০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩

সংবিধান সংস্কারের দাবিতে অনড় বিরোধীরা, শেষমেশ কী একতরফা সিদ্ধান্ত?

“আইন ভালো হলেই দেশ ভালো হয়ে যায় না,” বলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক।

ইমরান হোসাইন ইমরান হোসাইন

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 04 Nov 2026, 12:06 AM

Updated : 04 Nov 2026, 12:58 AM

সংবিধানে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে—এ নিয়ে কোনো পক্ষেরই দ্বিমত নেই। কিন্তু বিতর্ক বেঁধেছে কীভাবে পরিবর্তন হবে তা নিয়ে।

বিদ্যমান সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুসরণ করে জাতীয় সংসদের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন হবে করার বলছে বিএনপি সরকার। অন্যদিকে গণভোটের রায় মেনে সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কারের দাবিতে অনড় জামায়ায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট।

এ আলোচনার মধ্যে মূলত ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা, অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতার ভিত্তি এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের রূপরেখা নিয়ে এ মতভিন্নতাও রয়েছে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে।

সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলগুলো অংশ না নিলেও সংবিধান সংশোধনের কাজ এগিয়ে নেওয়ার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

অন্যদিকে বিরোধী দল জামায়াত জোট বলেছে, গণভোটের রায় মেনে সংবিধান সংস্কারের আন্দোলন চালিয়ে যাবে তারা।

তাহলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে একতরফা সংবিধান সংশোধন হবে? জবাবে সংবিধান সংশোধন কমিটির সদস্য জয়নুল আবেদীন বলেছেন, তারা আগের সরকারের মতো একতরফা কোনো কিছু করতে চান না।

দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে অন্তর্বর্তী সরকার অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যে গেল বছর ১৭ অক্টোবর জুলাই জাতীয় সনদ গ্রহণ করে।

এরপর নভেম্বরে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, যে আদেশ অনুসারে গণভোট অধ্যাদেশ জারি করা হয়।

গেল ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে গণভোট হয়, তাতে প্রায় ৬৯ শতাংশ ভোট পড়ে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুসারে, সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল।

তবে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপির প্রার্থীরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি, তারা শুধু সংসদ সদস্য হিসেবেই শপথ নেন।

অন্যদিকে আলাদা করে উভয় শপথই নেন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধনি জোটের সদস্যরা।

সরকার গঠনের পর বিএনপির তরফে বলা হয়, জুলাই সনদ তারা বাস্তবায়ন করবে, তবে সেটা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বাদ দিয়ে।

আর বিরোধীদের দাবি, গণভোটের মধ্যদিয়ে যে জুলাই সনদ পাস হয়েছে, সে অনুযায়ী সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার করতে হবে।

সংবিধান সংশোধন বা সংস্কারের প্রশ্নে এ বিরোধকে মূলত ‘টেকনিক্যাল জটিলতা’ হিসেবে দেখছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কাজী জাহেদ ইকবাল।

সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ এই আইনজীবী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল, ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন এবং দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠার মতো মৌলিক ক্ষেত্রগুলোতে সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে কোনো দৃশ্যমান দূরত্ব নেই।”

তার মতে, বিতর্কের জায়গাটি প্রক্রিয়ায়। পরিবর্তনগুলো কি সংবিধানের ভেতরে থেকে সংসদের সংশোধনীর মাধ্যমে আনা হবে, নাকি সংসদের বাইরে কোনো সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে কার্যকর হবে—সেটাই এখন মূল প্রশ্ন।

১৯৯০ সালের তুলনায় ২০২৪ সালের আন্দোলনের পটভূমি ভিন্ন মন্তব্য করে তিনি বলেন, “নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল কেবল সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা কায়েম করা। বিপরীতে চব্বিশের অভ্যুত্থানে সর্বস্তরের মানুষের সম্পৃক্ততা যেমন ছিল ব্যাপক, তেমনি সংবিধান ঢেলে সাজানোর দাবিটিও ছিল অনেক বিস্তৃত।”

তবে সংবিধানে একের পর এক নতুন বিধান যুক্ত করলেই দেশে জবাবদিহি, উন্নয়ন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে—এমন ভাবনার সঙ্গে একমত নন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক।

সংবিধানে ভালো কথা লিপিবদ্ধ থাকলেই দেশে জবাবদিহি বা ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়ে যায়—এই ধারণাকে ‘উদ্ভট’ আখ্যা দিয়ে এ সংবিধান বিশেষজ্ঞ বলেন, “আইন ভালো হলেই দেশ ভালো হয়ে যায় না।”

