‘গায়েবি’ মামলায় সাজাপ্রাপ্তদের মুক্তি চেয়ে প্রধান বিচারপতিকে স্মারকলিপি

“আজকে আমরা বিএনপি করি বলে আমার পরিবারের ওপর ঝড় নেমে এসেছে। আমার প্রশ্ন, বিএনপি করা কি অপরাধ?”

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 28 Nov 2023, 01:58 PM
Updated : 28 Nov 2023, 01:58 PM

‘গায়েবি’ মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ও গ্রেপ্তার নেতাকর্মীদের মুক্তি চেয়ে তাদের স্বজনদের পক্ষ থেকে প্রধান বিচারপতিকে স্মারকলিপি পাঠিয়েছেন বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাস।

পেশাজীবী পরিষদের সদস্য সচিব কাদের গণি চৌধুরী জানিয়েছেন, মঙ্গলবার দুপুরে আফরোজা আব্বাসের নেতৃত্বে কারাবন্দিদের স্বজনরা প্রধান বিচারপতির কাছে স্মারকলিপি দিতে যাওয়ার পথে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে পুলিশি বাধার মুখে পড়েন। পরে কুরিয়ারের মাধ্যমে স্মারকলিপি পাঠানো হয় প্রধান বিচারপতির কাছে।

দুই পৃষ্ঠার স্মারকলিপিতে বলা হয়, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ‘এক অসহনীয় পরিস্থিতিতে’ কারাবন্দি বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের পরিবারের সদস্যরা বিচার প্রার্থীদের শেষ আশ্রয়স্থল সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির দ্বারস্থ হতে ‘বাধ্য হয়েছেন’।

সেখানে বলা হয়, ‘‘আমাদের বিশ্বাস, বিচার বিভাগের অভিভাবক হিসেবে দেশের বিচার বিভাগকে রক্ষা করা, স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় আপনি (প্রধান বিচারপতি) অগ্রণী ভূমিকা রাখবেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে বিরোধী নেতাকর্মীদের উপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চলমান দমন-পীড়ন, মিথ্যা, গায়েবি হয়রানিমূলক মামলায় গণগ্রেপ্তার, পুলিশ রিমান্ডে নির্যাতন, ঢালাও সাজা প্রদান, জামিন প্রদানে না করার বিষয়ে আপনার উদ্যোগী ভূমিকা প্রত্যাশা করছি।

“আমাদের অনুরোধ থাকবে, গণগ্রেপ্তারকৃত বিএনপি ও বিরোধী মতালম্বী রাজনৈতিক বন্দিদের আশু মুক্তির জন্য আপনি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ ও আদালতসমূহের প্রতি প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করবেন।”

এর আগে সকাল সাড়ে ১০টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিএনপির আটক নেতাকর্মীদের স্বজনরা মানববন্ধনে সমবেত হন।

স্বজনদের কণ্ঠে বেদনার কথা

গত ২৮ অক্টোবর ঢাকায় সংঘর্ষের পর বিএনপির সমাবেশ ভণ্ডুল হয়। এরপর প্রতিদিনই দলটির নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করে আসছেন দলটির জ্যেষ্ঠ মহাসচিব রুহুর কবির রিজভী।

এর মধ্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসও গ্রেপ্তার হয়েছেন। তার স্ত্রী আফরোজা আব্বাস অসুস্থ অবস্থায় হুইল চেয়ারে করে মঙ্গলবারের কর্মসূচিতে আসেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেন, “ওরা এতো নির্মম, ওরা অত্যাচারী। ছোট ছেলেকে না পেলে বড় ভাইকে ধরে নিয়ে যায়, বড় ছেলেকে না পেলে বাবাকে নিয়ে যায়, বাবাকে না পেলে বোনকে নিয়ে যায়… আমরা এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশের মধ্যে বসবাস করছি; এটা কেমন দেশ!

