Published : 18 Mar 2026, 09:29 PM
সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সংস্কৃতিমন্ত্রী, অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূরকে আটকে রাখার পেছনে ‘বিশ্বাসযোগ্য কোনো অভিযোগ বা তথ্যপ্রমাণ না থাকার’ দাবি করে তাকে ১৮ মাস ধরে বিনাবিচারে কারাগারে রাখার বৈধা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তার মেয়ে সুপ্রভা তাসনীম।
নূরের বিরুদ্ধে দায়ের করা হত্যা মামলা নিয়ে প্রকাশিত একটি খবর ফেইসবুকে পোস্ট করে রোববার তিনি লিখেছেন, ‘মব নয়, বরং আইন দ্বারা চালিতে হবে আদালত’–এমন আশা তিনি নতুন সরকারের কাছে করতে পারেন কি-না।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “যাচাইকৃত তথ্যপ্রমাণে নূরের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোকে পরস্পরবিরোধী ঘটনাক্রমের ভিত্তিতে ঢালাও অভিযোগ হিসাবে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যা সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণের দ্বারা সমর্থিত নয়।”
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে আসাদুজ্জামান নূরকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময়ের হত্যা মামলার আসামি করা হয় তাকে।
তাকে গ্রেপ্তারের রাতের প্রসঙ্গ টেনে সুপ্রভা লিখেছেন, “আজ সেই মূহূর্তের ১৮ মাস হচ্ছে। মধ্যরাতে দরজার শব্দে অসতর্ক পদক্ষেপে এগিয়ে গেলেন বাবা, ঘর খুলে দিলেন প্রায় ৩০ জন সাদা পোশাকে পুলিশ কর্মকর্তাকে, যারা তাকে নিয়ে গেল ‘জিজ্ঞাসাবাদের’ জন্য।
“কোনো ধরনের বিচার, অভিযোগ বা তথ্যপ্রমাণ ছাড়া তখন থেকে তিনি বন্দি এবং তাকে জামিন দেওয়া হয়নি।”
নূরের মেয়ে লিখেছেন, “আমরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে বহুবার তার অধিকারের বিষয়ে কথা বলেছি। আমাদেরকে বলা হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে জুলাই-অগাস্ট হত্যা মামলা যে ভিত্তিহীন, এটা জানা কথা। তাহলে কেন তাকে আটক রাখা হচ্ছে?
“কারণ, তার বিরুদ্ধে তার সংসদীয় আসনকেন্দ্রিক ‘গুরুতর অভিযোগের’ কথা বলা হচ্ছিল (সেগুলো আদতে কী, তা অস্পষ্ট)।
জুলাই আন্দোলনের পর নূরকে গ্রেপ্তারের পর নীলফামারীতে তার ওপর হামলার ঘটনায় করা মামলার কয়েক আসামিকে ‘বিনা বিচারে হত্যার’ পেছনে তার জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে।
গ্রেপ্তারের পরপরই নূরের বিরুদ্ধে নীলফামারীতে আরও দুটি হত্যা মামলা দায়ের হয়। একটিতে ২০১৪ সালে একটি ‘হত্যাকাণ্ডের’ জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে।
২০১৪ সালে জেলা সদরের লক্ষ্মীচাপ ইউনিয়ন বিএনপির নেতা গোলাম রব্বানীকে হত্যার অভিযোগে ২০২৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর আদালতে মামলাটি করেন তার স্ত্রী শাহানাজ বেগম।
২০১৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর বিকালে জেলা সদরের রামগঞ্জ বাজারে সাবেক সংসদ সদস্য আসাদুজ্জামান নূরের গাড়ি বহরে হামলা হয়। তখন স্থানীয় আওয়ামী লীগের চার নেতাকর্মী ও একজন পথচারীসহ পাঁচজন নিহত হন।
এ ঘটনায় সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) বাবুল আকতার বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার অন্যতম আসামি ছিলেন লক্ষ্মীচাপ ইউনিয়ন বিএনপি নেতা গোলাম রব্বানী। মামলার তদন্ত চলার মধ্যে কথিত বন্দুকযুদ্ধে তিনি নিহত হন।
গোলাম রব্বানীর লাশ উদ্ধারের কয়েক দিন পর নূরের গাড়িবহরে হামলার ঘটনার মামলার আরেক আসামি আতিকুর রহমান আতিকের লাশ উদ্ধার হয় ২০১৪ সালের ২০ জানুয়ারি। আতিককে আগেই ‘পুলিশ তুলে নিয়ে গিয়েছিল’ বলে তখন অভিযোগ করেছিল পরিবার।

এসব মৃত্যুর পেছনে নূরের হাত থাকার অভিযোগকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘উইচ হান্ট’ হিসাবে বর্ণনা করেন তার মেয়ে সুপ্রভা তাসনীম।
তিনি লিখেছেন, “কোনো ধরনের প্রক্রিয়া ছাড়াই তার বিরুদ্ধে মেকি এই অভিযোগগুলোকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসাবে বলা হচ্ছিল বারবার।
“সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উইচ হান্টের জন্য কেবল বট ও গুজবের কারখানাগুলো নয়, বিগত সরকারের সদস্যরাও এটা ছড়িয়েছে, যারা সামাজিক মাধ্যমের মনোযোগকে ফ্যাক্ট-চেকিং ও বিশ্বাসযোগ্যতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন বলে মনে হত।”
এসব হত্যা মামলা নিয়ে করা প্রতিবেদনের কথা তুলে ধরে আসাদুজ্জামান নূরের মেয়ে লিখেছেন, “হৈচৈকে উপেক্ষা করে এই প্রতিবেদনে কেবল হাতে থাকা প্রমাণের উপর দৃষ্টি ফেলায় বাংলা আউটলুকের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।
“সেখানে বলা হয়েছে, ‘যাচাইকৃত তথ্যপ্রমাণে নূরের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোকে পরস্পরবিরোধী ঘটনাক্রমের ভিত্তিতে ঢালাও অভিযোগ বলে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যা সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণের দ্বারা সমর্থিত নয়’।”
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ‘বিচার বিভাগকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার’ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতি ‘অশ্রদ্ধা’ দেখানোর অভিযোগ করে সুপ্রভা লিখেছেন, “মানবাধিকারের প্রতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের যে হতাশাজনক অশ্রদ্ধা ছিল, আমার বাবা ১৮ মাস ধরে তার ভুক্তভোগী।
“আমরা একটি নির্বাচিত সরকার পেয়েছি, মব (শারীরিক ও অনলাইন উভয়) নয়, বরং আইন দ্বারা পরিচালিত হবে দেশের আদালত–শেষতক এমন আশা কি আমরা করতে পারি?”
বাবার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে সুপ্রভা লিখেছেন, “এই বছর আশি বছরে পা রাখবেন বাবা। ইতোমধ্যে দুটি জন্মদিন তিনি জেলে কাটিয়েছেন। পরিবার থেকে তৃতীয় ঈদ পার করার দ্বারপ্রান্তে তিনি।
“আমি ভাবতে পারি না, যে ব্যক্তি জুলাই-অগাস্ট হত্যাকাণ্ডের সময়ে সরকারের কোনো নির্বাহী বা নেতৃত্বের জায়গায় ছিল না, যার বিরুদ্ধে কোনো বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ নেই, তাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে রাখাটা কীভাবে ন্যায়বিচার হতে পারে। এটা আমাদের জন্য ন্যায়বিচার নয় এবং এটা নিশ্চয় ভুক্তভোগীদের জন্যও ন্যায়বিচার নয়।”
পুরোনো খবর: