Published : 05 Jul 2026, 02:49 PM
বাতাস দূষিত কি না, তা বোঝার জন্য শুধু ধোঁয়া দেখা বা গন্ধ পাওয়াই যথেষ্ট নয়। অনেক সময় চোখে ধোঁয়া দেখা বা গন্ধ পাওয়ার আগেই দূষিত বাতাস ফুসফুসের ক্ষতি করতে শুরু করে। তাই বিশেষজ্ঞরা আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখার মতোই নিয়মিত বায়ুর মান সূচক বা এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দেন।
এ নিয়ে সংবাদের সাইট ভক্স-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদন ব্যাখ্যা করেছে এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স বা বায়ুর মান সূচক কী, এটি কীভাবে কাজ করে এবং কোন পরিস্থিতিতে কী ধরনের সতর্কতা নেওয়া উচিত।
দূষিত দিনের যে ধোঁয়াটে আবরণ দেখা যায়, সেটি মূলত ওজোন ও অতিক্ষুদ্র কণিকা পদার্থের সমন্বয়ে তৈরি। এই কণিকাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো ‘পিএম ২ দশমিক ৫’। এর আকার মানুষের চুলের প্রস্থের তুলনায় প্রায় ৩০ ভাগের এক ভাগ। এতটাই ছোট যে এটি ফুসফুসের কোষ ও রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পিএম ২ দশমিক ৫ শরীরে প্রদাহ, হাঁপানি, হৃদরোগ ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিভিন্ন সমস্যাকে আরও তীব্র করতে পারে। অন্যদিকে, বায়ুমণ্ডলের উঁচু স্তরে থাকা ওজোন যদিও সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি থাকা ওজোন শ্বাসকষ্ট তৈরি করতে পারে এবং শ্বাসতন্ত্রের টিস্যুর ক্ষতি করতে পারে।
এই দুই ধরনের দূষক শিশু, বয়স্ক, গর্ভের ভ্রূণসহ জীবনের সব পর্যায়ের মানুষের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ট্রাকের ধোঁয়া, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, আবর্জনা পোড়ানোর কেন্দ্র বা এমনকি প্রতিবেশীর বারবিকিউ থেকেও এসব দূষক তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে পিএম ২ দশমিক ৫ বাতাসের সঙ্গে হাজার হাজার কিলোমিটার ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম।
বায়ুর মান সূচক কী?
বায়ুর মান সূচক বা এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স হলো বাইরে বাতাস কতটা দূষিত, তা বোঝানোর একটি মানদণ্ড। এটি নির্ধারণ করে যুক্তরাষ্ট্রের এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন এজেন্সি। দেশজুড়ে প্রায় পাঁচ হাজার পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য ব্যবহার করে এই সূচক তৈরি করা হয়।
এতে দুটি পৃথক সূচক থাকে। একটি পিএম ২ দশমিক ৫-এর জন্য, অন্যটি ওজোনের জন্য। তবে সাধারণভাবে যে একটি মান দেখা যায়, সেটি দুটি সূচকের মধ্যে যেটি বেশি, সেটিই দেখায়।
আবহাওয়ার বিভিন্ন অ্যাপেও এই সূচক দেখা যায়। তবে অনেক অ্যাপ নিজস্ব পদ্ধতিতে তথ্য বিশ্লেষণ করায় তাদের মান সরকারি সূচকের সঙ্গে পুরোপুরি এক নাও হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বিভিন্ন দেশে পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি ভিন্ন হওয়ায় স্যাটেলাইট তথ্য ও কম্পিউটার মডেলের ওপরও নির্ভর করা হয়।
এই সূচকের সীমাবদ্ধতা কী?