“এখানে এসেছেন এক কারবন্দি নেতার স্ত্রী তার দুজন শিশুকে নিয়ে। ওই শিশুদের বাবাকে পুলিশ কারাগারে নিয়ে গেছে। তারা আজকে প্রতিবাদ করার ভাষা ভুলে গেছে, প্রতিবাদ করলে দেখা যায় তাকেও ধরে নিয়ে যায় বাসা থেকে।”

আফরোজা আব্বাস বলেন, “ আমার বাসায় কীভাবে হামলা হয়েছে, আমার বাসার লোকজনকে তুলে নিয়ে যায়, মারধর করে… এটা কোন দেশে আমরা বসবাস করছি? আমরা আইনের ন্যূনতম সুবিধাটুকু পর্যন্ত পাচ্ছি না।”

তিনি গ্রেপ্তার বিএনপি নেতাকর্মীদের মুক্তি দাবি করেন, যাদের মধ্যে আছেন- দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, ভাইস চেয়ারম্যান শাহজাহান ওমর, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, মোহাম্মদ শাহজাহান, শামসুজ্জামান দুদু, আবদুস সালাম পিন্টু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আতাউর রহমান ঢালী, হাবিবুর রহমান হাবিব, লুৎফুজ্জামান বাবর, যুগ্ম মহাসচিব মজিবুর রহমান সারওয়ার, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, খায়রুল কবির খোকন, আসলাম চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, বিলকিস জাহান শিরিন, সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, বাণিজ্য বিষয় সম্পাদক সালাউদ্দিন আহমেদ, কেন্দ্রীয় নেতা জহির উদ্দিন স্বপন, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, হাবিবুল ইসলাম হাবিব, শরিফুল আলম, রফিকুল ইসলাম বাচ্চু, শামীমুর রহমান শামীম, শেখ রবিউল আলম, রফিকুল ইসলাম মজনু, আমিনুল হক, ইউনুস মৃধা, সাইফুল আলম নিরব, মুনায়েম মুন্না, আবুল কালাম আজাদ, এস এম জাহাঙ্গীর, আকরামুল হাসান, আজিজুল রহমান মোসাব্বির, আনিসুর রহমান লাকুসহ জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) আহসান হাবিব লিংকন, জাতীয় দলের সভাপতি সৈয়দ এহসানুল হুদা।

কারাবন্দি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুলের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম অসুস্থ থাকায় তার লেখা চিঠি মানববন্ধনে পড়ে শোনান মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শাহজাহানের স্ত্রী রহিমা শাহজাহান মায়া বলেন, ‘‘আমার স্বামীকে সম্পূর্ণ বিনা দোষে বিনা অপরাধে দুই বছরের সাজা দিয়ে জেলে আটক রাখা হয়েছে। এরকম অনেক বিএনপিসহ বিরোধী নেতাকর্মী, ভিন্নমতের মানুষকে কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশকে একটা কারাগারে পরিণত করা হয়েছে। এর অবসান আমি চাই।”

স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আবুল কালাম কালামের শিশুপুত্র ফুয়াদ কাঁদতে কাঁদতে বলে, “আমার বাবাকে ছেড়ে দেন, প্লিজ আমার বাবাকে ছেড়ে দেন।”

কারাবন্দি দুই ছেলের (আবদুর রহিম ভুঁইয়া, আবদুর রহমান ভুঁইয়া) বাবা আবদুল হাই ভুঁইয়া বলেন, “আমি একটি নির্যাতিত পরিবারের অভিভাবক। আমি বিএনপি করি। এটাই আমার অপরাধ। আমার ছেলেরা বিএনপির অঙ্গসংগঠন করে।

“আমার বড় ছেলেকে না পেয়ে তার স্ত্রীকে ধরে নিয়ে গেছে। আজকে আমরা বিএনপি করি বলে আমার পরিবারের ওপর এই ঝড় নেমে এসেছে। আমার প্রশ্ন বিএনপি করা কি অপরাধ?”

যুবদলের সাবেক নেতা এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের স্ত্রী বলেন, “আমার স্বামীকে মিথ্যা মামলায় অন্যায়ভাবে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে; এটা কোন ধরনের জুলুম? যেখান পুলিশ মামলার বাদী, পুলিশ মামলার সাক্ষী দেয়। আমাদেরকে কিছুই বলতে দেয় না।

“আমাদের উকিলরা যখন কথা বলতে যায়, তখন ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব বলেন, এখানে আইনের কথা বলবেন না। তাহলে আমরা কোথায় যাব, কোথায় বিচার পাব? আমরা আজকে মজলুম পরিবার।”