নিজের বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি দিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ টেনে বলেন, “১৭৮৯ সালে মাত্র ১২ পৃষ্ঠায় সাতটি অনুচ্ছেদ নিয়ে প্রণীত সংবিধান দিয়ে আড়াইশ’ বছর ধরে দেশ চালাচ্ছে দেশটি, সেখানে গণতন্ত্রের চর্চাও আছে। অথচ বাংলাদেশের সংবিধানে ১৫৩টি অনুচ্ছেদ থাকার পরও সর্বক্ষেত্রে জবাবদিহির স্পষ্ট ঘাটতি রয়ে গিয়েছে।”

বিদ্যমান সংবিধানকে ‘অগণতান্ত্রিক’ বলে মনে করেন লেখক অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান।

তিনি বলেন, “বর্তমান সংবিধান মুষ্টিমেয় মানুষের শাসনকে টিকিয়ে রাখে। তাই এটি সংস্কারের চেয়ে নতুন করে রচনা করা দরকার।”

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের এই অধ্যাপক মনে করেন সরকারপদ্ধতি বদলালেই স্বৈরতন্ত্রের অবসান ঘটে না।

তিনি বলেন, “এইচ এম এরশাদ রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থায় এবং শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীশাসিত ব্যবস্থায় স্বৈরতন্ত্র কায়েম করেছিলেন। সমস্যার মূল কারণ সরকারপদ্ধতি নয়, রাষ্ট্রের ওপর একটি ক্ষুদ্র শ্রেণির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ।”

একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়ন করতে হলে আইনসভাকেই রাষ্ট্রের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে বলে মত দেন সলিমুল্লাহ খান।

৫ অগাস্টের পর সংবিধানের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন

১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে বাংলাদেশ প্রথম সংবিধান গৃহীত হয়। ওই বছর ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের প্রথম বার্ষিকীতে সংবিধান কার্যকর হয়।

এর পরে বিভিন্ন সময়ে সংবিধান সংশোধন হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পটপরিবর্তনের পর সংবিধান বদলানোর দাবি উঠে।

গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বিদ্যমান সংবিধান কার্যকর ছিল কি না, তা নিয়ে সংবিধান ও আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।

সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। আর সরকার যখন সেই জনগণকেই হত্যা করতে শুরু করে, তখন ক্ষমতা আপনা-আপনি জনগণের হাতে ফিরে যায়।”

একে ‘বিপ্লবী সাংবিধানিকতাবাদ’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, “গণঅভ্যুত্থানের ফলে রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের আগের চুক্তি গুরুতর লঙ্ঘন হয়। এতে করে পুরাতন সাংবিধানিক ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ে।

৫ অগাস্টের পর রাষ্ট্রের নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগের কার্যক্রম কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছিল দাবি করে অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা প্রশ্নে আপিল বিভাগের ১০৬ অনুচ্ছেদের মতামতের ওপর নির্ভর করাকে ‘অবাস্তব’ বলে অভিহিত করেন শরীফ ভূঁইয়া।

তার ভাষ্য, “অন্তর্বর্তী সরকার কোনো আদালতের মতামত নয়, সরাসরি জনগণের ‘বিপ্লবী ম্যান্ডেট’ থেকেই সাংবিধানিক বৈধতা পেয়েছে।”

সলিমুল্লাহ খানও মনে করেন, ৫ অগাস্টের পর বিদ্যমান সংবিধান স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বাতিল হয়ে গেছে।

তার মতে, “দেশ এখন মূলত প্রচলিত রীতি ও প্রথা অনুযায়ী চলছে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় ১৯৭২ সালের সংবিধানের ঠিক যে অংশগুলো প্রয়োজন পড়ছে, শুধু সেগুলোরই ব্যবহার করা হচ্ছে।”

তবে সংবিধান পুরোপুরি বাতিল বা অকার্যকর হয়ে যায়নি বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ।

সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীসংক্রান্ত মামলার রায়ের ‘পাস্ট অ্যান্ড ক্লোজড’ নীতির উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “৫ অগাস্টের পরও প্রশাসনিক কার্যক্রম, বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত ও অধ্যাদেশের ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। ফলে সংবিধানকে সম্পূর্ণ বাতিল বলা যায় না।”