বায়ুর মান সূচক অনেক জটিল তথ্যকে একটি মাত্র সংখ্যায় প্রকাশ করে। আবার পর্যবেক্ষণ যন্ত্রগুলো সাধারণত শহরের আশপাশে বসানো হয়, বড় শিল্পকারখানার খুব কাছাকাছি নয়।
ফলে কোনো ব্যস্ত মহাসড়কের পাশে বা বড় দূষণ উৎসের কাছে বাস্তব পরিস্থিতি সূচকে দেখানো মানের চেয়ে খারাপ হতে পারে। এছাড়া বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে দূষণের অসম প্রভাবও এই সূচক পুরোপুরি তুলে ধরতে পারে না।
কারা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবারই নিয়মিত বায়ুর মান সূচক দেখা উচিত।
তবে হাঁপানি বা দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষ এবং গর্ভবতীদের ক্ষেত্রে সতর্কতা আরও বেশি প্রয়োজন।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক ও মেডিক্যাল সোসাইটি কনসোর্টিয়াম অন ক্লাইমেট অ্যান্ড হেলথের নির্বাহী পরিচালক লিসা প্যাটেল বলেন, “শিশুর বয়স যত কম, তার শ্বাস নেওয়ার গতি তত বেশি। ফলে শরীরের ওজনের তুলনায় তারা বেশি দূষিত বাতাস গ্রহণ করে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা পাঁচ বছর বয়সকে বিশেষ ঝুঁকির সীমা হিসেবে ধরি, কারণ জন্ম থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় ফুসফুস খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায়। তাই এত অল্প বয়সে এসব বিষাক্ত উপাদানের সংস্পর্শে আসা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। তবে জীবনের সব বয়সেই এটি উদ্বেগের বিষয়।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ দলে না থাকলেও সবার নিজের জন্য কোন মাত্রার দূষণে শারীরিক সমস্যা শুরু হয়, তা জানা উচিত। নিয়মিত সূচক পর্যবেক্ষণ ও নিজের লক্ষণ খেয়াল করলে সেই সীমা বোঝা সহজ হয়।
বায়ুর মান সূচকের ছয় স্তর
বায়ুর মান সূচককে ছয়টি ধাপে ভাগ করা হয়।
সবুজ: অর্থাৎ ০ থেকে ৫০। এই অবস্থায় বাতাস নিরাপদ।
হলুদ: অর্থাৎ ৫১ থেকে ১০০। সাধারণ মানুষের জন্য গ্রহণযোগ্য হলেও অতিসংবেদনশীলদের সতর্ক থাকা উচিত।
কমলা: অর্থাৎ ১০১ থেকে ১৫০। সংবেদনশীল ব্যক্তিদের বাইরে ভারী শারীরিক পরিশ্রম কমানো উচিত। হাঁপানি ও হৃদরোগীদের লক্ষণ পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
লাল: অর্থাৎ ১৫১ থেকে ২০০। এই অবস্থায় বাতাস সবার জন্য অস্বাস্থ্যকর। সংবেদনশীলদের বাইরে শারীরিক কার্যক্রম এড়িয়ে চলতে হবে এবং অন্যদেরও বাইরে থাকার সময় কমাতে হবে।
বেগুনি: অর্থাৎ ২০১ থেকে ৩০০। বাতাস অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর। সম্ভব হলে সবারই ঘরের ভেতরে কার্যক্রম সরিয়ে নেওয়া উচিত।
খয়েরি: অর্থাৎ ৩০১ বা তার বেশি। এটি সবচেয়ে বিপজ্জনক স্তর। সবাইকে বাইরে শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলতে হবে এবং সংবেদনশীলদের ঘরের ভেতরে অবস্থান করা উচিত।
কোন লক্ষণগুলো খেয়াল করবেন?
বায়ুদূষণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের বিভিন্ন লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হলো শ্বাসকষ্ট। এছাড়া কাশি, বুকে অস্বস্তি, বুক চেপে আসা, গলায় জ্বালা, অতিরিক্ত ক্লান্তি, নাক বন্ধ হয়ে থাকা বা মাথাব্যথাও দেখা দিতে পারে।
লিসা প্যাটেলের মতে, ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক শব্দ করে শ্বাস নেওয়া, মাথা দুলিয়ে শ্বাস নেওয়া বা বুকের পেশি ব্যবহার করে শ্বাস নেওয়া বিপদের লক্ষণ হতে পারে। হাঁপানিতে আক্রান্ত শিশুদের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ইনহেলার ব্যবহারের পরিকল্পনা আগে থেকেই থাকা উচিত।
কখন সতর্ক হবেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিভ্রান্তি সবচেয়ে বেশি হয় যখন সূচক হলুদ, কমলা বা লাল পর্যায়ে থাকে।
যারা বায়ুদূষণের প্রতি সংবেদনশীল, তাদের কমলা স্তরে পৌঁছানোর পর থেকেই বাইরে ব্যায়াম বা ভারী কাজ কমিয়ে দেওয়া উচিত। আর সূচক লাল হলে সবারই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
এ সময় দীর্ঘক্ষণ বাইরে থাকার পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করা উচিত। বাইরে যেতেই হলে এন ৯৫ বা কেএন ৯৫ মাস্ক ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কাপড়ের মাস্ক পিএম ২ দশমিক ৫ থেকে কার্যকর সুরক্ষা দিতে পারে না।
দূষণের সংস্পর্শ কমানোর সহজ উপায় হলো বাইরে থাকার সময় কমিয়ে দেওয়া বা শারীরিক পরিশ্রম কমানো। উদাহরণ হিসেবে, ৩০ মিনিট হাঁটার বদলে ১৫ মিনিট হাঁটলে দূষিত বাতাস গ্রহণও প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে।
বছরের কোন সময়ে দূষণ বেশি?
