Published : 26 Apr 2026, 08:45 PM
সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান জুলাই আন্দোলনের ১৪০০ শহীদের মধ্যে ১২০০ জনের বাড়িতে যাওয়ার কথা কীভাবে বলছেন, সেই প্রশ্ন তুলেছেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও সেতু বিভাগের প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান।
রোববার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, “জুলাই আন্দোলন নিয়ে কথা হয়েছে এখানে। অন্ততপক্ষে তিনজন সংসদ সদস্য বক্তব্য দিয়েছেন, রেকর্ড আছে আপনার কাছে। একজন বলেছেন ৮৪৪ জন শহীদ হয়েছেন। একজন বলেছেন এক হাজারের উপরে শহীদ হয়েছেন। একজন বলেছেন ১৪০০ শহীদ হয়েছেন।”
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যের ভিত্তিতে প্রথমে ‘১৪০০ জনের বেশি’ শহীদের কথা বলা হয়েছিল জানিয়ে রাজিব বলেন, “জাতিসংঘের সংস্থাও এটা বলার চেষ্টা করেছে। পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় একটি গেজেট প্রকাশ করেছে। সেই গেজেটে অতীতের গেজেট বাতিল করে ৮৪৪ জনের একটি চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করেছে।”
বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানকে উদ্দেশ করে বিএনপির সংসদ সদস্য রাজিব আহসান বলেন, “আমার মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা, আমি তাকে খুবই পছন্দ করি। খুব সুন্দর কথা বলেন। আদবের সঙ্গে কথা বলেন। তার অঙ্গভঙ্গি, ভাষা ব্যবহারের যে বিষয়টি, সেটি অনুকরণ করার মত। আমার সঙ্গে যতদিন দেখা হয়েছে লবিতে, আমি তাকে সালাম দিয়েছি। আমাকে হয়তোবা তিনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না। কিন্তু আমি তাকে খুবই পছন্দ করি।”
এরপর তিনি বলেন, “কিন্তু গত ১৪ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে একটি অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, আমি তাকে দোষারোপ করছি না। আমি জানার জন্য মাননীয় স্পিকার আপনার মাধ্যমে…।
“তিনি বলেছেন প্রোগ্রামটিতে, আমি পত্রিকার রিপোর্ট দেখে বলছি, আমি দেখাতে পারব, ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ‘১৪০০ শহীদের মধ্যে ১২০০ শহীদের বাড়িতে যাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে’।”
এরপর রাজিব বলেন, “এখন মাননীয় স্পিকার, সরকারি গেজেট ৮৪৪ জনের। তিনি ১৪০০-এর মধ্যে ১২০০ জনের বাসায় কীভাবে গেলেন, এটা তো আমি বুঝতে পারছি না। এখন সংখ্যাটা আমরা জানতে চাই। তিনি যদি গিয়ে থাকেন, কোনো আপত্তি নেই, আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু আমরা প্রকৃত সংখ্যাটা জানতে চাই।”
জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে ভবিষ্যতে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার আশঙ্কার কথাও বলেন প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “আজকে জুলাই আন্দোলন হয়েছে। এক বছর, দুই বছর হয়নি। এখনই স্মৃতির বিস্মৃতিতে অনেক কিছু হারিয়ে যদি যায়, ১০ বছর, ২০ বছর পরে এই ইতিহাস বিকৃতি কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে?”
