Published : 20 Jun 2026, 06:32 PM
পাঁচ বছর আগের রিসোর্টকাণ্ড প্রসঙ্গ জাতীয় সংসদের আলোচনায় আসার দুদিন বাদে সেই ঘটনা নিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক।
শনিবার সকালে দেওয়া দীর্ঘ ফেইসবুক পোস্টে তিনি দাবি করেছেন, ওই ঘটনা ছিল তার ‘চরিত্র হননের ঘৃণ্য প্রয়াস’।
হেফাজত নেতা মামুনুল হক বলেন, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) নেতৃত্বে তখনকার ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ, দলটির আইনজীবী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা আদালতেও ‘হেনস্তা’ করেছে।
তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, নারায়ণগঞ্জের রিসোর্টে গিয়ে ‘কি বাংলাদেশের প্রচলিত কোনো আইন ভঙ্গ’ করেছেন তারা।
তার ভাষায়, “আমি কিংবা জান্নাত আরা (ঝর্না) আমরা কি বাংলাদেশের প্রচলিত কোন আইন ভঙ্গ করেছি? কিংবা আমি অথবা সে আমরা কেউ কি কারো কাছে কোন অভিযোগ দায়ের করেছি? আমরা তো সেখানে স্বেচ্ছায় গিয়েছিলাম। তাহলে পুলিশের নেতৃত্বে জোরপূর্বক আমাদের ঘরে ঢোকা কোন আইনে বৈধ হলো?
“রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে একের পর এক আমাদের ব্যক্তিগত কল রেকর্ড ফাঁস করা এবং অনেক ক্ষেত্রে তাতে বিকৃতি করার বৈধতা কোন আইনে আছে?”
২০২১ সালে নারায়ণগঞ্জের রয়েল রিসোর্টের ৫০১ নম্বর কক্ষে এই নারীকে নিয়ে অবস্থান করছিলেন মামুনুল হক। সেখানে তাদের আটকে রাখার পাশাপাশি হামলা-ভাঙচুর, বিক্ষোভের মতো ঘটনা ঘটেছিল। ঘটনাচক্রে কারাগারেও যেতে হয়েছিল মামুনুল হককে।
সেই রিসোর্টকাণ্ড প্রসঙ্গ বৃহস্পতিবার সংসদে আনেন বিএনপির সাংসদ খোন্দকার আবু আশফাক। তার বক্তব্য ধরে স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদ বলেন, “এখনও কিন্তু তিনি (মামুনুল হক) তার অবস্থান পরিষ্কার করেননি। একজন রাজনৈতিক নেতার জীবনের অন্ধকার অংশ, এখানে আলোচিত হোক, সেটা চাই না।”
পরে মামুনুল হককে নিয়ে আবু আশফাকের দেওয়া বক্তব্যটি কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেন স্পিকার। কিন্তু স্পিকার রিসোর্টকাণ্ডকে মামুনুলের ‘জীবনের অন্ধকার অংশ’ বলায় এ নিয়ে আপত্তি তুলে বিক্ষোভ করে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস।
হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল ফেইসবুকে লিখেছেন, “আমি রাষ্ট্রীয় কোনো আইন লঙ্ঘন করিনি। শরীয়তের আইনও লংঘন করিনি।”
ক্ষোভ ঝেরে তিনি লিখেছেন, “ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনার রাষ্ট্রযন্ত্র প্রকাশ্যে এই অন্যায়গুলো করল। কোনো একজন সুশীলও কি এই ব্যাপারে কোন কথা বলল?
“একটি রাষ্ট্রের এমন নির্লজ্জ ভূমিকায় সরকার বা রাষ্ট্র কিংবা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রশ্ন না করে সবাই আমাকে ঘায়েল করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠল!”
রিসোর্টকাণ্ডের ঘটনার বর্ণনায় মামুনুল হক লিখেছেন, “৩রা এপ্রিল ২০২১। রাষ্ট্রীয় মবসন্ত্রাসের এক ঘৃণ্য কালো দিবস। সেদিন আমি আমার স্ত্রী জান্নাত আরা (ঝর্ণা)কে নিয়ে নারায়ণগঞ্জের রয়েল রিসোর্টের ৫০১ নং কক্ষে অবস্থান করছিলাম।
“সেখানে পুলিশের নেতৃত্বে স্থানীয় আওয়ামী সন্ত্রাসী, সাংবাদিক লীগ ও ঘাদনিকের প্রায় শ খানেক সদস্য উপস্থিত হয়। রিসোর্টের রিসিপশন ডেস্ক থেকে ফোন করে আমাকে জানানো হয়, পুরো রিসোর্ট পুলিশ ঘেরাও করে ফেলেছে।
“আমি আমার কক্ষের দরজা খুলতেই তারা সবাই জোরপূর্বক আমার রুমে প্রবেশ করে। সময় টিভিসহ বেশ কয়েকটি চ্যানেলের সাংবাদিক এবং উপস্থিত প্রায় সকলেই তাদের ডিভাইসের মাধ্যমে একযোগে লাইভ প্রচার করতে থাকে।”
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন, “তারা নানা ভাবে আমাদেরকে হেনস্থা করে। আমার উপর চড়াও হয়। আমার স্ত্রীকেও টেনে ধরে হ্যাচারানোর উপক্রম করে।