সংস্কার পরিষদের বৈধতা নিয়ে বিতর্ক

অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ এর কথা তুলে ধরে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইমরান এ সিদ্দিকী বলেন, “গণভোটে সংস্কারের পক্ষে রায় এলে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিষয়টি সেখানে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল। তাই সেই আদেশ অনুযায়ী সংস্কার পরিষদ গঠন করা শুধু আইনগত নয়, রাজনৈতিকভাবেও একটি অলঙ্ঘনীয় বাধ্যবাধকতা।”

সংস্কার পরিষদ গঠন না করে অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় সংবিধান সংশোধনের পথে হাঁটাকে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ ও জনগণের প্রত্যক্ষ ম্যান্ডেট থেকে বিচ্যুতি হিসেবে দেখছেন এই আইনজীবী।

তবে মনজিল মোরসেদ গণভোট এবং এর পেছনে থাকা রাষ্ট্রপতির আদেশের আইনি ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন।

তিনি বলেন, “সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংবিধান পরিবর্তন বা সংশোধনসংক্রান্ত কোনো আদেশ জারির এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির নেই। ফলে সেই ভিত্তির ওপর জারি করা আদেশটি আইনগতভাবে টেকে না।”

অন্যদিকে সংবিধান সংস্কারের কার্যপদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক মতভেদের চিত্র তুলে ধরেন কাজী জাহেদ ইকবাল।

তিনি বলেন, “প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির অবস্থান হল বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে থেকে জাতীয় সংসদে বিল পাসের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা। তবে অন্য বিরোধী দলগুলোর আশঙ্কা, ভবিষ্যতে সংসদের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় এই সংশোধনী আবারও বাতিল হয়ে যেতে পারে; তাই তারা সংসদের বাইরে একটি স্বাধীন সংস্কার পরিষদ গঠন করে টেকসই পরিবর্তন নিশ্চিত করতে চায়।”

তবে সাংবিধানিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে পৃথক সংস্কার পরিষদ গঠনের উদ্যোগ আইনি দিক থেকে অধিকতর দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন এই আইনজীবী।

উচ্চকক্ষ নিয়ে তিন ধরনের প্রস্তাব

দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ চালু এবং উচ্চকক্ষের রূপরেখা ও কার্যপরিধি কেমন হবে, তা নিয়েও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে রয়েছে স্পষ্ট মতবিরোধ।

সলিমুল্লাহ খান উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান জানালেও রাজনৈতিক দলগুলোর ভোটের আনুপাতিক হারে সেখানে সদস্য মনোনয়নের বিরোধিতা করছেন। তিনি বলেন, “এমনটা হলে দলীয় মনোনয়ন বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি হবে। তাই প্রতিটি জেলা থেকে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে দুজন করে সদস্য নির্বাচিত করে মোট ১২৮ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ গঠন করা যেতে পারে।”

একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি ও উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অভিশংসনের একক ক্ষমতা এই উচ্চকক্ষের ওপর ন্যস্ত করার প্রস্তাব দেন তিনি।

ভোটের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতের পক্ষে নিজের অবস্থান ব্যক্ত করে শরীফ ভূঁইয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ভোটের আনুপাতিক হারে উচ্চকক্ষ গঠিত হলে নিম্নকক্ষে কম আসন পাওয়া বা আসন না পাওয়া রাজনৈতিক দলগুলো ভোটের অনুপাতের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পান।”

তিনি বলেন, “নিম্নকক্ষের প্রণীত আইন সরাসরি বাতিল করবে না উচ্চকক্ষ; বরং কোনো বিলে আপত্তি থাকলে তা পুনর্বিবেচনার জন্য ফেরত পাঠানোর বিধান রাখতে হবে। এতে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ক্ষমতার ভারসাম্য ও একধরনের জবাবদিহির পরিবেশ তৈরি হবে।”

সংসদে কোনো ধরনের উচ্চকক্ষ রাখার প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন মনজিল মোরসেদ।

তিনি বলেন, “কোনো অনির্বাচিত উচ্চকক্ষ যদি জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের পাস করা আইন বাতিল করার এখতিয়ার পায়, তবে তা সংবিধানের ৭ ও ৬৫(১) অনুচ্ছেদে বর্ণিত জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে।

“তাছাড়া বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় এ ধরনের নতুন কাঠামো রাষ্ট্রের ওপর কেবল অপ্রয়োজনীয় আর্থিক ব্যয়ের বোঝাই বাড়াবে।”

৭০ অনুচ্ছেদ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার

সংবিধানে সংসদ সদস্যদের নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার সুযোগ বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন শাহদীন মালিক।