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে ‘ব্যবসা’ হয়েছে মন্তব্য করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আমরা চাই না এই প্রজন্মের যারা আছি, এই জুলাইকে কেন্দ্র করে নতুন করে ব্যবসা শুরু হবে। এই ব্যবসা বন্ধ করার জন্য প্রকৃত ইতিহাস, কতজন শহীদ হয়েছেন, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় আমরা জানতে চাই।”
শফিকুর রহমানের আরেক বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে রাজিব বলেন, “তিনি আরেকটি কথা বলেছেন, আমার মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা, শহীদরা সবাই শিক্ষিত ছাত্র বা রাজনীতিবিদ নন, তারা খেটে খাওয়া মানুষ, সাধারণ মানুষ। ভালো কথা। কিন্তু এই শহীদদের একটি বড় অংশ, আমরা সবার অবদানকে স্বীকার করি, কিন্তু এই শহীদদের বড় অংশ তো রাজনীতিবিদদের আহ্বানে এখানে শরিক হয়েছেন, এই নেতৃত্বের অধীনে এই সংগ্রামে যারা শরিক হয়েছেন, তাদের অস্তিত্বকে যদি আপনারা অস্বীকার করেন, তাহলে শহীদদের উপরে এবং যারা আহত হয়েছেন তাদের উপরে আমার মনে হয় একটু অবিচার হয়ে যাবে।”
বাকস্বাধীনতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রসঙ্গ তুলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “বাকস্বাধীনতা কিংবা মত প্রকাশের স্বাধীনতা সবার আছে। এটার জন্যই তো আমরা লড়াই করেছিলাম। জীবন দিয়েছিলাম। সৌভাগ্যক্রমে গত ১৭ বছর প্রত্যেকটি লড়াইয়ের অগ্রসৈনিক হিসেবে আমরা কিন্তু ছিলাম, মাননীয় স্পিকার।”
বিরোধী দলের টেবিলে বসা অনেকের সঙ্গে কারাগারে থাকার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আজকে বিরোধী দলের টেবিলে যারা বসে আছেন, এখানে সাধারণ সম্পাদক সাহেব নেই। অনেকের সঙ্গেই এক বিছানায় ঘুমানোর সৌভাগ্য হয়েছে জেলখানায়।
“আমরা বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাস করি। আপনি সরকারের সমালোচনা করবেন, সরকার ভুল করলে বলবেন, সমালোচনা করবেন, কার্টুন করবেন। কিন্তু আমার নেত্রী মারা গেছেন, তাকে উদ্দেশ করে যদি আপনাদের কর্মীরা কোনো অশালীন বক্তব্য দেয়, আবার প্রধানমন্ত্রী আছেন, তার অবশ্যই সমালোচনা করা যাবে, সেটা নিয়মের মধ্যে করেন। ব্যক্তিগতভাবে, পারিবারিকভাবে আমাদের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে যদি এইভাবে কুৎসা রটনা করা হয়, সেটি কিন্তু আমাদের জন্য দুঃখজনক।”
অশ্লীল মন্তব্যকারীদের ‘পুরস্কৃত’ করার অভিযোগ তুলে সংসদ সদস্য রাজিব বলেন, “যারা কুৎসা রটনা করেছেন, আমরা তো দেখলাম আপনারা তাদেরকে পুরস্কৃত করেছেন। আপনারা পুরস্কৃত করেছেন। যিনি অশ্লীল মন্তব্য করেছেন, তার পরিবারের সদস্যকে আপনারা সংসদ সদস্য করেছেন। কী প্রমাণ করতে চান আপনারা? কী দেখাতে চান আপনারা?”
তিনি বলেন, “আমরা এখনও বলব, একসঙ্গে কাজ করতে চাই। আপনাদের সঙ্গে কাজ করতে চাই। যে স্বপ্ন নিয়ে চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থান হয়েছে, সেই অভ্যুত্থানের চেতনাকে বুকে ধারণ করে আপনাদের সঙ্গে সরকারি দল এবং বিরোধী দল একসঙ্গে কাজ করতে চাই।”
প্রথমবারের মতো সংসদে বক্তব্য দিতে দাঁড়িয়ে রাজিব আহসান এদিন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের শহীদ এবং জুলাই আন্দোলনের শহীদ, আহত ও অংশগ্রহণকারীদের স্মরণ করেন। নিজের নির্বাচনী এলাকা বরিশাল চাঁদ, মেহেন্দীগঞ্জ, হিজলা ও কাজিরহাটের ভোটারদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান।
তিনি বলেন, প্রথম দিকে ঠিক থাকলেও কয়েকদিন ধরে বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে ‘অস্থিরতা’ লক্ষ্য করছেন তিনি।
