আমরা চাই মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে স্থিতিশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা: ড. কামাল হোসেন
বাহাত্তরের সংবিধানের ভিত্তি উপড়ে ফেলে নতুন ভিত্তি তৈরি করা গ্রহণযোগ্য নয়, বলেন বিএনপির এমপি ফজলুর রহমান।
সংবিধান নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করে জাতিকে বিভক্ত করার অপচেষ্টা চলছে বলে মন্তব্য করেছেন সংবিধান প্রণয়ন কমিটির প্রধান ও গণফোরামের এমিরেটাস সভাপতি ড. কামাল হোসেন।
তিনি বলেন, “আমরা চাই মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা, যার মাধ্যমে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে।”
সংবিধান দিবস উপলক্ষে বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে গণফোরাম আয়োজিত এক আলোচনা সভায় ড. কামাল লিখিত বক্তব্য রাখেন।
তার এ লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান।
১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হয়, যা কার্যকর হয় ওই বছরের ১৬ ডিসেম্বর।
সংবিধান গৃহীত হওয়ার সেই দিনটি সংবিধান দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
সংবিধান প্রণয়ন কমিটির প্রধান কামাল হোসেন বলেন, “একটি অশুভ শক্তি বর্তমানে যেভাবে সংবিধান নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করছে, তা জাতিকে বিভাজিত করছে।”
তিনি বলেন, “এই সংবিধান জনপ্রত্যাশার দলিল। কারণ এ দেশের মালিক জনগণ। জনগণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল একটি গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা, শোষণমুক্ত এবং অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র নির্মাণের অঙ্গীকার।”
কামাল বলেন, “৭২ সনের সংবিধানের প্রতিটি অনুচ্ছেদে এই চেতনার প্রতিফলন লিপিবদ্ধ আছে। জনগণের চাহিদা মোতাবেক কালের বিবর্তনে সংবিধান সংশোধন হতে পারে। কিন্তু জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে রচিত এই পবিত্র সংবিধানকে অবমূল্যায়ন করার কোনো অবকাশ নেই।”
দেশের বিরাজমান পরিস্থিতিতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি প্রতিহত করা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, মাদকাসক্তি দূর করা এবং সন্ত্রাস নির্মূল করে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
একই সঙ্গে লাখ লাখ বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করলে দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে বলে সতর্ক করে গণফোরামের এমেরিটাস সভাপতি।
‘সংবিধানের ভিত্তি উপড়ে ফেলা গ্রহণযোগ্য নয়’
বিএনপির সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান বলেন, সংবিধানের মূল ভিত্তি অক্ষুণ্ন রেখে সময়ের প্রয়োজনে সংশোধন করা যেতে পারে, তবে ১৯৭২ সালের সংবিধানের ভিত্তি উপড়ে ফেলে নতুন ভিত্তি তৈরি করা গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, “সংস্কার আর সংশোধনের মধ্যে তফাত আছে। ভিত্তি মানি না, নতুন করে ভিত্তি স্থাপন করা হল সংস্কার। আর সংশোধন হল-আমি ভিত্তি মানি, ৭২-এর সংবিধানের ভিত্তি আমি মানি। সেই ভিত্তির মধ্যে যদি কোনো কারণে আজকের প্রেক্ষাপটে কাজ করতে না পারি, সংবিধান যদি আমার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তবে আমরা সবাই মিলে পরিবর্তন করব। এর নাম হল সংশোধন।”
মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের নামকে রাষ্ট্রের অপ্রতিস্থাপনযোগ্য ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরে ফজলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের জাতিসত্তা ও রাষ্ট্রসত্তার মূল ভিত্তি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। সংসদের সাড়ে তিনশ এমপি কিংবা দেশের ১৮ কোটি মানুষও যদি একমত হয়ে বলে, এ দেশের নাম বাংলাদেশ থাকবে না অথবা ১৯৭১ সালে কোনো যুদ্ধ হয়নি, তবুও তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
