Published : 23 Jun 2026, 08:21 PM
জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবার ঐকমত্য চাইলেন বিরোধীদলীয় কয়েকজন সদস্য।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সদস্য মো. রুহুল আমিন বলেন, দুর্নীতি, মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, গুম, আয়নাঘর, ‘ফ্যাসিবাদ’, জুলাই সনদ ও গণহত্যা প্রশ্নে সংসদের সব সদস্যের ঐকমত্য থাকা উচিত।
দলটির পাবনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবু তালেব মণ্ডলও মনে করেন, দুর্নীতি ও মাদকের বিরুদ্ধে সংসদ সদস্যদের ঐকমত্য দরকার।
গেল ১১ জুন সংসদে নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ খসরু।
বিরোধী দলের সদস্যরা ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেট বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জের কথাও তুলে ধরেন।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশনে জামায়াতের সদস্য সদস্য রুহুল আমিন বলেন, সম্পদের বৈষম্য কমানোর কার্যকর রূপরেখা ‘স্পষ্ট নয়’।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের ৫ শতাংশ মানুষের হাতে গোটা দেশের টাকা, আর বাকি ৯৫ শতাংশ মানুষের হাতে বাকি টাকা। এই বৈষম্য নিয়ে একটি দেশ ভালোভাবে চলতে পারে না।”

রুহুল আমিন বলেন, “বাজেট কেবল উন্নয়ন বা টাকার হিসাব নয়; বাজেটের সঙ্গে মানুষের শান্তি, নিরাপত্তা ও ন্যায্যতার প্রশ্নও জড়িত।”
রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার ভাষ্য, ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হলেও গত অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আদায় ছিল অনেক কম।
কর-জিডিপি অনুপাতের তুলনা টেনে জামায়াতের এ সদস্য বলেন, নেপাল, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার তুলনায় বাংলাদেশ এখনও অনেক পিছিয়ে। এই বাস্তবতায় এত বড় বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পাবনা-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য আবু তালেব মণ্ডল বলেন, বাজেট বড় হয়েছে এবং ঘাটতিও বড়। তবে ঘাটতি কীভাবে পূরণ হবে, সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষাখাতের বরাদ্দে ‘অদৃশ্য ব্যয়’ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মোট বরাদ্দের সঙ্গে উপখাতের ব্যয়ের হিসাবের পার্থক্য স্পষ্ট করা দরকার।
দুর্নীতি ও মাদককে দেশের বড় সমস্যা হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমরা যারা ৩৫০ জন সংসদ সদস্য রয়েছি, আমরা যদি দুর্নীতিকে আশ্রয়-প্রশ্রয় না দিই, তাহলে বাংলাদেশ থেকে দুর্নীতি বিদায় হতে সময় লাগবে না।”
মাদকবিরোধী কার্যক্রম জোরদার করতে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবকাঠামো, যানবাহন ও আবাসন সুবিধার জন্য আরও বরাদ্দ দাবি করেন তিনি।
কুষ্টিয়া-২ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. আব্দুল গফুর বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটের ১০টি অগ্রাধিকারের মধ্যে সুশাসনের বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।
তিনি বাজেটকে ‘উচ্চাভিলাষী, অবাস্তব রাজস্ব আয়ের এবং অতি ঋণনির্ভর’ বলে মন্তব্য করেন।
জিডিপি প্রবৃদ্ধির ৬ দশমিক ৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন হবে মন্তব্য করে এই সংসদ সদস্য বলেন, আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী প্রবৃদ্ধি হবে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ।
স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন তুলে আব্দুল গফুর বলেন, সরকারি হাসপাতালে গরিব মানুষ প্রত্যাশিত সেবা পাচ্ছে না।