“আমি খোঁজার চেষ্টা করেছি, কী কারণে অস্থিরতা। আমি একটি জিনিস খুঁজে পেয়েছি। অস্থিরতার কারণটি হল, ওয়ান ইলেভেনে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল, সেই সরকারটি সবাই জানেন, সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বলা হত। আর গত ১৮ মাস যে সরকারটি ছিল, সেই সরকারটিকে কিন্তু আজকে আমাদের যারা বিরোধীদলীয় নেতৃবৃন্দ আছেন, সেই জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি সমর্থিত সরকার হিসেবে সবাই অভিহিত করেছে।”
এ সময় বিরোধী দলের দিক থেকে আপত্তি উঠলে স্পিকারের কাছে ‘প্রটেকশন’ চান রাজিব।
তিনি বলেন, “আজকে, মাননীয় স্পিকার, আমি আপনার প্রটেকশন চাচ্ছি। আজকে কথা বলতে দিতে হবে, মাননীয় স্পিকার, কথা বলতে দিতে হবে।”
এরপর তিনি বলেন, “মাননীয় স্পিকার, গত ১৮ মাস যে আরামে ছিলেন, সে আরাম এখন হচ্ছে না। এই কারণে অনেক সমস্যা হয়ে যাচ্ছে, মাননীয় স্পিকার। কারণ আমি প্রমাণ দিয়ে দেখাতে পারব।”
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একজন নেতার বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “সে একজনের সঙ্গে গল্প করছে, বলছে, যেইভাবে আমরা কাটিয়েছি, মন চেয়েছে প্রধান উপদেষ্টার বাসায় ঢুকে গিয়েছি, মন চেয়েছে তার বেডরুমে ঢুকে গিয়েছি, মন চেয়েছে সচিবের রুমে ঢুকে গিয়েছি। এখন তো আর সে সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না, মাননীয় স্পিকার। সমস্যাটা এইজন্যই।”
শফিকুরের জবাব
মাগরিবের নামাজের বিরতির পর অধিবেশনে দাঁড়িয়ে প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাব দেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। এ সময় অধিবেশন পরিচালনা করছিলেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
শফিকুর বলেন, “আমাকে কোট করে একটা কথা বলেছেন। বিষয়টি জুলাই শহীদদের সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি বলেছেন, শহীদদের সংখ্যা যদি ৮০০ প্লাস হয়, তাহলে আমি ১২০০ বাড়িতে গেলাম কীভাবে? ফ্যামিলিতে গেলাম কীভাবে? উনাকে আমি এখন দেখছি না। উনি থাকলে উনাকে বলতাম, সেটা মাননীয় প্রতিমন্ত্রীর কাছ থেকে বুঝে নেওয়ার জন্য।”
এরপর মৎস্য ও প্রাণীসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “সালাউদ্দিন টুকু সাহেব তার বক্তব্যে নিজেই বলেছেন, শুধু জাতীয়তাবাদী দল এবং তার অঙ্গ সংগঠনের লোকরাই শহীদ হয়েছে এক হাজারের ঊর্ধ্বে। আমি যদি তার কথাটাই সমর্থন করি, তাহলে হিসাব এখান থেকেই তিনি পাবেন। আমার কাছে কষ্ট করে আসতে হবে না।”
নিজের বক্তব্যের পক্ষে তালিকা থাকার কথা জানিয়ে শফিকুর বলেন, “দুই নম্বর, আমি আনঅথেনটিক কোনো কথা বলিনি। এই ব্যাপারে আমাদের কাছে একটা কমপ্লিট প্রোফাইল আছে। এখানে উপস্থিত অনেকে আমাদের সেই প্রোফাইল পেয়েছেন। আমাদের ওয়েবসাইটে এভেইলেবল।”
তিনি বলেন, “চেক, ক্রসচেক করে আমরা নিশ্চিত হওয়ার পরে এই তালিকাগুলো করেছি।”
জুলাই শহীদের সংখ্যা নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির তথ্যের কথাও বলেন বিরোধীদলীয় নেতা।
“এই ব্যাপারে আমার কথা নয়, এই দেশের কোনো সংস্থার উদ্ধৃতি নয়, জাতিসংঘের মানবাধিকার ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি বলেছে, এই সংখ্যা ১৪৫১, তাদের পাওয়া মত।”
বিভিন্ন এলাকায় যাওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, “বিভিন্ন জায়গায় যখন যাই, কিছু মানুষ আসেন, তারা অসহায়ের মত লোকের দিকে তাকিয়ে থাকেন। এরপর বলেন, আমার বাবাটার কোনো খবর আপনাদের কাছে আছে কিনা।”
শফিকুর বলেন, “ওই যে দুই দিন ইন্টারনেট বন্ধ করে মানুষ খুন করে গুম করা হয়েছে, তাদের হিসাব তো কেউ দিচ্ছে না। এ সংখ্যা তো আরও বেশি।”
সংসদে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “মহান জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে আমরা যখন কথা বলব, তখন আমাদের কথাগুলো, আমি আরেকদিনও অনুরোধ করেছি, যেন দায়িত্বশীল আচরণ হয়।”