ওজোনের মাত্রা সাধারণত উষ্ণ মৌসুমে বেশি থাকে। সূর্যালোকের কারণে বিকাল ও সন্ধ্যার দিকে এটি আরও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে পিএম ২ দশমিক ৫ সাধারণত দাবানলের মৌসুমে বেশি দেখা যায়। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন আর দাবানল নির্দিষ্ট মৌসুমে সীমাবদ্ধ থাকে না।
উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলবিজ্ঞানী ট্রেসি হলোওয়ে বলেন, “পিএম ২ দশমিক ৫ বিভিন্ন ধরনের হতে পারে।”
তিনি বলেন, “কিছু পরিস্থিতিতে রাতে এর মাত্রা সবচেয়ে বেশি থাকে, কারণ এটি নিচের স্তরে আটকে যায়। আবার কিছু ক্ষেত্রে দিনের মাঝামাঝি সূর্যের তাপে এটি বেশি তৈরি হয়।”
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, দাবানলের ধোঁয়া বিশেষভাবে বিষাক্ত হতে পারে। গাছপালা পুড়লে বাতাসে আরও বেশি পারদ ছড়িয়ে পড়তে পারে। আর বাড়িঘর ও বসতি পুড়লে প্লাস্টিক ও পেট্রোকেমিক্যাল পদার্থ পুড়ে ক্যানসার সৃষ্টিকারী ও ধাতব কণিকাও বাতাসে মিশতে পারে।
ঘরের ভেতরে থাকলেই কি নিরাপদ?
ঘরের ভেতরে থাকা ঝুঁকি কমায়, তবে অতিরিক্ত কিছু ব্যবস্থা নিলে আরও ভালো সুরক্ষা পাওয়া যায়।
কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ভবন বাতাসের দূষক ছেঁকে ফেলতে সহায়তা করে। পাশাপাশি হেপা এয়ার ফিল্টার সূক্ষ্ম কণিকা কমাতে কার্যকর এবং তুলনামূলক কম খরচেও পাওয়া যায়।
বিশেষজ্ঞরা ঘরের ভেতরেও অপ্রয়োজনীয় দূষণ এড়ানোর পরামর্শ দেন। যেমন অনেক গাড়ি রাখার গ্যারাজে গাড়ির ইঞ্জিন চালু রাখা, সুগন্ধিযুক্ত ও ওজোন তৈরি করে এমন পণ্য ব্যবহার করা কিংবা কাঠ বা গ্যাসের চুলা ও ফায়ারপ্লেস ব্যবহারে ঘরের বাতাসও দূষিত হতে পারে।
দূষণ কমাতে কী করবেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু লক্ষণ মোকাবিলা নয়, দূষণের মূল উৎস কমানোই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।
কার্বন বায়ুমণ্ডলে শত শত বছর থাকতে পারে। তবে পিএম ২ দশমিক ৫ ও ওজোন কয়েক দিনের মধ্যেই কমে যায়। ফলে দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণ করা গেলে বায়ুর মানও দ্রুত উন্নত হতে পারে। কোভিড-১৯ মহামারির শুরুর দিকে সড়ক ও আকাশপথে চলাচল কমে যাওয়ার পর বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বাতাস দ্রুত পরিষ্কার হওয়ার ঘটনাও তার উদাহরণ।
ট্রেসি হলোওয়ে বলেন, “বায়ুদূষণের বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণযোগ্য উৎস থেকে আসে। পরিবহন ব্যবস্থা, শিল্প, জ্বালানি ব্যবস্থা ও সড়ক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে পারলে বায়ুর মান দ্রুত উন্নত হতে পারে। অবশ্য শুধু নীতিগত পরিবর্তন এনে দাবানল বন্ধ করা সম্ভব নয়। তবে বায়ুদূষণের আরও অনেক উৎস নিয়ন্ত্রণে বাতাস পরিষ্কার করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি আমাদের হাতে রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “পরিষ্কার যানবাহন, পরিষ্কার বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং পরিচ্ছন্ন শিল্পকারখানা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমরা ইতোমধ্যে বড় অগ্রগতি অর্জন করেছি। এগুলো সচেতন সিদ্ধান্তের ফল।”
তার বিশ্বাস, “সমস্যার উৎস মোকাবিলায় সমাজ এগিয়ে গেলে এটি কোনো আশাহীন পরিস্থিতি নয়।”