“তাদের হিংস্রতা থেকে বাঁচানোর জন্য আমি আমার স্ত্রীকে ওয়াশরুমের দরজা খুলে সেখানে আটকে দেই। কিছুক্ষণের মধ্যে লেডি পুলিশের একটি টিম এসে উপস্থিত হয় এবং ওয়াশরুমে ঢুকে তারাও সেখান থেকে লাইভ সম্প্রচার করতে থাকে। উপর্যুপরি তাদের জিজ্ঞাসাবাদে আমি এবং আমার স্ত্রী আমরা উভয়েই স্পষ্ট ভাষায় আমাদের বৈবাহিক সম্পর্ক এবং আমরা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে সেখানে অবস্থান করার বিষয়টি ব্যক্ত করি এবং সেটি সকল সংবাদে একযোগে প্রচার হতে থাকে।
“শুরুতেই পুলিশ কর্মকর্তা আমার হাত থেকে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। পরে এডিশনাল এসপি আসার পর তিনি আমাদের তথ্য যাচাইয়ের জন্য ফোনে আমার পরিচিতজনদের সাথে কথা বলে আশ্বস্ত হয়ে আমাদেরকে নিরাপদে বাইরে নিয়ে আসতে চান। কিন্তু ততক্ষণে সেখানে উপস্থিত হন গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইর একাধিক কর্মকর্তা।
“তারা আমাদেরকে থানায় নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। আমরা তাদের সাথে রুম থেকে বের হয়ে লবিতে নেমে দেখি হুলস্থুল কান্ড। হাজার হাজার প্রতিবাদী মানুষ সেখানে ঢুকে পড়েছে। উপস্থিত পুলিশগুলো প্রাণ ভয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে তাদেরকে রক্ষা করার আবদার জানাতে থাকে।
“আমি পুলিশ কর্মকর্তার কাছ থেকে আমার মোবাইল ফেরত নিয়ে লাইভে কিছু বক্তব্য দেয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু দেখি প্রযুক্তির সাহায্যে আমার ফেসবুক আইডির লাইভ অপশন বন্ধ করে রাখা হয়েছে। তখন আমি বিক্ষুব্ধ জনতার সামনে গিয়ে তাদেরকে নিবৃত্ত করি এবং পুলিশদেরকে রক্ষা করার ব্যবস্থা করি।”
সাড়ে ২৩০০ শব্দে লেখা পোস্টে মামুনুল হক ঘটনার বিবরণ দিয়ে জান্নাত আরার সঙ্গে তার সম্পর্ক, সেদিনের বিভিন্ন পরিস্থিতির ব্যাখ্যা করেন।
মামুনুল হক লিখেন, “২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ছয় বছর আমাদের বিবাহ বন্ধন টিকে ছিল। কিন্তু ২০২১ এর ঘটনার পর পরস্পর কিছু মনোমালিন্য সৃষ্টি হওয়ার প্রেক্ষিতে এক পর্যায়ে আমরা আলোচনার মাধ্যমে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি।
“২০২৫ সালের মার্চ মাসে বিচ্ছেদের আগ পর্যন্ত এমনকি আমার কারাবাসকালীন সময়েও তার ভরণপোষণসহ প্রাপ্য অধিকার আদায় করি।”
ব্যাখ্যার শেষাংশে তিনি লিখেছেন, “…যে সকল কুলাঙ্গাররা ফ্যাসিস্ট হাসিনার ষড়যন্ত্রমূলক অসভ্যতা নির্লজ্জতা বেহায়াপনা ও রাষ্ট্রীয় মবসন্ত্রাসের পরাজিত ঘৃণ্য প্রজেক্টকে ৫০১ বলে বলে বিকৃত স্বাদ আস্বাদন করে, তাদের প্রতি আমাদের সুস্পষ্ট জবাব হল- ৫০১ আমাদের নয়, বরং ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও তার নির্লজ্জ দোসরদের পরাজয়ের দলিল।
“হাসিনার পরাজয়ের কালিমা হিসেবে ৫০১কে আমরা আমাদের বিজয়ের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করলাম। আমরা এখন থেকে ৫০১কে সেলিব্রেট করব এবং আল্লাহর খাস রহমত প্রাপ্তির আনন্দ উদযাপন করব ইনশাআল্লাহ।”
এতদিন পর কেন ব্যাখ্যা দিতে হলো, শনিবার বিকালে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের এই প্রশ্নের জবাবে মামুনুল হক বলেন, “এটা নিয়ে এতদিন নতুন করে কোনো উপলক্ষ্য তৈরি হয়নি তাই দেওয়া হয়নি। এখন যেহেতু রাষ্ট্রীয়ভাবে, গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় কথা হচ্ছে, তাই আমার মনে হলো ব্যাখ্যাটা দেওয়া দরকার।
“এর আগে আমি নিজেও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় বলেছি। এই সবগুলো কথাই এখন একসঙ্গে আমি ফেসইবুকে লিখলাম।”
মামুনুল হক বলেন, তার ঘটনার বিষয়ে রাষ্ট্রীয় তদন্ত হওয়া দরকার।
“এই ঘটনার পর তো অনেক কল রেকর্ড সামনে এসেছে। কল রেকর্ড যে ফাঁস করল; এটা তো রাষ্ট্রীয় ভয়ঙ্কর অপরাধ, এই অপরাধে যারা যুক্ত; যারা প্রচার করলো; একজন নাগরিকের অধিকার যে ক্ষুন্ণ করলো; সেজন্য রাষ্ট্রের ওই সময়ের দায়িত্বশীলদের ব্যাখ্যা দেওয়া উচিৎ, তাদের বিচার হওয়া উচিৎ। যারা সরাসরি প্রচার করলো, তারা তো একজন ব্যক্তির এভাবে প্রচার করতে পারে না “