Published : 16 Oct 2025, 09:05 PM
সেবা সংস্থা বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাটইটির চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমে চাকরি খোয়ানোর পাশাপাশি দল থেকে অব্যাহতি পাওয়া এনসিপি নেতা মুনতাসির মাহমুদ দুষছেন দলের আরেক নেতা মাহবুব আলমকে।
এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের সংগঠক মুনতাসির রেড ক্রিসেন্ট সোসাটইটির যুব ও সেচ্ছাসেবক বিভাগের ডেপুটি ডিরেক্টর হিসাবে চাকরি করে আসছিলেন। ‘স্বেচ্ছাচারিতা ও আওয়ামী তোষণের’ অভিযোগ তুলে তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাটইটির চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আজিজুল ইসলামের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন।
ঢাকার মগবাজার এলাকায় রেড ক্রিসেন্টের প্রধান কার্যালয়ে রোববার দিনভর আন্দোলন চলার পর সন্ধ্যায় এনসিপি থেকে মুনতাসিরকে অব্যাহতি দেওয়ার খবর আসে। তাকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়। সেদিনই রেড ক্রিসেন্ট থেকে মুনতাসিরকে চাকরিচ্যুত করার খবর আসে।
তার অভিযোগ, তার অব্যাহতি ও চাকরি যাওয়ার পেছনে তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের ভাই এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাহবুব আলমের হাত রয়েছে।
অন্যদিকে মাহবুব বলছেন, যা কিছু হয়েছে, ‘নিয়মের ভেতর দিয়েই’ হয়েছে।
আজিজুল ইসলামকে গত মার্চে সরকার ছয় মাসের জন্য রেড ক্রিসেন্ট সোসাটইটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়। পরে তার মেয়াদ আরও তিন মাস বাড়ানো হয়।
গতবছর ৫ অগাস্ট ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর রেড ক্রিসেন্টের প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছিল। এনসিপির কারো কারো অভিযোগ, আজিজ দায়িত্বে আসার পর, আওয়ামী লীগের ‘পুরোনো চক্রকে’ ফের রেড ক্রিসেন্টের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ফিরেয়ে আনছেন।
এই অভিযোগে মুনতাসির আন্দোলন শুরু করলেও আরেক নেতা মাহবুব আলম মন্ত্রণালয়ে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সুরাহা করতে চেয়েছিলেন।
এনসিপির বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির চেয়ারম্যানের ভূমিকা নিয়ে দলের নেতারা ‘ক্ষুব্ধ’ ছিলেন। তবে তার অপসারণের দাবিতে আন্দোলনে না গিয়ে দাপ্তরিক পর্যায়ে যোগাযোগ করার পরামর্শ ছিল অনেকের।
চেয়ারম্যানের সমস্যা কী?
ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. আজিজুল ইসলাম সেনা বাহিনীতে কনসালট্যান্ট ফিজিশিয়ান জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে অবসরে গিয়েছিলেন।
তার বিরুদ্ধে আন্দোলনের কারণ ব্যাখ্যা করে মুনতাসির বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “উনাকে আমরা বলেছিলাম আপনি আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন কইরেন না। আগে থেকে যারা আছে তাদেরকে সরাতে বলি নাই। কিন্তু নতুন করে কাউকে প্রমোট না করতে অনুরোধ করেছিলাম।
“কিন্তু উনি আওয়ামী লীগের লোকজনকে প্রমোশন দিয়ে ডিরেক্টর বানানো শুরু করেছেন। যারা বিএনপিপন্থি ছিল, জুলাই আন্দোলনের পক্ষে ছিল, তাদের মাইনাস করেছেন।
“যৌন হয়রানীর স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে এমন লোককে ঢাকার বাইরে থেকে ঢাকায় নিয়ে এসেছেন। বঙ্গবন্ধু পরিষদের নেতা রেজাউলকে এই চেয়ারম্যান ডেপুটি ডিরেক্টর থেকে ডিরেক্টর বানিয়েছে।”
মাহবুব আলম নিজেও রেড ক্রিসেন্টের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হিসাবে রয়েছেন। এনসিপির আরেক সংগঠক মাহমুদা মিতু রয়েছেন পরিচালনা পর্ষদে।
মাহমুদা মিতু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আন্দোলন হচ্ছে রেড ক্রিসেন্টের আওয়ামী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। চেয়ারম্যান রহস্যজনক কারণে আওয়ামী সিন্ডিকেটের লোকদের পদন্নোতি দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসাচ্ছেন। এ বিষয়ে তার সঙ্গে কথা বলতে গেলেও তেমন পাত্তা পাওয়া যাচ্ছিল না।
“বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি সেখানে বেশ শক্ত অবস্থান নিয়েই আছেন। আমি পর্ষদে যাওয়ার পর আমাকেও বেশ নাকানি-চুবানি খাওয়ানোর চেষ্টা করেছিল তারা। চেয়ারম্যান ওদের কথা শুনেই সব সিদ্ধান্ত নেন। ব্যাপারটা আমাদের কাছে অদ্ভুত লেগেছে।”
