Published : 24 Sep 2025, 04:27 PM
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে দায়ের করা ‘প্লট দুর্নীতির’ ছয় মামলার রায় ‘অক্টোবর-নভেম্বরের মধ্যে’ ঘোষণা হতে পারে বলে আশা করছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান আবদুল মোমেন।
তিনি বলেছেন, হাই কোর্টের আদেশে স্থগিত থাকা টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে মামলাও সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
দুর্নীতি প্রতিরোধে টিআইবির সঙ্গে পাঁচ বছরের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর শেষে বুধবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে এ বিষয়ে কথা বলেন দুদক চেয়ারম্যান।
তিনি বলেন, ''সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং তার পরিবারের বিরুদ্ধে মোট ছয়টি মামলা বর্তমানে চলমান রয়েছে। আমরা আশা করছি যে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হওয়ার পর অক্টোবরের শেষ দিকে কিংবা নভেম্বরের প্রথম দিকে আদালত যেটা বিবেচনাযোগ্য মনে করবেন, সেই অনুযায়ী রায় ঘোষণা করবেন।''
টিউলিপ সিদ্দিকীর ফ্ল্যাট জালিয়াতির মামলার স্থগিতাদেশ বিষয়ে এক প্রশ্নে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, “সেই মামলায় একজন আইনজীবী এসে যাওয়ায় অন্য আইনজীবীরাও স্বাভাবিকভাবেই পেশাগত কারণে সমর্থন জানিয়েছেন। এর ফলে উচ্চ আদালত থেকে একটি স্টে অর্ডার জারি হয়েছে।
“বর্তমানে আমরা সেই স্টে অর্ডার ভ্যাকেট করার প্রক্রিয়ায় আছি। ভ্যাকেট হয়ে গেলে মামলাটি এগিয়ে যাবে।''
তিনি বলেন, “এ নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। এই মামলাটির দ্রুত নিষ্পত্তি হোক—আপনারা যেমন চান, আমরাও সেটাই চাই।''
পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের ছয়টি প্লট নেওয়ার ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগে এসব মামলায় গত ৩১ জুলাই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানার সঙ্গে তাদের সন্তানসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় ঢাকার দুই বিশেষ জজ আদালত।
এর মধ্যে তিন মামলায় শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বিরুদ্ধে মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় ১১ অগাস্ট। ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুনের আদালতে ওই তিন মামলার বিচার কাজ চলছে।
আর বিশেষ জজ রবিউল আলমের আদালতে শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানা, তার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি, মেয়ে টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক ও আজমিনা সিদ্দিকদের বিরুদ্ধে তিন মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় ১৩ অগাস্ট।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। তার পরিবারের অন্যরাও দেশের বাইরে। পলাতক থাকায় তাদের পক্ষে কোনো আইনজীবী সাক্ষীদের জেরা করার সুযোগ পাচ্ছেন না।
পঞ্চমবারের মতো সমঝোতা স্মারক
দুর্নীতি প্রতিরোধে এ নিয়ে পঞ্চমবারের মতো সমঝোতা স্মারক সই করল দুদক ও টিআইবি।
সমঝোতা স্মারক সই হয় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে। এতে দুদকের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন এবং টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান সই করেন।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ''আমরা ২০১৫ সালে প্রথমবার দুদকের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করি। এতদিন পর্যন্ত তা দুই থেকে তিন বছর মেয়াদি ছিল। এবার চলতি মেয়াদ শেষ হচ্ছে ৩০ সেপ্টেম্বর। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, বর্তমান নেতৃত্বের অধীনে দুদক আমাদের সঙ্গে পাঁচ বছরের জন্য সমঝোতা স্মারক সই করতে সম্মত হয়েছে। আজ আমরা সেই চুক্তি সই করেছি।''
