Published : 08 Feb 2026, 10:39 PM
বৈষম্য দূর করে ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
রোববার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ও বাংলাদেশ বেতারে দেওয়া ভাষণে তিনি এ প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেন।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছেন দলগুলোর প্রধানরা। এদিন প্রথম ভাষণ দেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির চরমোনাই পীর সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম।
ভোটে জামায়াত জোটের শরিক এনসিপির নেতা নাহিদ বলেন, এতদিন রাষ্ট্র পরিচালনায় যারা ছিলেন তারা শুধু নিজেদের ভাগ্য বদলে নিয়েছেন। সাধারণরা বঞ্চিতই থেকে গেছেন।
“বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের পর গত ৫৫ বছরে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক বন্দোবস্ত গড়ে উঠেছে, তার মূল ভিত্তি ছিল বৈষম্য। এরই পরিণতিতে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে পুরোনো কাঠামো ভেঙে পড়েছিল। এই বৈষম্য কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি রাজনৈতিক ক্ষমতা, সামাজিক মর্যাদা, আইনের প্রয়োগ এবং সুযোগ বণ্টনের প্রতিটি স্তরে গভীরভাবে প্রোথিত।
"এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জুলাই বিপ্লব ছিল একটি গণবিদ্রোহ, যার লক্ষ্য ছিল পুরোনো বন্দোবস্ত ভেঙে ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু পুরোনো ব্যবস্থার সুবিধাভোগীরা আবারও পূর্বেকার দুর্নীতিগ্রস্ত বেইনসাফের বৈষম্যমূলক কাঠামো ফিরিয়ে আনতে পূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি নিয়ে নির্বাচনের মাঠে নেমে পড়েছে।”
চব্বিশের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এই নেতার অভিযোগ, “দীর্ঘ ১৫ বছর ফ্যাসিবাদী শাসনে খুনি হাসিনা গুম, হত্যা, বিনাবিচারে কারাবন্দি, হামলা, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা করার ক্ষেত্রে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করেছে। এতে আওয়ামী লীগ ও তার ছাত্রলীগসহ সকল অঙ্গসংগঠন, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, ডিজিএফআই, এনএসআই এমন সকল সরকারি বাহিনী ও সংস্থাকে সক্রিয়ভাবে কাজে লাগিয়েছে। তার এই অপকর্মে ব্যবহৃত হয়েছে জনপ্রশাসন, বিচার বিভাগ, সশস্ত্র বাহিনীসহ রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠান।
“আমরা স্পষ্ট ঘোষণা দিচ্ছি–বিভিন্ন বাহিনীর ভেতরে গুম, খুন, নির্যাতন, দুর্নীতি ও লুটপাটের সঙ্গে জড়িত লুকিয়ে থাকা সকল অপরাধীকে শনাক্ত করা হবে। তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে প্রকৃত দায়ীদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তি বিধান করা হবে।"
আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ম্যাজিস্ট্রেটই ক্ষমতাসহ সারাদেশে সশস্ত্র বাহিনীকে নামানো হলেও 'সুপিরিয়র কামান্ডের অনাগ্রহের' কারণে তারা কোনো কার্যকর ভূমিকা পালন করেনি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
বিটিভিতে দেওয়া ভাষণে এনসিপি আহ্বায়ক গুমবিষয়ক কমিশন ১ হাজার ৮৫০টির বেশি অভিযোগ নিয়ে কাজ করলেও 'নিরাপত্তা বাহিনীর ভেতরে লুকিয়ে থাকা ফ্যাসিবাদের দোসররা' তথ্য ও আলামত নষ্ট করে 'তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার' চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, “আমাদের লড়াই হবে সেই ‘নিপীড়নের ব্যবস্থা’ ও ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’ সমূলে উৎপাটন করা, যা আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সকল প্রবণতা সমাজ থেকে মুছে ফেলা।"
নাহিদ বলেন, "দেশবাসী যদি আমাদের সরকার গঠনের দায়িত্ব দেয়, তবে ফ্যাসিস্ট হাসিনা আমলে লুটপাট ও পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সব ধরনের আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। লুটপাট ও অর্থপাচারের সঙ্গে যুক্ত কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দায়মুক্তি দেওয়া হবে না। খুনি হাসিনার দোসর ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, তাদের সুবিধাভোগী আমলা ও আত্মীয়-স্বজনদের আইন ও বিচারের আওতায় আনা হবে।”
এনসিপির পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে তিনি বলেন, "জনগণ যদি এনসিপির ওপর আস্থা রেখে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেয়, তাহলে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য ঘাটতি এবং কারো ওপর অতি নির্ভরশীলতা ক্রমান্বয়ে কমিয়ে এনে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করা হবে। আমরা অগণতান্ত্রিক শাসকদের নতজানু নীতিকাঠামো ভেঙে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে আত্মমর্যাদাপূর্ণ ও স্বকীয় পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করব।
"এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক বাড়াতে সার্ক পুনরোজ্জিবিত করা হবে এবং আসিয়ানে যোগ দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটাব।"
প্রবাসে থাকা নাগরিকদের সমস্যা সমাধান ও দ্রুত সেবা প্রদানের লক্ষ্যে পৃথিবীর সকল প্রান্তে বাংলাদেশ মিশন স্থাপন করা এবং কূটনীতিকের সংখ্যা বাড়ানো হবে বলেও তুলে ধরেন তিনি।
এনসিপি সরকার গঠন করতে পারলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে পুনর্গঠন করার কথাও বলেন তিনি। বলেন, "দেশের সকল ১৮ ঊর্ধ্ব সক্ষম তরুণ-তরুণীর জন্য বাধ্যতামূলক মিলেটারি ট্রেনিং চালু করা হবে। এতে দেশব্যাপী জনভিত্তি সম্পন্ন এক গণপ্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। ফলে আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধ সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের বিনিয়োগকৃত অর্থের অপচয় কমবে।"
সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেলে, দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী ব্যবসায়ী, রাজনীতিক ও আমলাদের সিন্ডিকেট ভাঙার ঘোষণা দেন নাহিদ।
চাঁদাবাজি বন্ধ করে বাজারে কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার কথাও বলেন তিনি।
এনসিপি ক্ষমতায় গেলে পুলিশের নাম পরিবর্তনও করা হবে বলে তুলে ধরেন তিনি।
বিচার ব্যবস্থা রাজনীতিক প্রভাব, অর্থশক্তি ও সুবিধাবাদী চক্রের হাত থেকে মুক্ত করে ন্যায়পরায়ণ, দক্ষ ও শিক্ষিত বিচারক নিয়োগের পুরো বিচার ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর আকাঙ্খার কথা বলেন তিনি।
জনপ্রতিনিধি ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নির্বাচিত নেতাদের প্রকৃত ক্ষমতা দেওয়ার অঙ্গীকার করে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, তাদের কঠোর জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। প্রতিটি স্তরে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা হবে। যেকোনো পর্যায়ের স্থানীয় সরকারে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হতে ন্যূনতম স্নাতক-পাস যোগ্যতা বাধ্যতামূলক করা হবে।
ক্ষমতায় গেলে ইসলামের 'মৌলিক নীতি প্রতিপালন' হবে: চরমোনাই পীর