তিনি বলেন, “জাতীয় বাজেট ও সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব ছাড়া অন্য সাধারণ বিলগুলোতে দলের বিরুদ্ধে গিয়ে ভোট দেওয়ার অবারিত সুযোগ তৈরি হলে তা দেশের জন্য মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।”

শাহদীন মালিকের আশঙ্কা, “বড় করপোরেট ও প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলো লবিং করে যদি নিজেদের স্বার্থে সংসদ সদস্যদের কিনে নেয়, তবে সরকারের পক্ষে জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় কোনো আইন পাস করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।”

অর্থ বিল ও অনাস্থা প্রস্তাবের বাইরে অন্যান্য বিষয়ে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ রাখার পক্ষে শরীফ ভূঁইয়া।

তবে তিনি মনে করেন, “সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির গুণগত পরিবর্তন না আনতে না পারলে কাগজে-কলমে বিধান রেখে সংসদ সদস্যদের স্বাধীন ভোটাধিকার নিশ্চিত করা কঠিন হবে।”

নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সংবিধানের সাবেক ৫৮(গ) অনুচ্ছেদ অনুসরণের পক্ষপাতী মনজিল মোরসেদ।

স্পিকারকে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান করার ধারণার বিরোধিতা করে তিনি বলেন, “জাতীয় সংসদের স্পিকার সাধারণত দলীয় ব্যক্তি হওয়ায় তার নেতৃত্বে প্রকৃত অর্থে নির্দলীয় সরকার পরিচালনা করা কঠিন হবে।”

সরকার ও বিরোধী পক্ষের রাজনৈতিক সম্মতির ভিত্তিতে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের ওপর জোর দিয়েছেন শরীফ ভূঁইয়া।

তার মতে, “দুই পক্ষের মধ্যে কোনো ঐকমত্য তৈরি না হলে শেষ বিকল্প হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে এই দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।”

সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে সীমিত রাখার প্রস্তাবকে সমর্থন করেন মনজিল মোরসেদ।

তবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মতো সংবিধিবদ্ধ ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক নেতাদের বদলে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বা অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার পক্ষে প্রস্তাব করেন তিনি।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মৌলিক কাঠামো

বিগত দিনগুলোতে দেশের বিচার বিভাগের ভূমিকার কড়া সমালোচনা করে একে ‘জুডিশিয়াল অ্যাডভেঞ্চারিজম’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন সলিমুল্লাহ খান।

উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগপ্রক্রিয়া সংস্কারের তাগিদ দিয়ে তিনি সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার আগে বাংলা ভাষায় প্রার্থীর দক্ষতা যাচাইয়ে বাধ্যতামূলক পরীক্ষা নেওয়ার প্রস্তাব করেন।

সংবিধানের বহুল আলোচিত ‘মৌলিক কাঠামো’ প্রসঙ্গে সলিমুল্লাহ খান বলেন, সংবিধানের আলাদা কোনো অংশ নয়, পুরো সংবিধানই মৌলিক; আর এর মূল ভিত্তি হলো জনগণের সার্বভৌমত্ব।

বিপরীতে সংবিধানের মৌলিক রূপরেখা সুরক্ষায় সুপ্রিম কোর্টের বিচারিক পর্যালোচনার ক্ষমতা অটুট রাখা জরুরি বলে মত দিয়েছেন মনজিল মোরসেদ।

তিনি বলেন, “নির্বাহী বিভাগের কোনো অসাংবিধানিক পদক্ষেপ ঠেকাতে এবং সংবিধানের মৌলিক চরিত্র অক্ষুণ্ণ রাখতে আদালতের এই ক্ষমতা বহাল রাখা অপরিহার্য।”

সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে থাকা ‘রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি’র প্রায়োগিক সীমাবদ্ধতার বিষয়টি তুলে ধরে কাজী জাহেদ ইকবাল বলেন, “এসব মূলনীতি সরাসরি আদালতের মাধ্যমে কার্যকর করার সুযোগ নেই। তাই প্রতি বছর জাতীয় বাজেট পেশ করার আগে এ সংক্রান্ত অগ্রগতির বিস্তারিত তথ্য নিয়ে সংসদে একটি বাধ্যতামূলক বার্ষিক প্রতিবেদন উপস্থাপনের যুক্ত করা উচিত।”

Image

গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে ৩১ অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনা পর্যন্ত লংমার্চ করে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট ১১ দলীয় ঐক্য। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান।