কারাবন্দি নেতাদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন হাবিবুর রহমান হাবিবের স্ত্রী শাহানারা মায়া, খায়রুল কবির খোকনের স্ত্রী শিরিন সুলতানা, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর মেয়ে তাসমিনা তাব্বাসুম রাফি, সাবেক সংসদ সদস্য হাবিবুল ইসলাম হাবিবের স্ত্রী শাহানা ইসলাম, মির্জা আব্বাসের ছোট বোন সাহিদা মির্জা, এস এম জাহাঙ্গীরের স্ত্রী রাজিয়া জাহাঙ্গীর, ইদ্রিস আলীর স্ত্রী শিউলি বেগম, ছাত্রদলের আমানউল্লাহ আমানের মেয়ে মর্জিয়া আখন্দ, নেসার উদ্দিন রাব্বীর স্ত্রী মীরু, কাউসার হোসেনের স্ত্রী মিনু আখতার, পিরোজপুরের কাজী ওয়াদিদুজ্জামান বাবলুর স্ত্রী তামান্না জাহান ।

‘এই পরিস্থিতির অবসান করতেই হবে’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, ‘‘এখানে আপনারা দেখেছেন অনেক মা, অনেক বাবা আজকে কাঁদছে… তাদের স্বজনরা আজ কেউ কারাগারে, কেউ গুম হয়ে গেছে, কেউ খুন হয়ে গেছে … কিন্তু এই সরকারের হৃদয়ে তাদের কান্না শব্দ নাড়া দেয় না। ওরা অবৈধ ক্ষমতাকে শুধুমাত্র টিকিয়ে রাখতে মরিয়া হয়ে বিরোধীদলের নেতা-কর্মীদের সমানে কারাগারে ঢোকাচ্ছে।

“এই পরিস্থিতির আমরা অবসান চাই। এই অবস্থার অবসানে আসুন এই সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আমরা রাজপথে নামি, প্রতিবাদ জানাই।”

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, “এই স্বজনরা আছেন তাদের বুকের কান্না আপনারা শুনেছেন। আপনারা সবাই জানেন, গ্রেপ্তার করবার জন্য গিয়ে তাকে না পেয়ে যাকে-তাকে গ্রেপ্তার করছে, ভাইকে গ্রেপ্তার করছে… একেবারে হৃদয়হীন একটা সরকার।  এরা মানুষের কষ্টে আনন্দ পায়।”

বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, “রাজবন্দিদের স্বজনদের এই অনুষ্ঠানে মা-বোন-বাবার কথা শুনে কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে চোখে পানি খুবই রাখা কঠিন। গত দুই মাস ধরে ইসরায়েলের আক্রমণে গাজায় যে রকম মানবিক বিপর্যয় চলছে, গত অনেকগুলো বছর ধরে ২৮ অক্টোবরের পরে এখানে মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে।”

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘‘মাননীয় প্রধান বিচারপতি, আমরা পরিষ্কার করে এই নিবেদন আপনার কাছে রাখতে চাই, গত ২৮ অক্টোবর যে সমাবেশগুলো ছিল- তার মধ্যে বিএনপির মহাসমাবেশে আমরা মনে করি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে কতিপয় এজেন্টদেরকে দিয়ে সেখানে পরিকল্পিত সহিংসতা তৈরি করা হয়েছে।  সেই সহিংসতাকে ব্যবহার করে সরকার সমস্ত দোষ বিরোধী দলের ওপর দিয়ে তারা নির্বিচারে একটা সর্বাত্মক দমনপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে।

“বিএনপির মহাসচিব থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাদেরকে শত শত মামলা দিয়ে আজকে পর্যন্ত প্রায় ১৯/২০ হাজার লোককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ কাস্টিডিতে তাদের ওপর অত্যাচার করা হচ্ছে। তাদের জামিন দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি গণতন্ত্র মঞ্চের নেতাদেরও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। মিথ্যা মামলা সাজানো হচ্ছে।”

আফরোজা আব্বাসের সভাপতিত্বে ও পেশাজীবী পরিষদের সদস্য সচিব কাদের গণি চৌধুরীর সঞ্চালনায় এ মানববন্ধনে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য দেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের হাসনাত কাইয়ুম, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন, গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর, গণতান্ত্রিক বাম ঐক্যের আবুল কালাম আজাদ, ১২ দলীয় জোটের শাহাদাত হোসেন সেলিম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আ ফ ম ইউসুফ হায়দার, অধ্যাপক লুতফুর রহমান, অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শামসুল আলম, ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের রিয়াজুল ইসলাম রিজু, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের ডা. পারভেজ রেজা কানন, ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের রুহুল আমিন গাজী, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের আবদুল হাই শিকদার, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সৈয়দ আবদাল আহমেদ, জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক জোটের রফিকুল ইসলাম।