিচার পাবে। কিন্তু আমরা দেখলাম একটির পর একটি জায়গায় মবের ঘটনা ঘটেই চলেছে।”
সোমবার জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালী বিধির ৭১ ধারায় জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের নোটিসের ওপর বক্তব্য দিতে গিয়ে এ কথা বলেন রুমিন।
ডেপুটি স্পিকারের সভাপতিত্বে বৈঠকে ৭১ ধারায় মোট ৭৫টি নোটিস জমা পড়ে। এর মধ্যে তিনটি নোটিস গ্রহণ করা হয়। বাকি নোটিসগুলোর মধ্য থেকে সময়সীমার মধ্যে কয়েকজন সদস্যকে দুই মিনিট করে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।
সেই ধারাবাহিকতায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২ আসনের সদস্য রুমিন ফারহানা ‘মবের সংস্কৃতি’ নিয়ে বক্তব্য দেন।
তিনি বলেন, “বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানান রকম সংস্কৃতি থাকে, নাচের সংস্কৃতি, গানের সংস্কৃতি, অভিনয় সংস্কৃতি, কবিতার সংস্কৃতি। আমাদের দেশে গত দেড় বছর এবং এরপরে গত দুই মাস ধরে আমরা মবের সংস্কৃতি দেখলাম।”
রুমিন ফারহানা একের পর এক ঘটনার উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, “আমরা দেখলাম বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে মব করে সরানো হয়েছে। আমরা দেখলাম বাসসের প্রধানকে মব করা হয়েছে। বরিশাল আদালতের প্রাঙ্গণে মব হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট ল’ইয়ারস রুমে মব হয়েছে। ডেইলি স্টার প্রথম আলো ভাঙা হয়েছে।
“চট্টগ্রামে দেড় বছর আগে নেচে গেয়ে নাচ এবং গানের মত তৈরি করে ছিনতাইকারী সন্দেহে পিটিয়ে মারা হয়েছে। কুষ্টিয়ায় একজন কথিত পীরকে পিটিয়ে মারা হয়েছে কিছুদিন আগে।”
স্বতন্ত্র এই সংসদ সদস্যের ভাষ্য, ‘ন্যায়বিচারের অভাব, ক্ষোভ, হতাশা ও বৈষম্য থেকে’ এ ধরনের প্রবণতা বাড়ছে।
“মানুষ যখন ন্যায়বিচার পায় না তখনই এইরকম সংস্কৃতির বাড়ে এবং মানুষ এই ধরনের সংস্কৃতিতে জড়িয়ে যায়। মানুষের মধ্যে হতাশা আছে, মানুষের মধ্যে ক্ষোভ আছে, মানুষের মধ্যে তীব্র বৈষম্য আছে এবং সর্বোপরি আছে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব।”
চট্টগ্রামের একটি ঘটনার বিচার না হওয়ার প্রসঙ্গ টেনে রুমিন ফারহানা বলেন, “গত দেড় বছর আগে চট্টগ্রামে মব করে যেই লোকটিকে পিটিয়ে মারা হয়েছিল, তার বিচার এখন পর্যন্ত হয়নি।”
তার বক্তব্যের সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অধিবেশন কক্ষে উপস্থিত ছিলেন।
নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানালেন হান্নান মাসউদ
এর আগে প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ হলে নোয়াখালী ৬ আসনের জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদের বিশেষ অধিকার ক্ষুণ্নের প্রশ্নে দেওয়া নোটিস নিয়ে আলোচনা হয়।
ডেপুটি স্পিকার সংসদে জানান, প্রায় একই বিষয়ে দেওয়া তার দুটি নোটিসে বলা হয়েছে, ২৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনপূর্ব ও পরবর্তী সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে দেখতে গেলে তার গাড়িবহরে ‘হত্যার উদ্দেশ্যে সন্ত্রাসী হামলা’ চালানো হয়। ২৯ মার্চ সংসদে বক্তব্যের পর তার বিরুদ্ধে ‘অত্যন্ত অশালীন, মানহানিকর, নিন্দনীয়’ স্লোগান দেওয়া হয় এবং অনলাইনে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।
এ পর্যায়ে দাঁড়িয়ে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন হান্নান মাসউদ। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে ও পরে একাধিকবার তিনি হামলার শিকার হয়েছেন, এখনও নিজ এলাকায় নিরাপদে যাতায়াত করতে পারছেন না।
তার ভাষায়, “আমি তো আমার যেই এলাকা যেখান থেকে আমি নির্বাচন করছি সেই এলাকায় আমাকে নিরাপদে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে, নিরাপদে আমাকে থাকার ব্যবস্থা করতে হবে, আমার সাথে যারা নেতাকর্মীরা চলা তাদের নিরাপত্তা দিতে হবে।”
তিনি বলেন, তার কাছে হামলা ও হত্যার হুমকির ভিডিও, নথি ও অন্যান্য প্রমাণ আছে। এসব ঘটনায় জড়িতরা ‘রাজনৈতিক আশ্রয়ে থেকে’ এখনও এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
পরে ডেপুটি স্পিকার বলেন, বিষয়টি “অত্যন্ত দুঃখজনক” হলেও তা কার্যপ্রণালী বিধির ১৬৫(২) ও ১৬৫(৪) অনুযায়ী বিশেষ অধিকার প্রশ্ন হিসেবে গ্রহণ করা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, কারা হুমকি দিয়েছে, নোটিসে তা স্পষ্ট নয়। পাশাপাশি বিষয়টি সাম্প্রতিক কোনো নির্দিষ্ট একক ঘটনার মধ্যেও সীমাবদ্ধ নয়।
তবে হান্নান মাসউদের অভিযোগের বিষয়ে কার্যকর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে অধিবেশনে উপস্থিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অনুরোধ জানান ডেপুটি স্পিকার।
পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অভিযোগ সত্য হলে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, “মাননীয় সংসদ সদস্য যদি কোনো জিডি অথবা মামলা সংশ্লিষ্ট থানায় না করে থাকেন, এখনো তিনি ইচ্ছা করলে সে বিষয়ে উনার অভিযোগ সংশ্লিষ্ট থানায় দায়ের করতে পারেন এবং সে বিষয়ে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শুধু হান্নান মাসউদের ক্ষেত্রেই নয়, যে কোনো সংসদ সদস্য এ ধরনের পরিস্থিতির শিকার হলে তাৎক্ষণিকভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা নিকটস্থ থানাকে জানানো উচিত।
তার ভাষায়, “সরকার দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর।”