উদাহরণ টেনে মিতু বলেন, “গত সপ্তাহের আগের সপ্তাহে মহাসচিব তিন দিনের জন্য আমেরিকায় গিয়েছিলেন। সাহানা নামের আওয়ামী সিন্ডিকেটের এক সদস্যকে মহাসচিবের দায়িত্ব দিয়ে যান। ওই নারী প্রথম ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ৪০ জনকে ঢাকার বাইরে থেকে বদলি করে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নিয়ে আসেন।
“আমরা বিষয়টি চেয়ারম্যানকে বলতে গেলে তিনি বলেন, ‘তোমরা কি মনে করো আমার অনুমোদন ছাড়া এটা হয়েছে?’ তার উত্তর শুনে আমি অবাক হয়ে গেলাম। যৌন হয়রানির অভিযোগে একজন অফিসারকে ডিমোশন দেওয়া হয়েছিল এবং ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছিল, সাহানা তাকেও ঢাকায় নিয়ে আসেন।”
মিতু বলেন, “উনাকে (চেয়াম্যান) দুর্নীতি করতে দেখি নাই। কিন্তু আওয়ামী সিন্ডিকেটের পৃষ্ঠপোষকতাই করেন। দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের পৃষ্ঠপোষকতাই করেন। কেন করেন সেটা বলতে পারছি না। আমরা বলেছি যদি অ্যাকশন নিতে চান, লিগাল প্রসিডিউর মেনে চলুন। চেয়ারম্যান মুনতাসিরের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নিলেন, কিন্তু সাহানা বা রেজাউলের বিরুদ্ধে কিছু বললেন না।”
মুনতাসিরের অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করলে এনসিপি নেতা মাহবুব বলেন, “চেয়াম্যানের অনিয়ম নিয়ে আমরা মন্ত্রণালয় ও লিগ্যাল পজিশনগুলোতে আলাপ আলোচনা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এর মধ্যে মুনতাসির কী কারণে আন্দোলন শুরু করল তা আমার বোধগম্য নয়। দলের পক্ষ থেকেও এই ধরনের আন্দোলনে নিষেধ ছিল।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগে ২০১৫-২০১৬ সেশনে ভর্তি হয়ে পড়াশোন শেষ করেন মাহবুব আলম। পরে উচ্চ শিক্ষার জন্য অস্ট্রেলিয়ায় যান। ২০২৪ সালের অগাস্টে গণঅভ্যুত্থানের পর ওই বছর নভেম্বরে দেশে ফিরে আসেন মাহবুব। জাতীয় নাগরিক কমিটি হয়ে যোগ দেন এনসিপিতে।
মুনতাসিরকে দল থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পর একদল এনসিপি কর্মী সামাজিক মাধ্যমে মাহবুবের সমালোচনায় মুখর হন। মুনতাসির নিজেও মাহবুবের সঙ্গে তর্কে জড়ান এবং তার চাকরিচ্যুতির পেছনে ‘মাহবুকের ভূমিকার কথা’ বলেন। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই বিতর্কে অংশ নেন এনসিপির নেতাকর্মীরা।
গত রোববার আন্দোলন চলার সময় মুনতাসির সাংবাদিকদের বলেন, “মাহবুব আমাকে হুমকি দিয়ে বলেন, ‘আমি উপদেষ্টা মাহফুজের ভাই। তুই মুনতাসির কে? আমি বলছি এই চেয়ারম্যান এখানে থাকবে। মাহবুব আমাকে হুমকি দিয়েছে- তুই কীভাবে চাকরি করস আমি দেখে নেব।’ চেয়ারম্যানের রুমে গিয়ে সে ওসিকে বলেছে, ‘আমি উপদেষ্টা মাহফুজের ভাই মাহবুব। এই মুহূর্তে মুনতাসিরকে গ্রেপ্তার করতে হবে’।”
ফজলে রাব্বি নামের একজন ফেইসবুকে লিখেছেন, “মাহফুজ এর বড় ভাই মাহবুব। জুলাই আন্দোলনে যার কোনো ধরনের ইনভলভমেন্ট নাই। ছিল দেশের বাইরে। মাহফুজ উপদেষ্টা হওয়ার পর দেশে এসেই এনসিপির বড় পদ বাগিয়ে নেয়। এলাকায় তার বাবা করে বিএনপি।”
এবিষয়ে মাহমুদা মিতু বলেন, “মুনতাসিরকে আন্দোলন করতে আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও নিষেধ করেছিলেন। শৃঙ্খলা কমিটি থেকে বার বার আন্দোলন থামাতে বলা হয়েছিল। কিন্তু আন্দোলন যে পর্যায়ে ছিল, সেটা হুট করে বন্ধ করার মত ছিল না। এটা নিয়ে মুনতাসির ও মাহবুবের মধ্যে তখন ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল।”
মাহবুব বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমার দিক থেকে কোনো কারণ নেই। উনি (মুনতাসির) কি কারণে আন্দোলন আয়োজন করেছেন? পার্টির অনুমতি ছাড়া এমনটি করায় অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। রেড ক্রিসেন্টের কোড অব কন্ডাক্ট ভায়োলেট করেছেন বিধায় তার চাকরি গেছে।”
আর রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির চেয়ারম্যান আজিজ অভিযোগের বিষয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে ঢাকার বাইরে বদলি করেছিলাম। খুব সম্ভবত তারা মুনতাসিরকে টাকা-পয়সা দিয়ে উত্তেজিত করেছে। যে বিষয়গুলো মুনতাসিরের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না, সেসব বিষয়েও সে নাক গলায়। এতে অনেক কর্মকর্তাই তার উপর ক্ষুব্ধ।"
আওয়ামী লীগের লোকজনের ‘পৃষ্ঠপোষকতা’ করার অভিযোগের বিষয়ে চেয়ারম্যান বলেন, "আমি নিজেই জুলাই আন্দোলনের পক্ষের একজন লোক। অতীতে যারা নিয়োগ পেয়েছে সবাই আওয়ামী লীগের বিশ্বস্ত লোক ছিল। এখন সবাইকে বাদ করে দিয়ে তো আমি প্রতিষ্ঠান চালাতে পারব না।"