Published : 24 Jun 2026, 09:02 PM
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর অতীতে নির্যাতনের অভিযোগ তুলে জাতীয় সংসদে এর বিচার দাবি করেছেন সংরক্ষিত আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য মোসাম্মৎ শাম্মী আক্তার।
বুধবার সংসদে নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, তারেক রহমান প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার কথা বলেছেন, তবে এর অর্থ বিচারহীনতা নয়।
বিগত সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭ সালের ৭ মার্চ সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। সে সময় তার ওপর নির্যাতন চালানোর অভিযোগ ওঠে। সুপ্রিম কোর্ট থেকে জামিন নিয়ে একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি চিকিৎসার জন্য সপরিবারে লন্ডনে চলে যান। প্রায় ১৭ বছর পর গেল বছর তিনি দেশে ফেরেন।
শাম্মী আক্তার বলেন, “আমি কিছুদিন আগে লক্ষ্য করেছি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিএনপি বিটের সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বলেছেন যে, এখনও যদি এক্স-রে করা হয়, তার মেরুদণ্ডের হাড়টি বাঁকা হয়ে জোড়া লেগেছে, সেটি দেখা যাবে।”
তিনি বলেন, “তিনি বলেছেন, তিনি প্রতিহিংসা এবং প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন না। এটি থেকে তিনি বেরিয়ে আসতে চান। এটি অবশ্যই একটি দেশের জন্য, রাজনীতির জন্য ইতিবাচক দিক।”
শাম্মী বলেন, “প্রতিশোধ না মানে বিচারহীনতা নয়। আমরা চাই, এক-এগারোর সরকারের সময়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ওপর যে নির্যাতন সংঘটিত হয়েছে, এই ঘটনার মুখোশ উন্মোচন করা হোক এবং এই ঘটনার আমি বিচার দাবি করছি।”

বিচার না হলে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “বিচার যদি না হয়, তাহলে পরবর্তীতে এই ঘটনা আবারও পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।”
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশনে বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা চলছিল।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের প্রশংসা করে শাম্মী আক্তার বলেন, ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট শুধু হিসাব নয়, এটি অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং জনকল্যাণের একটি কাঠামো।
শিক্ষা খাত নিয়ে তিনি বলেন, এই বাজেটে শিক্ষাকে শুধু সনদ অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়নি; মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতকে বাজেটের ‘সবচেয়ে বড় মানবিক দিক’ হিসেবে তুলে ধরে সরকারি দলের এই সদস্য বলেন, প্রতিটি ইউনিয়নে আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্য ইউনিট এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রাথমিক স্বাস্থ্য ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা হল মানুষের কাছে চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ।
ডায়ালাইসিস ফিল্টারের ওপর ভ্যাট ও অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে ‘জীবন রক্ষার পদক্ষেপ’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কর্মসংস্থানের জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কর-শুল্ক সুবিধা এবং কৃষি উৎপাদন ব্যয় কমানোর পদক্ষেপেরও প্রশংসা করেন শাম্মী।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে বলে তারা জানতে পেরেছেন।
বাজেট প্রণয়নে সংসদ ‘রাবার স্ট্যাম্প’
পাবনা-১ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নজিবুর রহমান মোমেন বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় সংসদ সদস্যদের কার্যকর অংশগ্রহণ নেই বলে অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যসহ সংসদীয় গণতন্ত্রের অনেক দেশে বাজেট স্থায়ী কমিটির পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সংসদে আসে; কিন্তু বাংলাদেশে বাজেট প্রণয়ন করেন আমলারা।
তিনি বলেন, “আমাদের সংসদ সদস্যদের ভূমিকা এখানে সীমাবদ্ধ থাকে কয়েক মিনিটের গলাবাজিতে।”
নজিবুর বলেন, ১৭টি বইয়ে প্রায় ৪ হাজার ৪৬ পৃষ্ঠার বাজেট নথি সংসদ সদস্যদের দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তারা তা পড়েন না, পড়ার প্রয়োজনও অনুভব করেন না।
তিনি বলেন, “এই বাজেট আমরা প্রণয়ন করি না, আমাদের ভূমিকা শুধু বাজেট পাস করা, রাবার স্ট্যাম্পের মতো।”
বাজেট ‘গতানুগতিক, শুভঙ্করের ফাঁকি, গণবিরোধী এবং আগামী বছরের লুটপাটের পরিকল্পনা’ বলেও মন্তব্য করেন জামায়াতের এই সংসদ সদস্য।
