Published : 22 Jan 2026, 09:29 PM
সরকার জনগণকে ‘মিথ্যাচারের ফাঁদে ফেলে প্রতারণামূলকভাবে’ গণভোটের আয়োজন করেছে বলে অভিযোগ করেছেন সিপিবির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম।
বৃহস্পতিবার ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের প্রচার কার্যক্রম উদ্বোধন করে তিনি সাংবাদিকদের সামনে এ মন্তব্য করেন।
সেলিম বলেন, “দুইটা ভোট হবে, একটা হল এমপি ভোট আরেকটা হল গণভোট। হওয়ার কথা নিরপেক্ষ ভোট। ‘হ্যাঁ’/‘না’ ভোট একটা ভোট সেখানে তিনটা পক্ষ হতে পারে। একটা পক্ষ ‘হ্যাঁ’ বলবে, একটা পক্ষ ‘না’ বলবে একটা পক্ষ বিরত থাকবে। সরকার যদি বলে ধানের শীষে ভোট দাও বা এই মার্কায় ভোট দাও, কিংবা দাঁড়িপাল্লায় ভোট দাও, সরকার কি দাবি করতে পারে যে ‘আমরা নিরপেক্ষ’? তাহলে মানুষ এত রক্ত দিল কেন?”
সরকার গণভোটের প্রচার করছে সরকারি টাকায়, সেখানে সরকার কীভাবে একটি পক্ষ নিতে পারে, সেই প্রশ্ন তোলেন কয়েকটি সংস্কার প্রস্তাবে আপত্তি জানিয়ে জুলাই সনদে সই না করা সিপিবির এই নেতা।
তিনি বলেন, “আমরা বলেছিলাম সংস্কার দরকার, কিন্তু সংস্কার করতে হলে জনগণের শক্তির উপর দাঁড়িয়ে করতে হবে। তাই প্রথমে জাতীয় নির্বাচন হোক। আমাদের কথাবার্তা শোনে নাই। এখন ভুয়া প্রতারণামূলক একটা ইয়েস নো ভোট দিয়েছে।”
গণভোটের প্রশ্নের কথা তুলে ধরে সেলিম বলেন, “আটটা বিষয়ে আমাকে ‘হ্যাঁ’, ‘না’ বলতে হবে। চারটা এবং তার ভেতরে অনেকগুলো ভাগ আছে। আমি অর্ধেকটা মানি অর্ধেকটা মানি না। যদি ‘হ্যাঁ’ দিই, তাহলে যেগুলো মানি না ওটাও ‘হ্যাঁ’ বলতে হচ্ছে। আর যদি ‘না’ বলি, তাহলে যেগুলো আমি সমর্থন করি সেখানেও ‘না’ বলতে হচ্ছে।“
সিপিবির সাবেক এই সভাপতি বলেন, “আমি অভিযোগ করতে চাই, সরকার সমস্ত জনগণকে মিথ্যাচারের ফাঁদে ফেলে তাদের ঈমান নষ্ট করার ব্যবস্থা করেছে। এই গণভোট শুধু অপ্রয়োজনীয় নয়, এটা একটা প্রতারণামূলক ভোট।
“আমরা জনগণের কাছে আহ্বান জানাব, এইটা আমাদের ভোট না, আপনার নির্বাচিত প্রতিনিধি সঠিকভাবে নির্বাচিত করেন এবং তারা পার্লামেন্টে গিয়ে এই দেশ কীভাবে চলবে না চলবে সেটা নির্ধারণ করবে।”
অভ্যুত্থানের সামনের সারির ছাত্রনেতাদের দল এনসিপিরও কঠোর সমালোচনা করেন সিপিবি নেতা সেলিম।
তিনি বলেন, “২৪ সালে গণভুত্থানের সময় আমরা স্বপ্ন দেখেছিলাম, স্বাধীনতা এনেছি এখন সংস্কার হবে। ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার, এটাই তো গ্রাফিতিতে লেখা ছিল। এখন সে জাতিকে আজ উল্টা দিকে নিয়ে যেতে চাচ্ছে।
“একটা প্রশ্ন না করে পারছি না, তরুণ সমাজ হল নতুনের দিকে যাবে। তারা বলল, আমরা সমন্বয়কারী। এনসিপি করল। করে গিয়ে এখন জামাতের সাথে হাত মিলিয়েছে। এইটা সামনের দিকে আগানো না পেছন দিকে আগানো?”