‘স্বপ্ন না থাকলে মানুষ বাঁচবে কী করে’
বগুড়া-৬ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য মো. রেজাউল করিম বাদশা প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘গণমুখী, উৎপাদনমুখী, জনবান্ধব, জনকল্যাণ ও মানবিক’ বলে বর্ণনা করেন।
বাজেটকে যারা ‘স্বপ্নবিলাসী’ বলছেন, তাদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “স্বপ্নই যদি না থাকে, তাহলে মানুষ বাঁচবে কী করে?”
শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় বেশি।
তার মতে, “দক্ষ শিক্ষক তৈরি, গবেষণা, উদ্ভাবন, কারিগরি শিক্ষা ও কর্মমুখী দক্ষতা বৃদ্ধিতে বাজেটে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।”
জুলাই যোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধা, নারী ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ইমাম-মুয়াজ্জিন ও পুরোহিত-সেবায়েতদের সম্মানী, খেলাকে পেশা হিসেবে দেখা এবং কিডনি ও হৃদরোগের চিকিৎসা সরঞ্জামে শুল্ক কমানোর উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন সরকারি দলের এই সদস্য।
জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের মেট্রোরেলে ২৫ শতাংশ ছাড়ের পরিবর্তে ৫০ শতাংশ ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব করেন রেজাউল করিম।
‘শিক্ষা বরাদ্দ গবেষক তৈরির জন্য যথেষ্ট নয়’
গাইবান্ধা-২ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. আব্দুল করিম বলেন, “শিক্ষা খাতে জাতীয় বাজেটের প্রায় ১৩ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হলেও তা দিয়ে শিক্ষার মানোন্নয়ন ও গবেষক তৈরি করা সম্ভব নয়।”
তিনি ইন্দোনেশিয়া, ভারত, মালয়েশিয়া ও শ্রীলঙ্কার উদাহরণ টেনে শিক্ষায় আরও বেশি বরাদ্দের আহ্বান জানান।
নিজ এলাকা গাইবান্ধার দারিদ্র্য ও কৃষিনির্ভরতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, জেলার প্রায় ২৬ লাখ মানুষের একটি বড় অংশ দরিদ্র এবং প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ কৃষিনির্ভর।
কিন্তু কৃষি গবেষণার জন্য সেখানে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রতিষ্ঠান নেই তুলে ধরে আব্দুল করিম গাইবান্ধায় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি জানান।
গাইবান্ধার অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য নেওয়া ‘সবুজ প্রকল্প’ বাতিলের চেষ্টা হচ্ছে দাবি করে তিনি বলেন, প্রকল্পটি বাতিল হলে জেলার উন্নয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
পাবনা-৩ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. আলী আজগার বাজেট ঘাটতি, রাজস্ব আদায় এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
তিনি বলেন, শিক্ষাখাতে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলা হলেও প্রাথমিক, গণশিক্ষা, মাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষা, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষার উপখাতে হিসাব করলে একটি ‘ব্যবধান’ দেখা যায়।
স্বাস্থ্য খাতেও একই ধরনের ‘অস্পষ্টতা’ আছে দাবি করে আলী আজগার বলেন, “কোন খাতে কত টাকা ব্যয় হবে, তা পরিষ্কারভাবে জানা যাচ্ছে না।”
আবাসন খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তার এই বক্তব্যের প্রতিবাদ করে পয়েন্ট অব অর্ডারে বিএনপির সংসদ সদস্য শামিম কায়সার বলেন, চলতি বাজেটে এমন কোনো সুযোগ রাখা হয়নি।
জবাবে আলী আজগার বলেন, তিনি বাজেট নথি থেকেই বিষয়টি তুলে ধরেছেন।

চা শ্রমিকদের জমির মালিকানা দাবি
হবিগঞ্জ-৪ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য এস এম ফয়সল বলেন, তার নির্বাচনি এলাকার ২৩টি চা বাগানে লক্ষাধিক মানুষ বসবাস করলেও তাদের পূর্বপুরুষরা যে ভিটায় বসবাস করতেন, তার মালিকানা এখনও তারা পাননি।
চা শ্রমিকদের জমির অধিকার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে পর্যটন অবকাঠামোর ঘাটতির কথা তুলে ধরে ফয়সল বলেন, প্রতিদিন পর্যটক গেলেও সেখানে পাবলিক টয়লেট, খাবার পানি, আশ্রয়কেন্দ্র, বিশ্রামাগার ও নিরাপত্তার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। সেখানে পুলিশ ফাঁড়ি ও পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলার দাবি জানান তিনি।
চায়ের ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি
মৌলভীবাজার-৪ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী বলেন, শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনজীবিকার সঙ্গে চা শিল্প সরাসরি যুক্ত।
চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি সম্মানজনক পর্যায়ে উন্নীত করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, প্রান্তিক চা চাষী ও বাগান মালিকদের দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী শ্রীমঙ্গলে একটি পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক চা নিলাম কেন্দ্র স্থাপন করা প্রয়োজন।
কফির মতো চায়ের ওপর থেকেও ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে সরকারি দলের এই সদস্য বলেন, কফি যদি ভ্যাট অব্যাহতি পেতে পারে, তবে নিজেদের শ্রমে ও মাটিতে উৎপাদিত চা কেন এই বৈষম্যের শিকার হবে?
চা শিল্পকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেওয়ার সুপারিশ করেন তিনি।
‘ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই কারিগরি শিক্ষা’
সিরাজগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য মো. আয়নুল হক বলেন, বাংলাদেশকে দক্ষতাভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে হলে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই ধাপে ধাপে কারিগরি শিক্ষা চালু করতে হবে।
তার মতে, প্রতিটি শিক্ষার্থীকে কৃষি, আইসিটি, বিদ্যুৎ, ইলেকট্রনিক্স, গ্রাফিক ডিজাইন, পর্যটন, স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ ও সৃজনশীল শিল্পের মতো কোনো একটি কর্মমুখী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে।
মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্য ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান, গণিত, ইংরেজি ও তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার মান বাড়ানোরও আহ্বান জানান বিএনপির এই সদস্য।
‘বরিশালকে বঞ্চিত রাখা যাবে না’
পটুয়াখালী-৪ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য এ বি এম মোশারফ হোসেন বাজেটকে বিএনপির নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে তুলে ধরলেও বরিশাল অঞ্চলের বরাদ্দ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, “চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনার উন্নয়ন হবে, আর বরিশাল বঞ্চিত থাকবে, এটা হতে পারে না।”
ভাঙ্গা-কুয়াকাটা মহাসড়ক, কুয়াকাটা পর্যটন এলাকা এবং পায়রা বন্দরের জন্য বাজেটে প্রত্যাশিত বরাদ্দ নেই বলে দাবি করেন করেন।
তিনি বলেন, “আমরা বলতে চাই ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। তাই সেই বাংলাদেশকে উন্নয়নের জন্য বরিশালবাসীও বরাদ্দ চায়।”