ঋণনির্ভরতা, ভ্যাটের চাপ, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ, উন্নয়ন ব্যয়ের জবাবদিহির ঘাটতি এবং সুদভিত্তিক ঋণের সমালোচনা করেন তিনি।
নারায়ণগঞ্জকে ‘এ ক্যাটাগরি’ জেলা করার দাবি
নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া বাজেটকে ‘গণমানুষের বাজেট’ বলেন।
নারায়ণগঞ্জ দেশের জিডিপিতে বড় অবদান রাখে দাবি করে তিনি বলেন, তারপরও জেলাটি ‘বি ক্যাটাগরি’ হিসেবে আছে। নারায়ণগঞ্জকে ‘এ ক্যাটাগরি’ জেলা এবং মেট্রোপলিটন সিটি করার দাবি জানান তিনি।
‘গোপালগঞ্জে অবকাঠামো আছে, সেবা নেই’
গোপালগঞ্জ-২ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য কে এম বাবর স্বাস্থ্য খাত নিয়ে বক্তব্য দেন।
তিনি বলেন, গোপালগঞ্জ ডেন্টাল কলেজের ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হলেও বাকি কাজ না হওয়ায় তা মানুষের সেবায় আসতে পারছে না। এটি চালু হলে দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষ উপকৃত হবে।
গোপালগঞ্জ ‘আই’ হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ট্রমা সেন্টার ও নার্সিং ইনস্টিটিউটের জনবল সংকটের কথাও তুলে ধরেন সরকারি দলের এই সদস্য।
‘স্বাস্থ্যে বাজেট বাড়লেই সেবা বাড়ে না’
সংরক্ষিত আসনের জামায়াতে ইসলামী সংসদ সদস্য মারজিয়া বেগম বলেন, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হলেও সেই অর্থ কতটা কার্যকরভাবে ব্যয় হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ সুফল পাচ্ছে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।
তিনি বলেন, হাসপাতালগুলোতে শয্যা নেই, চিকিৎসক নেই, ওষুধ ও যন্ত্রপাতি নেই; অন্যদিকে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দের অর্থ অব্যবহৃত থেকে যায়।
তার প্রশ্ন, “সমস্যাটা কি আমাদের অর্থের, নাকি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা?”
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, সিভিল সার্জন ও প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা চিকিৎসকদের জন্য আধুনিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেন মারজিয়া বেগম।
বাজেট ‘অর্থনৈতিক কাব্য’
সংরক্ষিত আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য সুলতানা আহমেদ বাজেটকে ‘ঐতিহাসিক, স্বনির্ভর, যুগান্তকারী’ বলে বর্ণনা করেন।
নারীদের করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি, নারী উদ্যোক্তাদের জামানতবিহীন ঋণসুবিধা, শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধি, তরুণদের কর্মসংস্থান, ‘স্টার্টআপ ফান্ড’ এবং ফ্রিল্যান্সারদের কর সুবিধার কথা তুলে ধরেন তিনি।
অবকাঠামো খাতে দ্বিতীয় যমুনা সেতু, তৃতীয় মেঘনা সেতু এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের পরিকল্পনাকে অর্থনৈতিক করিডর তৈরির উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরেন সুলতানা।
মাদক কারবার জামিন অযোগ্য অপরাধ করার দাবি
দিনাজপুর-২ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য সাদিক রিয়াজ বাজেটকে ‘জনকল্যাণমুখী ও উন্নয়নবান্ধব’ হিসেবে তুলে ধরেন।
মাদক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, মাদক ‘পার্শ্ববর্তী দেশ’ থেকে আসছে এবং যুবসমাজকে ধ্বংস করছে। মাদক কারবারীদের বিরুদ্ধে এমন আইন করতে হবে, যাতে তারা দ্রুত জামিনে বের হতে না পারে।
‘বাজেটের চ্যালেঞ্জ অর্থ নয়, সুশাসন’
সংরক্ষিত আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
গাইবান্ধায় শিবির নেতাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা এবং ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় আট বছরের শিশু আন্দালিব সাদমান রাফি হত্যার ঘটনা তুলে ধরে দ্রুত বিচার দাবি করেন তিনি।
তার প্রশ্ন, “এই বাজেটে শিশুদের নিরাপত্তার জন্য আমাদের কী আয়োজন রয়েছে?”
বাজেটকে ‘জনতুষ্টিমূলক’ বললেও বাস্তবায়নের স্পষ্ট পথনির্দেশ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সরকারি দলের সদস্যরা সমালোচনা সহজভাবে নিতে পারছেন না অভিযোগ করে সাবিকুন্নাহার বলেন, “আমরা এমন একটা রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করতে চাই, যেখানে তৈলমর্দনের সংস্কৃতি থাকবে না।”
তার ভাষায়, “২০২৬ সালের বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থের অভাব নয়; বরং সুশাসনের অভাব এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সীমিত সক্ষমতা।”
যমুনা ভাঙন রোধে ব্যবস্থা দাবি
আগামী অর্থবছরের বাজেটকে ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ’ বলে মন্তব্য করেন বগুড়া-১ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য কাজী রফিকুল ইসলাম।
নিজ এলাকায় যমুনা নদীর ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।