সেলিম বলেন, “এ কোন যুব সমাজ যে সামনের দিকে অগ্রসর না হয়ে মধ্যযুগের দিকে দেশকে নিয়ে যেতে চায়? নতুন চিন্তা না এনে পুরানা চিন্তায় আমাদের দেশবাসীকে আবার ঘুম পাড়িয়ে দিতে চায়? সুতরাং জনগণের কাছে আমার আহবান, আপনারা স্বাধীনভাবে আপনাদের বিবেক বুদ্ধি বিবেচনা অভিজ্ঞতা অনুযায়ী এই নির্বাচন সংগ্রামে অবস্থিত হবেন।”
গণভোটের পক্ষে প্রচার করে সরকার ‘নিরপেক্ষতা হারিয়েছে’ মন্তব্য করে বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, “জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই গণভোটের আয়োজন করে এক জটিল পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। গণভোটের প্রশ্নপত্র চারটি বিষয়ে এমনভাবে করা হয়েছে, যেখানে কারো যদি দুটিতে একমত, দুটিতে দ্বিমত থাকে, তাহলে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না; তে উত্তর দিবে কীভাবে?”

‘গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার’ অঙ্গীকার
জাতীয় সংসদকে ‘গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার কেন্দ্র’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার অঙ্গীকার নিয়ে ভোটের মাঠে প্রচার শুরু করেছে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট।
বৃহস্পতিবার ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পমাল্য অর্পণের মাধ্যমে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের প্রচার কার্যক্রম শুরু হয়।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বাসদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান বলেন, “সংসদ যেন কোটিপতি, দুর্বৃত্ত ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তির ক্লাব না হয়, সংসদ হোক গণমানুষের অধিকার আদায়ের হাতিয়ার।
“কমিশন ঋণখেলাপী ও দ্বৈত নাগরিকদের প্রার্থিতার সুযোগ দিয়ে সংবিধান লংঘন করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে করে সুষ্ঠ নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়েও জনমনে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেও সরকার ও কমিশন ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। ফলে জনমনে এক ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।”
গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের কেন্দ্রীয় নেতা ও বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, “সরকার ও নির্বাচন কমিশন এখনও পর্যন্ত নির্বাচনের সুষ্ঠ পরিবেশ ও সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে পারেনি। ইতোমধ্যে পোস্টাল ব্যালট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত ঘটনা সম্পর্কে প্রশ্ন ওঠেছে। কমিশন জনগণের সামনে এ বিষয়টি স্পষ্ট করতে পারেনি।”

বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য মুশতাক হোসেন বলেন, “ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর হামলা, অগ্নিসংযোগ অব্যাহত থাকায় তাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিয়েছে। এমনকি তারা ভোট কেন্দ্রে গিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবে কিনা, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
“নির্বাচনে সকলের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, কালো টাকা, পেশীশক্তি, সাম্প্রদায়িকতা কঠোর হস্তে দমন করে নির্বাচনের সুষ্ঠ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।”
অন্যদের মধ্যে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের কেন্দ্রীয় নেতা সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য রাগিব আহসান মুন্না, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবির জাহিদ, বাসদের সহকারী সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন, সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, বাসদ (মার্কসবাদী) সমন্বয়ক মাসুদ রানা, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্য শহীদুল ইসলাম সবুজ, সমাজতান্ত্রিক পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রুবেল সিকদার এসময় উপস্থিত ছিলেন।