তিনি বলেন, ''যে কয়েকটি বিষয়ে আমরা একমত হয়েছি, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে গবেষণা ও তথ্য সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণে পারস্পরিক সহযোগিতা। এর ভিত্তিতে যৌথ বা নিজস্ব গবেষণার মধ্যে সহযোগিতা হবে। দ্বিতীয় বিষয়টি হলো দুর্নীতি প্রতিরোধে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে পরামর্শমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণ। দেশে ৩৫ অঞ্চলে টিআইবির সচেতন নাগরিক কমিটির (এসিএনসি) কার্যক্রম রয়েছে। অপরদিকে দুদকের পক্ষ থেকেও দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ দুটি ক্ষেত্রকে বেগবান করার জন্য পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র চিহ্নিত করব।
''তৃতীয়ত, আপনারা অনেকেই জানেন যে, বাংলাদেশে দুর্নীতি দমন কমিশনের জন্মের পেছনে টিআইবির গবেষণা ও পরামর্শ ছিল। আমরা স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠার দাবি তুলেছিলাম এবং খসড়া আইন প্রণয়ন করেছিলাম। তার ভিত্তিতেই ২০০৪ সালে সংসদে আইনটি গৃহীত হয়। তাই আমরা দুদকের স্টেকহোল্ডার এবং চাই যে তারা আইনগতভাবে অর্পিত দায়িত্ব স্বাধীনভাবে কার্যকরভাবে পালন করুক। এজন্য আমরা দুদকের সহযোগী এবং একইসাথে ওয়াচডগ হিসেবে ভূমিকা পালন করি। তাদের কার্যক্রমে ঘাটতি থাকলে বা উন্নয়নের সুযোগ থাকলে আমরা পরামর্শ দিই, গণমাধ্যমের মাধ্যমে প্রচার করি, এবং সরকারের কাছে সুপারিশ জানাই।''
দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ''ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের ১০ বছর পূর্তি হলো। আগে স্বল্প মেয়াদী চুক্তি হতো, এবার আমরা ৫ বছরের চুক্তি করেছি। টিআইবি আমাদের সহযোগী। তবে মিডিয়া হলো দুদকের সবচেয়ে সম্পূরক প্রতিষ্ঠান। তারা আমাদের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেয়, আমরা তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেই। আমাদের লক্ষ্য একটাই—বাংলাদেশের ভালো হোক। তাই এই সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে আমাদের সম্পর্ক আরও মজবুত হলো।''
তিনি আরও বলেন, ''আগে যখন টিআইবি আন্তর্জাতিক করাপশন পারসেপশন ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান প্রকাশ করত, সরকার তা অস্বীকার করত। এবার প্রথমবারের মতো ২০২৪ সালের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮০ দেশের মধ্যে ১৫১ হলেও আমরা তা মেনে নিয়েছি। আমরা বিশ্বাস করি, এটি বাস্তবতার কাছাকাছি।''
দুদকের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি নিয়ে এক প্রশ্নে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ''যদি দুর্নীতি দমন কমিশন নিজেই দুর্নীতিমুক্ত না হয়, তবে অন্য প্রতিষ্ঠানকে দুর্নীতি না করার পরামর্শ দেওয়ার নৈতিক অধিকার আমাদের থাকে না। সুতরাং প্রথম কাজ হওয়া উচিত নিজেদের ভেতরের দুর্নীতি দূর করা। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যম আমাদের অনেক সহযোগিতা করছে। গণমাধ্যম যখনই প্রমাণসহ কোনো তথ্য দেয়, আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করি। আর যদি প্রমাণ কিছুটা কমও থাকে, তবে আমরা তদন্ত করে বিষয়টি একটি পদ্ধতিগত সমাধানের চেষ্টা করি।''
তিনি বলেন,'' তবে এখানেও একটি সমস্যা রয়েছে। আমরা যখন কোনো পদক্ষেপ নিই, তখন সংশ্লিষ্টদের আইনগত অধিকার অনুযায়ী তারা আদালতে যান। উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ এলে সেই প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রিতায় পড়ে যায়। তাই সব দায় দুদকের উপর চাপানো সঠিক হবে না।''