সংবিধানের বর্ণিত মৌলিক অধিকারের ক্ষেত্রে ‘আইনের বিধিনিষেধ সাপেক্ষে’ শর্ত যুক্ত করে নাগরিকের অধিকার সংকুচিত করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নাগরিকের বিবেকের স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে এ শর্ত তুলে দেওয়ার পক্ষে মত দেন ফজলুর রহমান।
‘সংবিধান ছুড়ে ফেলার ধৃষ্টতা দেখালে বিচার হওয়া দরকার’
১৯৭২ সালের সংবিধানকে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংবিধান হিসেবে তুলে ধরে তা ছুড়ে ফেলে দেওয়ার উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য আবু সাইয়িদ।
তিনি বলেন, “৩০ লক্ষ লোকের রক্তে লেখা এই সংবিধান, এই জাতীয় দলিল। এই জাতীয় দলিলকে কেউ ফেলে দেবে, ছুড়ে ফেলে দেবে—এই ধৃষ্টতা যারা দেখায়, তারা, আমি বলি দেশদ্রোহী, রাষ্ট্রদ্রোহী। তাদের বিচার হওয়া দরকার।”
সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গে সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী বলেন, “সংস্কার করতে হলে বিপ্লবের প্রয়োজন হয়। এ দেশে বিপ্লব হয় নাই। কারণ বিপ্লবের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকে, আদর্শ থাকবে এবং সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে একটা নতুন কিছু উপহার দেওয়ার মানসিকতা থাকবে।”
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ১৯৭২ সালের সংবিধান অনুসারে শপথ নিয়েছেন তুলে ধরে তিনি বলেন, “তারপরে তো প্রশ্ন ওঠার কথা ছিল না।”
গণভোট প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাবেক এই নেতা বলেন, “গণভোট যদি হয়ও, তারপরেও সংসদের অনুমোদন লাগবে। কারণ জনগণ সার্বভৌম। জনগণের প্রতিনিধি হিসাবে এমপিরা নির্বাচিত হন জনগণের পরম অভিব্যক্তি রূপে।”
সংবিধানে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে তিনি বলেন, জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে, এমন প্রস্তাবগুলো সংসদে বিবেচনার জন্য রাখা উচিত।
‘সংবিধান সংশোধন হবে জনগণের প্রয়োজনে’
সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে সমাজকল্যাণমন্ত্রী এবং নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, মানুষের জীবন ও প্রয়োজনীয়তা পরিবর্তনশীল। তাই জনআকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সংবিধানে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে।
তিনি বলেন, “সংবিধান তো সংশোধন হওয়ারই জিনিস। কারণ মানুষের জীবন তো স্ট্যাটিক না, ইটস এ ডায়নামিক থিং। প্রতিদিন পরিবর্তন হবে, প্রতিদিন একেক সময় একেক ধরনের ইকুইপমেন্টস আসবে, প্রয়োজনীয়তা আসবে এবং জনআকাঙ্ক্ষা চেঞ্জ হবে।”
সমাজকল্যাণমন্ত্রী বলেন, “সংবিধান বলছে জনআকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করার নামই হচ্ছে সংবিধান, প্রতিফলন করার নামই সংবিধান এবং সেটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার নামই সংবিধান। কিন্তু মৌলিক বিষয়গুলোকে বাদ দিয়ে নয়।”
১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়নের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, স্বল্পতম সময়ে সংবিধান লেখা ও তা গ্রহণ করার ঘটনা বাংলাদেশের জন্য গর্বের।
সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধী দল অংশ না নিয়ে বাইরে থেকে আপত্তি তোলার সমালোচনা করেন জাহিদ হোসেন।
তিনি বলেন, সংসদের অন্য কমিটিগুলোতে অংশ নিলেও সংবিধান সংশোধন কমিটিতে অংশ না নেওয়ার বিষয়টি বোধগম্য নয়। সেখানে গিয়ে নিজেদের মতামত দেওয়া উচিত।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সংবিধানের মৌলিক বিষয় অক্ষুণ্ন রেখে স্বৈরশাসন ঠেকানো, সুশাসন ও মানবাধিকার নিশ্চিত করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা উচিত।
তার ভাষায়, “সংবিধান সংশোধনী হবে জাতির প্রয়োজনে, মানুষের প্রয়োজনে, আকাঙ্ক্ষার প্রয়োজনে, জনগণের চাহিদার প্রয়োজনে।”
গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সুব্রত চৌধুরীর সভাপতিত্বে ও দলের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমানের সঞ্চালনা আলোচনায় সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না।