বিরোধীদের বর্জন না করার পরামর্শ

সংবিধান সংশোধনে সংসদে কমিটি গঠনের পর বিরোধী দল ওই কমিটি প্রত্যাখ্যান করে অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেছিল। কমিটিতে বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি সদস্যপদ রাখা হলেও তারা কোনো নাম দেয়নি।

বিরোধী দলের বক্তব্য হল-জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে তারা সংবিধান সংস্কারের পক্ষে। তবে বর্তমান পদ্ধতিতে সংবিধান সংশোধনের বিশেষ কমিটি গঠনের সঙ্গে তাদের নীতিগত ও ধারণাগত মতপার্থক্য রয়েছে।

তবে পদ্ধতিগত ত্রুটি-বিচ্যুতির প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সংসদ বা সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়া বর্জন করা উচিত হবে না বলে মনে করেন ইমরান এ সিদ্দিকী।

তিনি বলেন, “বিরোধী দলগুলো দূরে সরে থাকলে শাসক দল কার্যত একতরফাভাবে নিজেদের মতো করে সংবিধান সংশোধনের সুযোগ পেয়ে যাবে। তাই প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি বর্জন না করে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে নিজেদের আপত্তি জোরালোভাবে তুলে ধরা এবং প্রয়োজনে আনুষ্ঠানিকভাবে ভিন্নমত লিপিবদ্ধ করে রাখা উচিত।”

প্রায় একই ধরনের অভিমত প্রকাশ করেছেন কাজী জাহেদ ইকবাল। তিনি বলেন, “সংসদে সরকারি দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিরোধী দলগুলোর উচিত পুরো প্রক্রিয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে না নিয়ে আলোচনার টেবিলে থেকে নিজেদের মৌলিক দাবিগুলো চূড়ান্ত সংশোধনীর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।”

সরকারের অবস্থান ও প্রস্তুতি

বিরোধী দলগুলো অংশ না নিলেও সংবিধান সংশোধনের কাজ এগিয়ে নেওয়ার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

গেল ১৩ অক্টোবর সংবিধান সংশোধন কমিটির বৈঠক শেষে বিরোধী দলের জন্য আলোচনার সুযোগ থাকার কথা তুলে ধরেন তিনি।

কমিটির সভাপতি বলেন, “কিন্তু যদি বিরোধীপক্ষ তারপরও না আসে আমাদের তো সংবিধান সংশোধনীটা নিতেই হবে। এটা জাতির প্রত্যাশা। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে। এটা আমাদের অঙ্গীকার। আমরা অপেক্ষা করতে পারব না।”

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও দলটির নেতৃত্বাধীন জোট ‘১১ দলীয় ঐক্য’ এর সমন্বয়ক এ এইচ এম হামিদুর রহমান আজাদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “গণভোটের রায় ও ৪৮টি সংস্কার ইস্যু বাস্তবায়নের প্রশ্নে আমাদের তরফ থেকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। এ বিষয়ে সংসদে ও রাজপথে আমাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।”

সংবিধান সংস্কার নাকি সংশোধন হবে—এমন বিতর্কের জবাবে বর্তমান সরকার ও জুলাই সনদের চেতনার কথা তুলে ধরে সংবিধান সংশোধন কমিটির সদস্য জয়নুল আবেদীন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সংবিধানকে সংস্কার করার কোনো বিধান নাই। এখানে সংবিধান সংশোধন করতে হবে।”

বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে আইনি সংকট তৈরি হবে কি না, এমন প্রশ্নে সংসদকে সার্বভৌম হিসেবে তুলে ধরেন কমিটির সদস্য জয়নুল আবেদীন। তিনি বলেন, “বিরোধী দলকে বারবার আহ্বান জানানো হলেও তারা এখনও সাড়া দেয়নি। তবে সব পক্ষের মতামত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে একটি সমন্বিত প্রতিবেদন সংসদে পেশ করা হবে।”

বিরোধী দল না এলে কী একতরফা সংবিধান সংশোধন? জবাবে তিনি বলেন, “আমরা অতীতের সরকারের মতো একতরফাভাবে কিছু করতে চাই না। আমরা চাই সেই আলোচনায় বিরোধী দল অংশগ্রহণ করবে এবং তারা তাদের মতামত দেবে, পার্লামেন্ট সদস্যরা তাদের মতামত দেবেন। তারপরেই একমাত্র সংবিধান সংশোধন হতে পারে।”

ডিসেম্বরের মধ্যে কার্যক্রম শেষ করে আগামী বছরের জানুয়ারি মাসে সংসদে বিল উত্থাপন করার চেষ্টা করবেন, বলেন জয়নুল আবেদীন।